শিশু তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ জানান দেয় কান্নার মাধ্যমে। তখন সংশ্নিষ্ট সবাই চেষ্টা করেন কত তাড়াতাড়ি শিশুকে তার মায়ের কাছে দেওয়া যায়। মায়ের পাশে শুইয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার কান্না থেমে যেতে থাকে। নবজাতক বুঝতে পারে এই গন্ধটি তার পরিচিত, এই শব্দটিই তার চেনা। দিন গড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু চেহারা ও শব্দের সঙ্গে পরিচিতি বাড়তে থাকে শিশুর। ক্রমান্বয়ে সে বসতে শেখে, দাঁড়াতে শেখে, হাঁটতে ও দৌড়াতে শেখে। হাসি-কান্না, কথাবার্তা, অজস্র প্রশ্ন করা থেকে শুরু করে সারাক্ষণ খেলাধুলায় মেতে থাকা হয়ে ওঠে তার প্রধান কাজ। মস্তিস্ক বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও শিশু উন্নয়ন গবেষণা অনুযায়ী এ সময় বিশেষ করে জন্মের পর থেকে তিন বছর পর্যন্ত শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সবচেয়ে বেশি ঘটে। পাঁচ বছর বয়সে শিশুর মস্তিস্কের বিকাশ প্রায় ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয়ে যায়। শিশুর এই বেড়ে ওঠা শুধু প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে না। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন বড়দের সুচিন্তিত সহায়তা।

জন্মের পর থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত মা-বাবা ও পরিবারের লোকজনকেই শিশু সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ভালোবাসার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে। পরিবারকে সে শুধু নিরাপদ ও আরামদায়কই মনে করে না, সব আবদার রক্ষাকারী এবং তার সব কাজকে অনুমোদনকারী হিসেবেও বিবেচনা করে। পরিবারই তার সব কিছুর আশ্রয়স্থল।

করোনাকালে জীবন ও জীবিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে কথা হচ্ছে, এমনকি বড়দের মানসিক সমস্যাও আলোচনায় আসছে। কিন্তু পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা এই আলোচনায় আসছে না। এই সময়ে অধিকাংশ শিশু বিশেষ করে নগরের শিশুরা ছোট্ট বাসায় আবদ্ধ থাকছে, তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পরিবেশ পাচ্ছে না। কিন্তু তাদের বয়স বাড়া থেমে থাকছে না। কভিডের শুরুতে যে শিশুর বয়স পাঁচ বছর ছিল তার বয়স এখন সাড়ে ছয় বছর। কোনো ধরনের শিখনের সুযোগ ছাড়াই তার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির বয়স পার হয়ে গেছে। সীমাহীন শিখন সুযোগ সে হারিয়ে ফেলেছে। ঘরে আবদ্ধ থাকায় তাদের মনো-সামাজিক জগতে নানা রকম জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে বড়রা কী করতে পারি? আমরা যেন মনে না করি সবকিছু আপনা আপনি হয়ে যাবে। বরং এই অবস্থায় মা, বাবা ও বড়দের অনেক বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। এই সময়ে তিন বছর এবং এর নিচের শিশুদের মাঝে মধ্যেই কোলে নিন, আদর করুন, গালে গাল লাগিয়ে উষ্ণতা দিন। এটি শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ভালোলাগা বোধ তৈরি করে। শিশুকে তার নাম ধরে ডাকুন। কখনও আদরের নামে ডাকুন, প্রশংসাসূচক নামে ডাকুন। শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এতে শিশুর ভালো লাগে এবং তার মধ্যে মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস তৈরি হয়। কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দিন, সহজ-সরল উত্তর দিন, উত্তরদানে চালাকি না করাই ভালো। উত্তর জানা না থাকলে সততার সঙ্গে বলুন, এটা তো আমার জানা নেই, চেষ্টা করব জানতে, জানতে পারলে তোমাকেও জানাব। এতে শিশুরাও সততা শিখবে।

আপনার কাজে তাকেও অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিন। যেমন আপনি খাবার তৈরি করছেন। আপনার ছেলেকে বলুন, সবজিগুলো ধুতে আমাকে একটু সাহায্য করো। কোনো কাজ সুন্দর করে করলে বা করার চেষ্টা করলে প্রশংসা করুন। ঘরে ও আশপাশের অন্য শিশুর সঙ্গে খেলার সুযোগ দিন। বন্ধুত্ব শিশুর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা শিশুদের সঙ্গে খেলার সময় সহযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মেনে নেওয়া, ভাগাভাগি করা, ভালোবাসা ইত্যাদি শেখে। পরিবারে একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের খাওয়া থেকে তাকেও একটু খেতে দিন। অনাকাঙ্ক্ষিত কাজে 'না' বলুন। তার প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস তৈরি হবে। শিশুর কোনো জিনিস ধরলে তার অনুমতি নিয়ে ধরুন। কোনো জিনিস না বলে নেবেন না। এ অভ্যাস তার মধ্যেও তৈরি হবে। তাকে কিছু কাগজ ও পেন্সিল দিন। নিজে নিজেই আঁকবে। তার আঁকা আপনি দেখুন, দু-একটা নতুন ধারণা দিন, প্রশংসা করুন।

এ ছাড়াও গল্প শোনান, গল্প শিশুর কাছে খুব প্রিয় এবং গল্প থেকে তারা ভাষা, মনো-সামাজিক বিষয় ও বুদ্ধিমত্তা বাড়ার অনেক উপাদান শিখে যায়। তার কাছ থেকে ছড়া শুনুন। বড় ভাই-বোন, নানা-নানি, দাদা-দাদি কারও সঙ্গে মিশতে দিন, গল্প করতে দিন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যতটা সম্ভব বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান, বাইরের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিতি, নানা জিনিস দেখা, মুক্ত জায়গার নিঃশ্বাস তার জন্য অপরিহার্য। এর কোনো বিকল্প নেই।


বিষয় : চতুরঙ্গ  মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম

মন্তব্য করুন