ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫ এ ধারা বিলুপ্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা অনেকেই বলেছিলেন, এটা বোধহয় বিজেপির নির্বাচনী চমক। শুধু তাই নয়, অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, নিজেদের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে কাজে লাগাতেই স্থানীয়দের মতামতকে উপেক্ষা করে কাশ্মীর উপত্যকার বিশেষ অধিকার খর্ব করছে বিজেপি পরিচালিত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সাবেক জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ গঠনেরও বিরোধিতা হয়। মজার কথা, দেশ-বিদেশে কাশ্মীর নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনায় ঝড় বইলেও স্থানীয় মানুষ কিন্তু খুশি। তারা গত দু-বছরে নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছেন, ভারত সরকার জম্মু, কাশ্মীর এবং লাদাখের সাধারণ মানুষের উন্নয়নের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই সেখানে গত দু-বছরে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক।

সমালোচকরা যাই বলুন না কেন, কাশ্মীরের বেশিরভাগ মানুষই চাইছিলেন বিলোপ করা হোক ৩৭০ ধারা। কাশ্মীরি পণ্ডিত, সেখানে বসবাসকারী শিখ, যাযাবর গুজ্জর ও বাকরওয়ালদের দীর্ঘদিন ধরেই ৩৭০ ধারা নিয়ে আপত্তি ছিল। কিন্তু কেউ শোনেনি সেই আপত্তির কথা। লাদাখের বৌদ্ধরাও চাইছিলেন ৩৭০ ধারা বিলোপ হোক।  এমনকি, শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ও চাইছিল উঠে যাক ৩৭০ ধারা। জম্মু ও কাশ্মীর তো বটেই, লাদাখেরও সিংহভাগ মানুষ চাইছিলেন ভারতীয় সংবিধান থেকে বিশেষ ধারাটির বিলুপ্তি। কিন্তু তাদের সেই চাহিদা বহুকাল কোনো সরকার পূরণ করার কথা ভাবেনি।

অথচ, ৩৭০ ধারার ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল উপত্যকার মানুষকে। এই বিশেষ ধারার জন্যই জম্মু উপত্যকার প্রায় ১০ লাখ মানুষ এতোকাল নাগরিকত্ব পাননি। তাদের মধ্যে ধারণা জন্মেছিল- মুসলিম ঘরে জন্ম না নিলে ভারত তাদের আর নাগরিকত্ব দেবে না। ১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু পাঞ্জাবি, বাল্মিকী সম্প্রদায়ের দলিত ও তফশিলি, নেপালি হিন্দুরা জম্মুতে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও এতোকাল বঞ্চিত ছিল কাঙ্ক্ষিত নাগরিকত্ব থেকে। কারণ ৩৭০ ধারা তাদের নাগরিকত্বের অধিকারকে অস্বীকার করেছে।

তাই অন্তত ১০ লাখ মানুষ বংশ পরম্পরায় কাশ্মীরে বসবাস করলেও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কাশ্মীরের নারীরা ভিন্ন রাজ্যের ছেলেদের বিয়ে করলেও সমস্যায় পড়তেন এই আইনের জন্য। আসলে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ উপত্যকার মানুষদের ভারতের মূলধারায় অর্থবহভাবে নিয়ে আসা জরুরি ছিল। গোটা দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মিলনের স্বার্থেই জরুরি ছিল এই বিশেষ ধারাটিরবিলোপ। প্রতিরক্ষা, মুদ্রা ব্যবস্থা আর পররাষ্ট্র বিষয়ক এই তিনটি অধিকার ছাড়া সাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের হাতে প্রায় সব ক্ষমতাই ছিল। ভারতের জাতীয় সংসদের তৈরি করা ৮০ শতাংশ আইনই কার্যকর করা যেতো না সেখানে। নেতারা ক্ষমতা ভোগ করলেও সাধারণ মানুষ ছিলেন সরকারি সুবিধা বঞ্চিতদের দলে। 

কারণ জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা ছিল উচ্চবংশীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের হাতে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন নিয়ে তাদের কোনও মাথা ব্যাথা ছিলো না।  সাবেক জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সাধারণ মানুষের মূল চাহিদাও প্রতিফলিত হতো না নেতাদের কথাবার্তায়। ক্ষমতার লোভে উপত্যকার মানুষকে নেতারা ভোটে জেতার কাজেই শুধু ব্যবহার করতেন। ২০ লাখেরও বেশি অ-কাশ্মীরি মুসলিম, গুজ্জর যাযাবর ও বাকরওয়ালদের সঙ্গে কিছু অভিজাত পরিবারের প্রতিনিধি এই নেতারা শুধু দুর্নীতি, অসৎ-আচরণ, স্বজনপোষণের মাধ্যমে বঞ্চিতই করে রেখেছেন দিনের পর দিন। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারটুকুও সুরক্ষিত ছিলোনা। গরীব মানুষ শোসনের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে এতোকাল।

আদর্শের বুলি শুনিয়ে বক্তৃতাবাজির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ব্যাপক পার্থক্য ধরা পড়ে কাশ্মীরে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কাশ্মীরের মুষ্টিমেয় কয়েকটি পকেটে নিজেদের কিছুটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেও সাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির বিরোধী। জম্মু বা লাদাখ উপত্যকার মানুষ কখনওই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করেনি।  সাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের মোট ভূমিপুত্রদের ৮৫ শতাংশ আর বর্তমান জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কিন্তু এই দুই উপত্যকারই বাসিন্দা। শুধু তাই নয় কাশ্মীর উপত্যকারও ধর্মনিরপেক্ষ, উদার ও প্রগতিশীল মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি কাশ্মীরি শিয়া মুসলিম, শিখ, গুজ্জর ও বাকরওয়াল সম্প্রদায়ও কখনওই বিচ্ছিন্নতাবাদী মতবাদকে সমর্থন করেনি। পাকিস্তানি মদদপুষ্ট জিহাদি কার্যকলাপ, হিংসা বা উগ্রপন্থারও বিরোধিতা করেছেন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। 

৩৭০ ধারা বিলুপ্তিকে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ তাই স্বাভাবিক কারণেই মেনে নিয়েছেন। তাই তারা কোনও প্রতিবাদেও সামিল হননি। বরং গত দু বছর ধরে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষও কেন্দ্রীয় সরকারকে নতুন কাশ্মীর নির্মাণে সহায়তা করে চলেছেন। তারাই চাইছেন, ভারত সরকার উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করুক। ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখ এখন উন্নয়নের মূল স্রোতে রয়েছে। তাই প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের বদলে সেখানকার মানুষ এখন সরকারকে সহযোগিতা করছে। 

জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত রাজ্যে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর গ্রামাঞ্চলে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয় ভোট। গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটে জনসাধারণ উৎসবের মেজাজে অংশ নেন। তারা নির্বাচিত করেন নিজেদের এলাকার জনপ্রতিনিধিকে। তারা বুঝিয়ে দেন, হরতাল বা অবরোধের রাজনীতি ভুলতে বসেছে গোটা উপত্যকা। বাস্তবেও কমেছে জঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও। স্থানীয়রা মদদ দিচ্ছে না আর জঙ্গিবাদকে। তাই পঞ্চায়েত নির্বাচন শেষ হয়েছে পুরোপুরি শান্তিতে। ৩৭০ ধারা বিলোপের পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, কাশ্মীরে ফের শুরু হবে অবাধ রক্তপাত। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, গত দু দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সময় কাটাচ্ছে কাশ্মীর উপত্যকা। সেখানকার মানুষ এখন নিজেদের পরিবার ও পরিজনদের নিয়ে আগামীতেও সুখে দিন কাটানোর স্বপ্নে মেতে রয়েছেন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিরতা জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে মারাত্মক খুশির কারণ।   

জম্মু ও লাদাখের পাশাপাশি মানুষ এখন আরও বেশি করে ভারতের মূলস্রোতে বিরাজ করছে। উন্নয়নের প্রশ্নে সরকারের ওপর তারা ফিরে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস। সেখানকার মানুষ এখন চাইছেন শুধিু শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধি। বহুকাল ধরে নেতিবাচক রাজনীতি আর রক্তাক্ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পর তারা এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারত সরকার সেই স্বপ্ন দেখার সুযোগটাই করে দিয়েছে কাশ্মীরের মানুষদের। বড়লোক রাজনীতিবিদদের একাধিপত্য খর্ব করে ভারত সরকার এখন নিজের হাতেই সেখানকার উন্নয়নে ব্রতী হয়েছে। আর এটা বুঝতে পেরেছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। অপপ্রচারে কান না দিয়ে তাই তারা নতুন করে বাঁচতে চাইছে। চাইছে, গোটা দেশের সঙ্গে নিজেরাও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সামিল হতে। দু-বছর ধরে অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধিকে পাখির চোখ করে এগিয়ে চলেছে কাশ্মীর।