মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা; যা আমাদের দেশে কোরবানির ঈদ নামেই বেশি পরিচিত। আরবি করব বা কোরবান শব্দটি উর্দু ও ফার্সিতে কোরবানি নামে রূপান্তরিত, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। আজহা শব্দটির অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। উল্লিখিত শব্দ এবং অর্থগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ত্যাগ বা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের যে চেষ্টা করা হয় তাকেই কোরবানি বলা হয়। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে স্বচ্ছল মুসলিমরা মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য পশু কোরবানি করেন।

কোরবানি আল্লাহ প্রদত্ত বিধান, যা আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর যুগেই চালু হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান রেখেছি' (সুরা হজ :আয়াত-৩৪)। আজকের মুসলিম সমাজে যে কোরবানির প্রচলন রয়েছে, তা মূলত আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক নিজ পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির সূত্র ধরে। আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম (আ.)-এর পরীক্ষা নিয়েছেন ছেলেকে কোরবানির আদেশ দিয়ে। যখন সেই পরীক্ষায় তিনি সফল হলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইলের পরিবর্তে অন্য পশু জবেহ করে পুরস্কৃত করলেন ইব্রাহিম (আ.)-কে। আর এইভাবেই প্রতিটি সৎ কর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকেন মহান আল্লাহ।

কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অনন্য এক ইবাদত। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোরবানির দিনে মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহ তায়ালার কাছে এত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কোরবানি করা। এ থেকেই বুঝা যায় কোরবানি করা কত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এ বিষয়ে এত তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় কোরবানি কবুল হওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক শর্ত আছে। আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাদের কোরবানির আদেশ দিয়ে দেখেন, তিনি যা দান করেছেন তা ত্যাগ স্বীকারে তার বান্দারা রাজি কিনা? আবার কী নিয়তে বান্দারা কোরবানি করছে, তাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।

বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যেই গত বছরের ন্যায় এ বছরও এদেশের অসংখ্য মানুষ কোরবানি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যাতে মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ মহান ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন। সংবাদমাধ্যমগুলোও নিয়মিত সংবাদ প্রচার করছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে পশুর হাট বসেছে এবং আগ্রহীরা নিজেদের মতো করে কোরবানির পশু কেনার চেষ্টা করছেন। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী একক বা যৌথভাবে কোরবানি দিলেও কিছু মানুষের আচরণ ও উদ্দেশ্য যেন কেবল পার্থিব, সৃষ্টিকর্তার আদেশের বিষয়টি বড্ড গৌণ। বরং নিজেকে সমাজের কাছে বিশেষভাবে উপস্থাপন করাই যেন মূল উদ্দেশ্য। যদি কারও লক্ষ হয় দেশের বা বাজারের সবচেয়ে দামি গরুটা কিনবেন যাতে সবাই বাহবা দেয়, তাহলে এটা কি কোরবানি? অনেকে সামাজিক মাধ্যমে নিজের কেনা গরুর সঙ্গে ছবি তোলে সবাইকে দেখান, এটা কি সৃষ্টিকর্তার ইবাদত? কোনো ইবাদতই লোক দেখানো হতে পারে না, এ বোধশক্তিটুকুও আমরা হারিয়ে ফেলছি। কোরবানি দেয়া হবে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য, মূল্য বা পশুর আকার ধর্তব্য নয়। তবে কেউ তার হালাল সম্পদ থেকে কোরবানির জন্য নিজের সামর্থ্য ও ইচ্ছা অনুযায়ী অনেক টাকা ব্যয় করতে পারেন কিন্তু সেটা অপ্রকাশিত থাকাই উচিত।

আবার অনেকে কোরবানির পশুর মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়িয়ে বলেন, যেন তাতে ইজ্জত বাড়ে। কিছু মানুষ আছেন যারা গায়ে পড়ে নিজের কোরবানির গল্প করেন, উদ্দেশ্য একটাই নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করা ও অন্যদের হেয় করা। অথচ এ মানুষগুলো ভুলে যান যে, আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে কোরবানি করা তাদের আবশ্যক কর্তব্য, গল্প করার বিষয় নয়। আল্লাহ চাইলে ধনীকে ভিখারি করতে পারেন- এ সত্যটা অনেকের মনে থাকে না।

কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য কি কেবল হালাল সম্পদের মাধ্যমে পশু কোরবানি করা? এর মাধ্যমে ব্যক্তি যেমন তার সম্পদ ব্যয় করবে, তেমনি নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। কোরবানি মানে কেবল অনেক অর্থ ব্যয় করে পশু জবাই করা নয়, এর অনেক গভীর মর্মার্থ আছে। এর মাধ্যমে আমাদের ভেতরের পশুটাকেও কোরবানি দিতে হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য- এই ষড়রিপু প্রতিনিয়ত মানুষকে তাড়িত করে। এ রিপুর তাড়নাতে আমরা ভুলে যাই যে কোরবানি দিতে হয় হালাল সম্পদ দিয়ে। দুর্নীতি, কালোবাজারি, পণ্যে ভেজাল, মাস্তানি, সরকারি-বেসরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদির মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় জমিয়ে কোরবানি দেওয়ার কোনো সার্থকতা নেই? নিজের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি উদাসীন থেকে কি কেবল কোরবানি দিয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করা যায়?

করোনা ও লকডাউনে এদেশের লাখ লাখ মানুষ কঠিন সময় পার করছে, অনেক পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাপন করছে। হয়তো এমন অনেক মানুষ আমাদের খুব কাছেই আছে, কিন্তু রিপুর তাড়নায় তাদের দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করছি না। তাদের খোঁজ নেওয়া, সহযোগিতা করা কি কোরবানি নয়? অনেক দামি পশু কোরবানি করার চেয়ে কিছু মানুষ বা পরিবারের আহারের ব্যবস্থা করা বা আর্থিক সহযোগিতা করা অনেক বড় ইবাদত। আল্লাহ এভাবেই আমাদের পরীক্ষা করেন। তাই আসুন পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের পশুটাকে কোরবানি করি। অসৎ পথে অনেক সম্পদের অধিকারী হওয়ার চেয়ে সৎ পথে হালাল সম্পদের মালিক হতে চেষ্টা করি। তবেই আমাদের কোরবানি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হবে।

বিষয় : চতুরঙ্গ আবুল কাশেম উজ্জ্বল

মন্তব্য করুন