স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গঠনে উচ্চশিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন এবং সে লক্ষ্যে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন পাস করেন। সেই সময়ে ইউজিসির নিয়ন্ত্রণে ছিল মাত্র ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় :ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট। দেশে উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে সরকার ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করে এবং পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রতিষ্ঠা করে উচ্চশিক্ষার জন্য সবার দ্বার উন্মুক্ত করে। ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন (৪৬তম) অনুযায়ী, ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পাবলিক এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৫১টি :৪৬টি পাবলিক এবং ১০৫টি বেসরকারি। দেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন।

গবেষণা খাতে ব্যয়, গবেষণা বৃত্তি প্রদান, গবেষণা প্রবন্ধের প্রকাশনা, তত্ত্বাবধায়কদের দক্ষতা- সবই হচ্ছে উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়নের অন্যতম সূচক। উন্নত বিশ্বে এসব সূচকে যেসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান (সরকারি বা বেসরকারি) এগিয়ে রয়েছে, তারাই উচ্চতর ডিগ্রি 'পিএইচডি' প্রদান করে থাকে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক উচ্চমানের কলেজও রয়েছে, যারা পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে থাকে। এটা অনেকটা ইতিবাচক যে, বাংলাদেশের কিছু প্রাগ্রসর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আগের তুলনায় এমনকি প্রথম সারির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে গবেষণা খাতে তাদের বরাদ্দ অনেক বেশি রেখেছে এবং তাদের গবেষণার মানও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ফলে, বিগত ১০ বছরের একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর পড়ার আগ্রহ অনেক বেশি। ২০১৯ সালে ৪৮২ ও ১৪৬৭ বিদেশি শিক্ষার্থী যথাক্রমে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল (ইউজিসি প্রতিবেদন-২০১৯)।

গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ ও সফলতার সঙ্গে তার বাস্তবায়ন, গবেষণা বৃত্তি প্রদান এবং গবেষণায় ব্যয়- এ সবকিছুই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মানকে প্রতিবিম্বিত করে। গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশের শীর্ষে থাকা ৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একত্রে যা ব্যয় করেছে, তার চেয়েও বেশি ব্যয় করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০১৯) অনুযায়ী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তার মোট ব্যয়ের ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ গবেষণার জন্য ব্যয় করেছে। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৯ সালে গবেষণা খাতে ও গবেষণা বৃত্তি বাবদ ব্যয় করেছে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৫ কোটি এবং ৪ দশমিক ৯ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় করেছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ২, ৪ দশমিক ৪, ২ দশমিক ৭৫ এবং ২ দশমিক ২৭ কোটি টাকা। শিক্ষা ও গবেষণার মানদণ্ড হিসেবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে গবেষণা প্রকাশনা এবং সে ক্ষেত্রেও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্প ও বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫৬ ও ৪৯৭।

ইউজিসি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৯ সালে তাদের সর্বমোট গবেষণা সংখ্যা ছিল ১১৩৫। এ ছাড়া বিভিন্ন পদে পিএইচডি/সমমান ডিগ্রি শিক্ষকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, যা নর্থ সাউথ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৪১৪ এবং ২০৯। তাদের অনেকেই নর্থ আমেরিকা এবং উন্নত বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রথম সারির আরও দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, যেখানে যথাক্রমে ১৯০ ও ১৫২ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক কর্মরত এবং তাদের অনেকেই স্থায়ী অধ্যাপক। গবেষণা খাতে তারা ২০১৯ সালে ব্যয় করেছে যথাক্রমে ৪ কোটি ৩৯ লাখ এবং ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়াও কিছু অগ্রগামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সুনাম বা খ্যাতি অর্জন করার ক্ষেত্রে মানসম্পন্নম্ন গবেষণা কার্যক্রমে অবদান রাখছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং সার্বিক মানোন্নয়নে অভিজ্ঞ অধ্যাপকের ভূমিকা ও দায়িত্ব অপরিসীম। দেশের প্রাগ্রসর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ শিক্ষক অধ্যাপক পদে কর্মরত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ২০১৯ সালের হিসাবে সর্বমোট ৮০৫ জন অধ্যাপক কর্মরত। ২০১৯ সাল থেকে ২ বছর অতিবাহিত হওয়ার ফলে বর্তমানে উপরোল্লিখিত তথ্যের কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি প্রোগ্রাম না থাকার ফলে তাদের স্নাতকোত্তর প্রার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল/পিএইচডি পর্যায়ে আবেদন করে থাকেন। ইউজিসি কর্তৃক এ নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, কারণ শুরুতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ছিল কম এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গবেষণার মান বজায় রাখতে সক্ষম হবে না- এ আশঙ্কায় ইউজিসি কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার অনুমতি দেয়নি। তবে, মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির ওই নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে, যেহেতু প্রাগ্রসর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার বর্তমান অবস্থান ভিন্ন। এটা অনস্বীকার্য, দেশের সব সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমমানের নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গবেষণাই হয় না, কিন্তু পরিচয় তার বিশ্ববিদ্যালয়। তা ছাড়া প্রথম সারির অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং গবেষণা ক্রমান্বয়ে গুরুত্ব হারাচ্ছে। অন্তত লন্ডনভিত্তিক কিউএস পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক অবস্থান দেখে তাই মনে হয়। পিএইচডি প্রোগ্রাম ছাড়া একটি ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণতা পায় না।

কাজেই, আইকিউএএস ও ইউজিসির পূর্ণ তদারকির মাধ্যমে পরীক্ষামূলক দেশের পুরোগামী কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক হবে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রয়োজনে একটি দক্ষ ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ গড়ে তোলার স্বার্থে প্রাইভেট ও পাবলিক উভয় বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানভিত্তিক ও গঠনমূলক অবদান রাখতে পারবে। তা ছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১০ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। দুই বছর ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় যে অচলাবস্থা, তা থেকে শিক্ষা খাতকে উদ্ধার করতে হবে। সুতরাং, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান বজায় রাখতে এবং তাদের গবেষণা খাতকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার ২০২১-২২ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিক্ষা খাতকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে জাতির প্রত্যাশা। উচ্চশিক্ষার বাজেটে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি যেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকার থেকে নূ্যনতম আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, সে দিকটাও সরকার ভেবে দেখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।