সবুজের নান্দনিক মহানগরী চট্টগ্রাম। ত্রিমাত্রিক থেকে বহুমাত্রিক নগরী। একদিকে সমুদ্রের জল ধোয়া বাতাস, অন্যদিকে কর্ণফুলীর বহমান গুঞ্জরণ। দু'দিক ঘিরে সবুজ পাহাড়ের নির্বাক নির্লিপ্ত চাহনি। নগরবাসীর মন ও মননকে ফুরফুরে রাখে সারা বছর। মনের সুখ দেহের সুখে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মানুষ স্বপ্ন দেখে, সুস্থ থাকে। চট্টগ্রাম মহানগরীর সিআরবি অঞ্চল শতবর্ষের শিরীষ আর রেইনট্রির শ্যামল ছায়া ভরা, মায়া জড়া, নান্দনিক আকর্ষণীয়, স্বাচ্ছন্দ্যের সরোবর।

কত জানা-অজানা উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্যে ভরা এই ছায়াতল, মায়াতল, কায়াতল। আমরা যদি এর পরিবেশ ঐশ্বর্যের দিকে তাকাই, তাহলে দেখি সকাল-সন্ধ্যা নিবিড় ছায়ায়, গভীর মায়ায়, নানান বর্ণের, নানান গোত্রের পাখপাখালি, সবুজ গাছগাছালি, কীটপতঙ্গের বাস্তুতান্ত্রিকতায় নিবিড় নিবেশ। ঐশ্বরিক একটি অঞ্চল শিরীষতলার সিআরবি অঞ্চল।

মুক্ত অক্সিজেনের প্রাকৃতিক কারখানা এ জায়গা। এখানে মুক্ত অপিজেনের জন্য সকাল-বিকেল সব বয়সের মানুষের আনন্দঘন, মুখিয়ে মুখর বিচরণ এই অঞ্চলের ঐতিহ্যকে, ঐশ্বর্যে পরিণত করে। প্রকৃতি হয়ে যায় প্রার্থনার উপাদান। ঐশ্বর্যকে জানান দেয় এ অঞ্চল। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, বর্ষার ঝড় ঝড় বৃষ্টির সিক্ত দিবস, হেমন্ত-গ্রীষ্মের মায়াবি ছায়াঢাকা অঙ্গন পথিক-পরিবেশপ্রেমীদের স্বাচ্ছন্দ্য দেয় দিনরাত। এই জায়গার আর্থিক মূল্যের চেয়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক- প্রাকৃতিক মূল্য অনেক অনেক বেশি।

সবুজকে বিনষ্ট করে, গাছপালাকে কেটে-ছেঁটে, বাস্তুতান্ত্রিকতাকে নিঃশেষ করে, অপিজেনকে বিতাড়িত করে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কঠিন-তরল-বায়বীয় গ্যাসের উনুন তৈরি করার প্রক্রিয়া কখনোই জীবন ও বাস্তুতান্ত্রিকতার কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। উন্নয়ন বা চিকিৎসার নামেও না।

ইট-কাঠ-কংক্রিট সবুজের বিকল্প হতে পারে না। জীবনের পড়শি সবুজ। জীবন আর সবুজ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দিয়ে বাস্তুতান্ত্রিক যে পৃথিবী গড়েছে, তাকে নিঃশেষ করে দেওয়া যায় না। উচিত নয়। অধিকন্তু, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে, সাংস্কৃতিক দিবসে, গুণীজন দিবসে মানুষ এখানে মিলিত হয়। মতবিনিময় করে। সামাজিকতাকে চর্চা করে। সংস্কৃতিকে বহন করে। এ রকম নান্দনিক একটি ঐশ্বর্যের জায়গাকে বিনষ্ট করার প্রক্রিয়া চলতে পারে না। সবুজের একমাত্র গ্রহ পৃথিবী। বাংলাদেশের ঘন সবুজ এবং গাছগাছালির প্রাকৃতিক নগর চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের প্রাকৃতিকতা কোনো সংস্থার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না। কোনো সংস্থা কিংবা শ্রেণির মাধ্যমে প্রজাতির বিলুপ্তি আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল। কুমিরায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চারপাশে বিস্তৃত জায়গা আছে। শহরের বাইরে জায়গা আছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে হাসপাতাল তৈরি করার মতো মূর্খতা আমাদের চেতনায় বহন করা উচিত নয়। সাত মিলিয়ন মানুষের ঘনবসতির একটি নগর চট্টগ্রাম। এ নগরে মানুষের শখ আছে, স্বাচ্ছন্দ্য আছে। প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা আছে। প্রকৃতির প্রতি অগাধ-অবাধ প্রেম আছে। মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ঐতিহ্য আছে। সাগরের লবণজল ধোয়া বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েই সুস্বাস্থ্যের নাতিশীতোষ্ণ নগরী চট্টগ্রাম মহানগর। এর ফুসফুসে কুঠারাঘাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই ঐতিহ্যগুলোকে ব্যক্তি কিংবা কোনো সংস্থার অদূরদর্শী আগ্রাসনে নিঃশেষ করা যায় না। মুক্ত অপিজেনের গুরুত্ব সীমাহীন। কভিডকালীন সংকটে মুক্ত বিশুদ্ধ অপিজেনের কথা আমাদের নতুন করে ভাবতে হয় না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে। তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধির দিকে। কার্বনের বিস্তৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী দেশে কোটি কোটি গাছ লাগানোর জন্য মানুষকে প্রভাবিত করছেন মুজিব জন্মশতবর্ষে।

প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের কয়েকটি সংস্থাকে ডেকে নিকট অতীতে চলমান উন্নয়ন যজ্ঞের সমন্বয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বিশ্ব স্বীকৃত পরিবেশ কন্যা। বহির্বিশ্ব থেকে পরিবেশ পদক অর্জন করে তিনি দেশের মানুষকে সম্মানিত করেছেন, সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তার অদম্য নেতৃত্বের স্বপ্টম্নজয়ী দেশে ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে, ঐশ্বর্যকে নষ্ট করে, সাধারণ মানুষের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, সাজানো পরিবেশকে বিপন্ন করে হাসপাতাল করার যে প্রক্রিয়া, তা তিনি অবশ্যই অনুমোদন করতে পারেন না।

মানুষের ফুসফুস ধ্বংসের এই অপতৎপরতা থামাতেই হবে। ফুসফুস এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে ধ্বংস করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা হাসপাতাল! মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে বৈপরীত্যের এসব কর্ম গ্রহণযোগ্য নয়। যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন লক্ষ্যকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য সক্রিয়, তাদের চিনে রাখতে হবে।

সবুজের গর্ভে নয়, শহরতলিতে মুক্ত জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণ করা হোক। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হোক। তাতে রোগী এবং শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে। সুরক্ষিত হবে পরিবেশের স্বাস্থ্য। নিয়ন্ত্রিত হবে তাপমাত্রা। নিয়ন্ত্রিত হবে কার্বনের বিস্তৃতি। সুরক্ষিত হবে নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্য। অপিজেনের ঐতিহ্যবাহী কারখানা সিআরবির শিরীষতলাকে ধ্বংসের প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দেওয়া হোক। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নামে করপোরেট সিন্ডিকেটের পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হোক। এ রকম কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের জবাবদিহিতায় আনা হোক- এটি নগরবাসীর প্রত্যাশা।

বিষয় : সিআরবি শিরীষতলা

মন্তব্য করুন