বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনে শিক্ষার্থীদের অবদান অপরিসীম। কল্যাণময় যে কোনো আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে নিঃস্বার্থভাবে। ফলে জনসম্পৃক্ততা বাড়ে, সর্বস্তরের লোকজন তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। কাঁধে কাঁধ রেখে, হাতে হাত মিলায়। ফলে আন্দোলনের সুফল আসে তড়িৎগতিতে। লক্ষণীয় যে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মাস্ক ছাড়া ঘোরাঘুরি করা, আড্ডা দেওয়া, গল্প করা, যেখানে-সেখানে থুথু ফেলা ইত্যাদি চলছেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত কঠোর মনিটরিং করছেন, জরিমানা করছেন। সরকারিভাবে সতর্ক করা হচ্ছে, 'ঘরের বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।' বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার বলছে, 'মাস্ক পরলে জীবাণুর ড্রপলেট থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।' 

বিজ্ঞানীরাও দাবি করছেন, 'করোনা বাতাসে ছড়ায়।' কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হয়, এসব কথার দিকে কারও কোনো মনোযোগ নেই। দেশের আর্থিক বিবেচনায় ধনী-গরিব, ফকির-মিসকিন নির্বিশেষে সকলেরই মাস্ক ব্যবহার করার সক্ষমতা আছে। তবুও গ্রামেগঞ্জে এবং শহরের অলিতে-গলিতে অনেকেই ঘোরাঘুরি করছে মাস্ক ছাড়া। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন না পাওয়া পর্যন্ত মাস্ক পরিধানে সাধারণ মানুষকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিস্থিতি এখন এত ভয়াবহ যে, দেশের প্রত্যেক জেলা এমনকি গ্রামেগঞ্জে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, ৫৭ জেলাতেই এখন উচ্চ সংক্রমণ চলছে। বিগত সপ্তাহগুলোতে সারাদেশে সংক্রমণ শনাক্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের একটি গবেষণায় জানা গেছে, সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা ঘটছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভারতীয় এই ডেলটা ভ্যারিয়েন্টকে গোটা বিশ্বের জন্যই হুমকি হিসেবে মনে করছে। কিন্তু এরই মধ্যে করোনার নতুন ধরন 'ল্যামডা' বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক শুরু করেছে, যা ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও বিপজ্জনক। গত চার সপ্তাহে এ ভাইরাসটি অন্তত ৩০টি দেশে শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ধরনটি মূলত পেরুর। তবে আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডর এমনকি যুক্তরাজ্যেও শনাক্ত হয়েছে। গত ১৪ জুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রজাতিকে 'ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট' নাম দিয়েছে। এটিকে করোনার চতুর্থ ঢেউ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশে কঠোর লকডাউন চলছে। কিন্তু কঠোর লকডাউনে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের ঘরে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। তারা কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারিভাবে জাতীয় সেবা হট লাইনে (৩৩৩) লাখ লাখ কলের বিপরীতে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। টিসিবির দেওয়া স্বল্পমূল্যের পণ্যও বিপুলসংখ্যক অভাবি লোকের বিপরীতে খুবই কম। তাই অনেকের দিন কাটছে খুব কষ্টে। ফলে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। এদিকে, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় পরিবহন ও কুলি শ্রমিকরা আগেই বেকার হয়ে পড়ছেন। রিকশা, ভ্যানগাড়ি, সেলুন, দর্জিশ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির দিনমজুররা পড়েছেন বিপাকে। তার ওপর লকডাউনের অজুহাতে প্রতিদিন বাড়ানো হচ্ছে চাল, তেল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এতে লকডাউন নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাই পেটের দায়ে এবং অভাবের তাড়নায় কর্মহীন মানুষ নিরুপায় হয়ে কঠোর লকডাউন অপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসছে কাজের সন্ধানে। কিন্তু কারও মুখে নেই মাস্ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত। যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। করোনা সংক্রমণে বিশ্বে ১৬তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। উচ্চ শনাক্তের হারই বলে দেয়, বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের অনেকেই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাস্ক ছাড়া। অথচ অনেক উন্নত দেশ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ককেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, মোট জনসংখ্যার ৯২ শতাংশ সিঙ্গাপুরবাসী নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করছেন। এই সংখ্যা স্পেনে ৯০, থাইল্যান্ড ৮৮, হংকং ৮৬, জাপান ৮৬ শতাংশ। এটুআই ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় বাংলাদেশে এই সংখ্যার হার ৩০ শতাংশ। তবে সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহারের হার মাত্র ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মতো। অবশ্য অনেকেই মাস্ক ব্যবহারের পদ্ধতি এবং কতক্ষণ তা পরবেন তা জানেন না। এটা ঠিক, নিজে মাস্ক পরলে সুরক্ষা মেলে এবং সামনের ব্যক্তিটা মাস্ক পরে থাকলে সুরক্ষাবলয় আরও দৃঢ় হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটা রোগ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই মাস্ককে হেলাফেলা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) মতে, সর্বজনীন মাস্কিং নীতি অবলম্বন করলে ভবিষ্যতে লকডাউনগুলোকে এড়াতে এবং করোনা প্রতিরোধে অনেক সহায়তা হবে।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে ১৫ জুলাই থেকে লকডাউন শিথিল করে যানবাহন চলাচল এবং শপিংমল খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। ফলে গরুর হাটে মানুষ যাবে দলে দলে, শপিংমলে হবে গাদাগাদি, লঞ্চ-স্টিমারের হবে উপচেপড়া ভিড় এবং ঈদগাহে হবে বিশাল জমায়েত। যতই বলা হোক, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এগুলো পরিচালনা করতে হবে- আসলে বাস্তবে তা মোটেও সম্ভব হবে না। আমরা দেখেছি, কঠোর লকডাউনের শুরুতে জনগণ তা যথাযথভাবে পালন করতে পারলেও পর্যায়ক্রমে তা আর সম্ভব হয়নি। কারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের জন্যই এমনটি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামবাসী, দিনমজুরসহ অধিকাংশ লোকজন এখনও মনে করে, করোনাভাইরাস গরিবদের জন্য নয়। তাই 'রাখে আল্লাহ মারে কে'- এই কথায় তারা বিশ্বাসী। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় ও মহল্লায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ। তাই সংক্রমণের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গ্রামে-শহরে-বাড়িতে শিক্ষার্থীরা যে যেখানে আছে, সেখান থেকেই মাস্ক পরিধানের ব্যাপারে নিজের আশপাশের লোকজনকে বোঝানো এবং মাস্কই যে প্রাথমিক রক্ষাকবচ সে সম্বন্ধে অবহিত করতে পারে। এ ছাড়া মসজিদের ইমাম এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রধান। 

এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণও এ ব্যাপারে প্রচারণা চালাতে পারেন। মাস্ক ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারাদেশে একযোগে একদিন ৫ মিনিট অথবা ১০ মিনিটের জন্য মাস্ক ক্যাম্পেইনের প্রতীকী প্রোগ্রাম করা যেতে পারে নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়েই। প্রধানমন্ত্রী নিজে নেতৃত্ব দিলে জনগণ তা শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করবে।


বিষয় : ক্যাম্পেইন মাস্ক শিক্ষার্থী

মন্তব্য করুন