সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের লকডাউনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, লকডাউনের কাজে নিয়োজিত পুলিশ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা একজন মুদি দোকানদারকে লকডাউন চলাকালে দোকানের ভেতরে অবস্থান করার অপরাধে আর্থিক দণ্ড প্রদান করেন এবং তাকে দোকানে না থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন। দ্বিতীয় দিন আবার তাকে দোকানের মধ্যে অবস্থান করতে দেখে প্রশাসনিক কর্মকর্তা জরিমানা করার পাশাপাশি তার মালামাল ক্রোক করার নির্দেশ দেন। 

দোকানের ভেতর তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। পরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিজে দোকানের মধ্যে তাকিয়ে দেখতে পান, দোকানদারের ছোট্ট মেয়ে এবং অসুস্থ স্ত্রী অবস্থান করছে। সেখানেই তাদের রান্না হয়। এভাবেই চলে তাদের জীবন। এই অবস্থা দেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে গতকালের জরিমানার অর্থ দোকানদারকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। জরিমানার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে কর্মকর্তা যখন ফিরে যাচ্ছেন তখন দোকানদার কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেন- স্যার, স্টে হোম এর অর্থ কি? এই ভিডিওটির মাধ্যমে যে মেসেজটি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে সেটি হলো আমাদের মতো দেশে লাখ লাখ মানুষ আছে যাদের ঘরবাড়ি নেই, কিংবা যারা দিন আনে দিন খায়। সেসব মানুষের কাছে লকডাউনের নির্দেশনা মেনে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ সত্যিই কঠিন একটি বিষয়।

এটি যেমন একটি বাস্তবতা, ঠিক আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে করোনা অতিমারির ভয়াবহতা মোকাবিলার ক্ষেত্রে লকডাউন বাস্তবায়ন করা এবং জনগণের বাসায় থাকা নিশ্চিত করা। কারণ পৃথিবীব্যাপী সব জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক কিংবা গবেষকরা শত চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ আবিস্কার করতে পারেনি। কয়েকটি কোম্পানি যদিও করোনার টিকা বাজারজাত করেছে, কিন্তু তারা কেউই এই টিকার মাধ্যমে ১০০% সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারার দাবি করেনি। তবে এটা ঠিক যে, এই টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে মৃত্যুর হার এবং করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ভয়াবহতার মাত্রা কম। ফলে সরকার চেষ্টা করে চলেছে যত দ্রুত সম্ভব দেশের সব জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে এসে সুরক্ষা প্রদানের জন্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে করোনা মোকাবিলার দায় কি শুধুই সরকারের? সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে হাসপাতালে সাধারণ শয্যা ও আইসিউ শয্যা বাড়ানো, অধিক সংখ্যক ভেন্টিলেশন মেশিন স্থাপন ও অপিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য। এমনকি নতুন হাসপাতাল তৈরি করছে করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য। বিনামূল্যে করোনা টেস্টের সুবিধাসহ হাসপাতালগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশের ক্ষেত্রে এই সেবা প্রদান কঠিন হলেও সরকার ইতিবাচকভাবে জনগণকে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের সবার মনে রাখা উচিত করোনাভাইরাস মোকাবিলার দায় শুধু সরকারের একার নয়। এটি এমন একটি ভাইরাস যা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য জনগণকে সচেতন আচরণ করতে হবে। দুঃখের বিষয় হলো বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগ অংশের এই নিয়ম মানার ক্ষেত্রে কোনো রকম মাথাব্যথা নেই।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, দুই থেকে তিন সপ্তাহ কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের চলাচল যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জনগণ যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, তবে সংক্রমণকে চেইন ভাঙা সম্ভব। করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় আমরা এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

ফলে এই মুহূর্তে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটি হলো সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে করোনার ভয়াল থাবা যখন অর্থনীতিকে এবং মানুষের জীবন-জীবিকাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে তখন বেসরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে অনেকে এগিয়ে এসেছেন সরকারকে এবং জনগণকে সহায়তার জন্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই রকম উদ্যোগ খুব বেশি না হলেও কিছু উদাহরণ রয়েছে। ফলে এখন সময় সবার এগিয়ে আসার। সবাই এগিয়ে এসে জনগণকে এবং সরকারকে সাহায্য করার মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।

করোনা মোকাবিলা করতেই সরকার যখন ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে ঢাকা শহরে দেখা গেছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। গত এক সপ্তাহে প্রায় দেড় হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে দেশে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে এটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ এতদিন পর্যন্ত যারা জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছিলেন তারা হয়তো করোনার পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন। করোনা এবং ডেঙ্গুর চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্নমুখী হওয়ার কারণে এখন যারা জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষত ঢাকা শহরে তাদের জন্য করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষা করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনকে মশা নিধনের ক্ষেত্রে গত কয়েক মাস ধরে খুব তৎপর থাকতে দেখা গেছে। তবে তাদের আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব ছিল নিজের বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে পরিস্কার রাখা।

আমরা বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব পালন করি না। আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি ঢাকায় বড় বড় কনস্ট্রাকশন সাইটে পানি জমে থাকার কারণে ডেঙ্গুর লাভা জন্ম নিয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের তদারকি দল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধরনের দণ্ড প্রদান করেছে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সবারই কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যদি সবাই নিজের বাড়ি ও আঙিনা পরিস্কার রাখতে পারতাম তাহলে এই করোনার মধ্যে ডেঙ্গু আরেকটি বিপদ ডেকে নিয়ে আসত না। আমরা সবাই জানি এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তৈরি হয়। এমনিতেই সরকার করোনার ভয়াল থাবা থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। এর সঙ্গে ডেঙ্গু যদি ভয়াবহ আকার ধারণ করে তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও কঠিন হবে। ফলে আমাদের সবার উচিত করোনা সুরক্ষাবিধি মেনে এবং নিজের আঙিনা পরিস্কার রেখে করোনা ও ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং অপরকে সুরক্ষিত থাকতে সহায়তা করা।

অতিমারি কিংবা মহামারি চলাকালীন সবকিছুর দায় সরকারের ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। সেই হীনমানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের উচিত, কোনো ধরনের দুর্যোগের সময় নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করা।