দেড় বছর ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতি ও অন্যান্য কারণে শিক্ষায় কিছু প্রশাসনিক সংকট আমরা দেখছি। বিশেষ করে বিদ্যালয় পরিচালনাগত কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।

প্রথমেই বলা যাক করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ নিয়ে। বর্তমান প্রবিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির মেয়াদকাল দুই বছর। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান অ্যাডহক কমিটি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে একাধিকবার অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। ছয় মাস পর পর এভাবে অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় করোনা পরিস্থিতির কারণে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। দেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষাকল্পে ম্যানেজিং কমিটি/অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষে বারবার অ্যাডহক কমিটি গঠন না করে পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি গঠণের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত।

একই সঙ্গে অনুমতিবিহীন প্রতিষ্ঠান স্থাপন/পরিচালনা-সংক্রান্ত বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ তারিখের ৩৭.০০.০০০০.০৭২.৪৪.০৩০.১৫(অংশ)-৪১৭ নং স্মারকের পত্রে মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা চালু করা যাবে না- এমন নির্দেশনা সংবলিত বিজ্ঞপ্তি জারি হলেও মাঠ পর্যায়ে এটির তেমন কোনো প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়নি। অন্যদিকে অনুমতিবিহীন প্রতিষ্ঠানেও বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরণের জন্য এনসিটিবির নির্দেশনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির এ জাতীয় পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। দেশের সব জেলা/উপজেলায় অনুমতিবিহীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে- এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। শুধু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অনুমতিবিহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা অসম্ভব।

পাশাপাশি কমিটিবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিকক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষর-সংক্রান্ত বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ আগস্ট ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে জারিকৃত উপজেলা থেকে আঞ্চলিক কার্যালয় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আদেশে কমিটিবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অর্পণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত আদেশে কমিটিবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন বিলে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অর্পণ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা বোর্ড এ ক্ষমতা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর অর্পণ করে থাকে। ফলে একই বিষয়ে দুই ধরনের নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নিয়েও বলা দরকার। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ম্যানেজিং কমিটি আছে কি-না তা অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ০৮/০২/২০০৩ খ্রি. তারিখের শিম/শা:১০/২৫ মাসিক সমন্বয় সভা-১/৯৮/৯৬(৭০০)-শিক্ষা স্মারকে শুধু জেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুলগুলোর জন্য ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়। জেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুলগুলোর জন্য ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা থাকলে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজনীয়তা না থাকার যৌক্তিকতা কতটুকু? এ বিষয়ে জেলা ও উপজেলার সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই বিধান থাকাই সমীচীন।

শিক্ষা প্রশাসনের পদবি পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবি 'জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার', উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবি 'উপজেলা শিক্ষা অফিসার'। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবি 'জেলা শিক্ষা অফিসার' এবং উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবি 'উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার'। দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুটি মন্ত্রণালয়ের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার পদবি পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক।

কওমি মাদ্রাসার তথ্য রাখাও আবশ্যক। সরকার কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে। অথচ দেশে কওমি মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা কত, তা মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই। বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এসব মাদ্রাসার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয় মাত্র। এদের অধিকাংশ মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন কিংবা নিয়মিত জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয় না। এ জাতীয় মাদ্রাসাগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা সময়ের দাবি।

আঞ্চলিক উপ-পরিচালক ও আঞ্চলিক পরিচালকের দপ্তরের কাজের সমন্বয় সাধন করা জরুরি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ৯টি অঞ্চলে আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের দপ্তর ও পৃথক আঞ্চলিক পরিচালকের দপ্তর রয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে পৃথক দুটি দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করা আবশ্যক। তাছাড়া পৃথক দুটি দপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন দপ্তর/বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এ জাতীয় অসঙ্গতিগুলো দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়ন করা অনেকাংশেই সম্ভব।

বিষয় : শিক্ষায় প্রশাসনিক সংকট

মন্তব্য করুন