পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাবয়িত্রী এবং কারয়িত্রী প্রতিভার নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জন্মের পর একশ ষাট বছর অতিক্রান্ত, তাঁর মহাপ্রয়াণের পরও আমরা পেরিয়ে এসেছি আশি বছর, তবু পৃথিবীর মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথের অব্যাহত প্রভাব দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ বিপুল, লিখেছেন তিন হাজারের অধিক গান, এঁকেছেন দুই হাজারেরও অধিক চিত্র, প্রতিষ্ঠা করেছেন মানবকল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠান। দ্বিমাত্রিক এই প্রয়াস এবং উদ্যোগের কথা স্মরণে রেখেই আমি দেখতে চাই, ভাবতে ভালোবাসি রবীন্দ্রনাথকে। যাকে বলব বহুমাত্রিক সাহিত্যপ্রতিভা- রবীন্দ্রনাথ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, ব্যক্তিগত রচনা, ভ্রমণসাহিত্য, চিঠিপত্র, সংগীত- কোন রূপকল্পে না লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ? বাংলা কবিতাকে প্রাদেশিকতার সীমানা ছাড়িয়ে তিনি করে তুলেছেন আন্তর্জাতিক, বাংলা ছোটগল্পের নির্মাতা তিনি, বাংলা উপন্যাসে তিনি প্রথম দিয়েছেন আধুনিকতার স্পর্শ। নাট্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে তার অবদান ঐতিহাসিক ও দূরসঞ্চারী। সংগীত, চিত্রকলা, ভ্রমণসাহিত্য, চিঠিপত্র, ভাষাতত্ত্ব-বিষয়ক প্রবন্ধ, ব্যক্তিগত রচনা- সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথের ভুবনবিজয়ী সার্থকতা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চিরকালের পরম সম্পদ। সৃষ্টি-প্রয়াসে তিনি নিজেকেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন- পৌনঃপুনিকভাবে বাঁকবদল করেছেন আপন চিন্তাধারা ও রূপকল্পের।
প্রাচ্য-প্রতীচ্যের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা পরমজ্ঞানে আত্তীকরণ করে রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করেছেন বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত এক রূপ। সুদীর্ঘ সাধনায় সংস্কৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ প্রদান করেছেন, তা জন্ম দিয়েছে নতুন এক সংস্কৃতি, যার নাম দেওয়া যায় 'রবীন্দ্রসংস্কৃতি'। রবীন্দ্রসংস্কৃতি বৃহৎ অর্থে গভীর ব্যঞ্জনায় আধুনিক বঙ্গসংস্কৃতিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। বঙ্গসংস্কৃতি, ভারতসংস্কৃতি, বিশ্বসংস্কৃতি তথা মানবের সদর্থক শাশ্বত সংস্কৃতিস্রোতে অবগাহন করেই স্নাতক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে রবীন্দ্রসংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ভাষা জুগিয়েছেন, বুকে দিয়েছেন ভরসা, চোখে করিয়েছেন স্বপ্নকাজল আর চিত্তে সঞ্চার করেছেন আত্মবিকাশের অফুরান বাণী।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা ধারণ করে আছে মানবাত্মার সামূহিক ভাব। রোমান্টিক ভাববিলাস অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথ একসময় নেমে এসেছেন বাস্তব মানুষের কাছে, কঠিন মৃত্তিকায়, উচ্চারণ করেছেন আত্মমুক্তি ও মানবমুক্তির মাঙ্গলিক বাণী। কবিতায় অধ্যাত্ম সাধনার রূপকে রবীন্দ্রনাথ আত্মশক্তি বিকাশের প্রয়াস পেয়েছেন, চিনতে চেয়েছেন নিজেকে। মানবাত্মার মুক্তির জন্য তিনি বিশ্বমানবের পাশে দাঁড়িয়েছেন- কখনো শোষিত আফ্রিকার পক্ষে পঙ্‌ক্তি নির্মাণ করেছেন, কখনো-বা কবিতায় ব্যঙ্গের বাণ নিক্ষেপ করেছেন ফ্যাসিবাদী সমরবাজদের বিরুদ্ধে। আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদী-ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততার বিরুদ্ধে দাঁড়ান যে রবীন্দ্রনাথ, সেই রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের জন্য বেশি জরুরি। কেননা ওই রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে আমরা শুনি সভ্যতার নামে মানুষের চরম অমানবিকতার কথা, দেখি সাম্রাজ্যবাদী-ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের নিষ্ঠুর রূপ :'হায় ছায়াবৃতা/কালো ঘোমটার নিচে/অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ/উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।/এল ওরা লোহার হাতকড়া নিয়ে/নখ যাদের তীক্ষষ্ট তোমার নেকড়ের চেয়ে,/এল মানুষ ধরার দল/গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।/সভ্যের বর্বর লোভ/নগ্ন করলো আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।' ('আফ্রিকা')
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদের ক্রমাগত ঔদ্ধত্যে রবীন্দ্রমানস যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছে- স্পেন এবং চীনে মানবতার বিপর্যয়ে কবির চিত্তে জেগেছে প্রবল আলোড়ন। স্পেনে প্রজাতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামে পপুলার ফ্রন্টের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট শক্তির যুদ্ধের পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ। লেখেন এই চরণগুচ্ছ :'যুদ্ধ লাগল স্পেনে/চলছে দারুণ ভ্রাতৃহত্যা শতঘ্নীবাণ হেনে।/সংবাদ তার মুখর হলো দেশ-মহাদেশ জুড়ে,/সংবাদ তার বেড়ায় উড়ে উড়ে/দিকে দিকে যন্ত্র-গুরুর রথে/উদয় রবির পথ পেরিয়ে অস্ত্র রবির পথে' ('যুদ্ধ')। ফ্যাসিবাদী এই উন্মত্ততা দেখে রবীন্দ্রনাথ একের পর এক কবিতা লিখে মানবতার পক্ষে তার অবস্থান ঘোষণা করেছেন। ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপান আক্রমণ করল চীন, দখল করে নিল মাঞ্চুরিয়া। এ সময় সংবাদপত্রে একটি খবর বের হয় : "জাপানে একদল সৈনিক যুদ্ধযাত্রার আগে 'ভগবান বুদ্ধের' মূর্তির সামনে যুদ্ধজয়ের প্রার্থনা করছে।" এ সংবাদ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন। জাপানি ফ্যাসিস্টদের নির্লজ্জ আক্রমণ ও ভণ্ডামিকে বিদ্রূপ করে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি' শীর্ষক একটি ব্যঙ্গ কবিতা। ফ্যাসিস্ট যুদ্ধবাজদের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ নিক্ষেপ করলেন তীব্র বিদ্রুপবাণ :

যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে।
ওদের ঘাড় হলো বাঁকা, চোখ হলো রাঙা,
কিড়মিড় করতে লাগল দাঁত।
মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভরতি করতে
বেরোল দলে দলে।
সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে
তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়। ...

ওদের এই মাত্র নিবেদন, যেন বিশ্বজনের কানে পারে
মিথ্যামন্ত্র দিতে,
যেন বিষ পারে মিশিয়ে দিতে নিঃশ্বাসে।
সেই আশায় চলেছে ওরা দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে।
নিতে তাঁর প্রসন্ন মুখের আশীর্বাদ।
('বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি')।

সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদবিরোধী রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের কাছে বেশি জরুরি, বেশি প্রাসঙ্গিক। আবিসিনিয়া-স্পেন-চীন-চেকোস্লোভাকিয়া- সর্বত্র ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততা রবীন্দ্রচিত্তে জন্ম দেয় দ্রোহীচেতনা। ওই দ্রোহী রবীন্দ্রনাথই আমাদের জন্য এখন বেশি জরুরি। পৃথিবীর দেশে দেশে মানবিকতার বিপক্ষ শক্তি উত্থানের বিরুদ্ধে, সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য সদর্থক মানবতার কাছে তাই তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, ঘোষণা করেছেন আসন্ন মানব-উত্থানের এই অমোঘ পূর্বাভাস :'নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,/শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-/বিদায় নেবার আগে তাই/ডাক দিয়ে যাই/দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে' (প্রান্তিক কাব্যের ১৮ সংখ্যক কবিতা)। এভাবে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর শব্দভাষ্যে উচ্চারণ করেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের মানবাত্মার শাশ্বত বিজয়গাথা, রঙ-তুলিতে এঁকেছেন সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদ-সমরবাদের মানবতা-বিধ্বংসী নগ্ন-আগ্রাসী রূপ। বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদের অব্যাহত তাণ্ডবের মুখেও তিনি মানবিকতার শক্তিতে তাঁর অবিচল বিশ্বাস, মর্মকোষ উৎসারিত প্রত্যয় বিশ্বমানবের চিত্তে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেছেন- মানবাত্মার মুক্তিসাধনায় কামনা করেছেন মানুষের পুঞ্জীভূত মানবিক গুণের সমাহার মহামানবের অত্যাসন্ন আগমন, উচ্চারণ করেছেন মানব-অভ্যুদয়ের চিরায়ত বাণী, যেন বেদমন্ত্র :
ওই মহামানব আসে
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক-
এলো মহাজন্মের লগ্ন।
আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত
ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।
উদয়-শিখরে জাগে 'মাভৈঃ মাভৈঃ' রব
নবজীবনের আশ্বাসে।
'জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়',
মন্ত্রি উঠিল মহাকাশে
(ভোষলেখা)

এই যে রবীন্দ্রনাথ, মানবতার মুক্তিসাধক রবীন্দ্রনাথ, এই রবীন্দ্রনাথই এখন আমাদের জন্য বেশি প্রয়োজন। মানবতার শত্রুরা, পরাজিত হায়েনারা মানবতার বিরুদ্ধে দেশে দেশে নানা অপকর্মে লিপ্ত, নানা ষড়যন্ত্রে সংশ্নিষ্ট। বাংলাদেশেও সে-হাওয়া বইছে প্রবলভাবে। ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যই রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মের নামে অনেক ভণ্ড রাজনীতিক-সমাজসেবক আমাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে; যেমন নিঃশ্বাস ফেলেছিল রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন (১৮৯১) নাটকের রঘুপতি। আমাদের ঘরে-বাইরে ওই রঘুপতিদের রোখার জন্যই সার্বভৌম কবি রবীন্দ্রনাথ এখন জরুরি এক শিল্প-আয়ুধ। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে-উপন্যাসে-নাটকে বহুমাত্রিক ভাব প্রকাশিত হয়েছে। কতভাবেই তো রবীন্দ্রনাথের এইসব সৃষ্টিসম্ভারের দিকে তাকানো যায়। কিন্তু এখন বোধকরি বেশি প্রয়োজন 'শাস্তি' ছোটগল্পের লেখক রবীন্দ্রনাথকে, 'বলাই'-'স্ত্রীর পত্র'- 'পয়লা নম্বর'-এর রবীন্দ্রনাথকে, বেশি প্রয়োজন প্রকৃতির প্রতিশোধ-বিসর্জন-রক্তকরবীর রবীন্দ্রনাথকে। যে রবীন্দ্রনাথ নিম্নবর্গের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযন্ত্রণার ছবি আঁকেন, যে রবীন্দ্রনাথ চন্দরা-মৃণাল-অনিলা-কল্যাণীর আধারে আধুনিক নারী-ব্যক্তিত্বের অবয়ব নির্মাণ করেন, যে রবীন্দ্রনাথ মকররাজ আর সর্দারদের বিরুদ্ধে খোদাইকরদের শ্রেণিসংগ্রামের নাট্যভাষ্য নির্মাণ করেন, সেই রবীন্দ্রনাথ এখন আমাদের জন্য বেশি জরুরি, সেই রবীন্দ্রনাথই এখন আমাদের কাছে অধিক প্রাসঙ্গিক।
সূচনাসূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে, রবীন্দ্রসত্তায় মিলিত হয়েছিল ভাবয়িত্রী এবং কারয়িত্রী প্রতিভা। কারয়িত্রী প্রতিভার প্রেরণায় জনকল্যাণ ও সমাজ-উন্নয়নমূলক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই উপমহাদেশে কৃষি ব্যাংকের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা তিনি, তিনি ডেইরি ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা, দিয়েছিলেন রেশম গুঁটিপোকার কারখানাও। শিলাইদহ-পতিসরে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নৈশ বিদ্যালয়। শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন-সুরুলে গ্রামীণ নারীর আর্থিক উন্নতির জন্য স্থাপন করেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ নারীদের বৃত্তিমূলক কাজে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তিনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন- প্রাকৃতিক পরিবেশে বিদ্যালাভের জন্য শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিদ্যালয়, ক্রমে যা পরিণত হয়েছে অনন্যসাধারণ এক বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে গ্রাম-সংগঠনের জন্য গ্রহণ করেছেন তিনি নানামাত্রিক উদ্যোগ। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে কৃষি ব্যাংকসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। সমবায় পদ্ধতিতে চাষ করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি ঞযব ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরাব চৎরহপরঢ়ষব (১৯৬৩) নামে বই লিখেছেন, রাশিয়ায় গিয়ে সমবায় প্রথা দেখে বাংলায় তা প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন, শাহজাদপুরে দুঙ্খামার এবং সমবায় প্রথা চালু করেছেন। সমাজ উন্নয়নের জন্য স্বাপ্নিক এই রবীন্দ্রনাথই এখন আমাদের জন্য অনেক বেশি জরুরি। সমাজ-উন্নয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথের প্রয়াস বাদ দিয়ে কেবল সাহিত্যিক আর গীতিকার হিসেবে তাকে দেখলে, কখনোই বোঝা সম্ভব নয় পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে। একখানি শেষের কবিতা কি 'কাবুলিওয়ালা' কিংবা 'ছুটি' গল্পে রবীন্দ্রনাথ, 'জুতা আবিস্কার'-এর রবীন্দ্রনাথ কিংবা জনপ্রিয় কিছু সংগীতের বাইরে গিয়ে যদি কারয়িত্রী প্রতিভার রবীন্দ্রনাথকে না বোঝা যায়, তবে রবীন্দ্রনাথ কেবল কবিগুরুই থাকবেন, মানুষের কবি হয়ে উঠবেন না। আমরা তাকে আমাদের প্রয়োজনেই পূর্ণভাবে দেখব। কেননা, উপর্যুক্ত প্রতিটি কাজের জন্যই তিনি অব্যাহতভাবে এখনো আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।
শিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন প্রযুক্তি হিসেবে। তোতা পাখিধর্মী শিক্ষাকে তিনি বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, সুপারিশ করেছেন মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দদায়ক শিক্ষার কথা। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিত্তে মনুষ্যত্ববোধ ও বিশ্বআত্মচেতনা জাগ্রত করাই রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শনের মূল কথা। শিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ কেবল জ্ঞানার্জনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করেননি; বরং দেখেছেন একটি প্রযুক্তি হিসেবে। তিনি ছিলেন সমন্বয়বাদী শিক্ষা-দার্শনিক। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। শিক্ষালাভ করে শিক্ষার্থী যাতে মানবিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে পারে, সেদিকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। স্বকীয় শিক্ষাদর্শনের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা এখন বেশি মাত্রায় অনুভূত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষা হয়ে উঠেছে পণ্য। শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে লক্ষ্মীর ভান্ডার পূর্ণ হয় বটে, কিন্তু সরস্বতী যান পালিয়ে। সরস্বতী যাতে পালিয়ে যান সে জন্য আমরা এখন গ্রহণ করেছি যাবতীয় উদ্যোগ। শিক্ষার লক্ষ্য এখন আর জ্ঞানার্জন বা জ্ঞানসৃষ্টি নয়, সনদ নামের চারকোনা একখণ্ড কাগজই যেখানে মুখ্য বিবেচ্য। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে হাজির হন ত্রাতার ভূমিকায়। তার শিক্ষাদর্শন আমাদের দেখাতে পারে মুক্তির পথ। এ কারণেই এখন পণ্যচিন্তাপ্লাবিত এই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পরিবেশ-সচেতন দার্শনিক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তিনি গান লিখেছেন, রচনা করেছেন প্রকৃতির প্রতিশোধ নামে নাটক, রক্তকরবীতেও আছে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। 'বৃক্ষরোপণ' শব্দের স্রষ্টা তিনি। শ্রাবণে উৎসব করে শান্তিনিকেতনের চারদিকে গাছ লাগাতেন তিনি। বৃক্ষরোপণ উৎসবের জন্য রচনা করেছেন অসামান্য এই গান :'মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ।/ধূলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ/মৌনী মাটির মর্মের গান কবে উঠিবে ধ্বনিয়া মর্মর তব রবে,/মাধুরী ভরিবে ফুলে ফলে পল্লবে হে মোহন প্রাণ/পথিকবন্ধু, ছায়ার আসন পাতি এসো শ্যামসুন্দর।/এসো বাতাসের অধীর খেলার সাথি, মাতাও নীলাম্বর।/ঊষায় জাগাও শাখায় গানের আশা, সন্ধ্যায় আলো বিরামগভীর ভাষা,/রচি দাও রাতে সুপ্ত গীতের বাসা হে উদার প্রাণ' (গীতবিতান-এর 'আনুষ্ঠানিক' পর্যায়ের ১২ সংখ্যক গান)।
কৃষি, কৃষক এবং কৃষি-সভ্যতার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল রবীন্দ্রনাথের। কৃষির উন্নয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন নানা উদ্যোগ। পূর্ববঙ্গ বাসকালে ১৮৯৪ সালে শিলাইদহে এবং ১৯০৫ সালে পতিসরের কালীগ্রামে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কৃষি আর কৃষকের প্রতি ভালোবাসার কথা কবিতায় শিল্পিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রসঙ্গত উদ্ৃব্দত করা যায় জন্মদিনে কাব্যগ্রন্থের 'ঐকতান' শীর্ষক ১০ সংখ্যক কবিতার এই পঙ্‌ক্তিমালা : 'আমার কবিতা, জানি আমি,/গেলেও বিচিত্রপথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।/কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,/কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,/যে আছে মাটির কাছাকাছি,/সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।' কৃষি ও কৃষকের প্রতি ভালোবাসার আন্তঃপ্রেরণা থেকে পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উন্নত কৃষিজ্ঞান আহরণের জন্য তিনি আমেরিকা পাঠিয়েছেন, সেই ১৯০৩ সালে। পরিবেশ-সচেতন কৃষিসভ্যতা-অনুরাগী এই রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে এখন অধিক প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ উন্নয়নের কথা বলেছেন, তবে জোরের সঙ্গে বলেছেন উন্নয়নকে হতে হবে পরিবেশবান্ধব, উন্নয়নকে হতে হবে মানববান্ধব।
বাঙালি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ, আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম উদ্‌গাতা তিনি। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, কি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথ এক শানিত হাতিয়ার। তিনি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অফুরান শক্তি জুগিয়েছেন। ষাটের দশকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমাদের উল্লেখযোগ্য শক্তি-উৎস। মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের চিত্তে সঞ্চার করেছে অফুরান সাহস। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি দিনও কি চলে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে? যাঁকে বাদ দিয়ে চলে না আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি দিনও, চলে না আমাদের কোনো আচার-অনুষ্ঠান-উৎসব, যিনি আমাদের সাহস জোগান, বুকে দেন ভরসা- তিনি যে আমাদের জন্য অব্যাহতভাবে প্রাসঙ্গিক, সে কথা লেখাই বাহুল্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে মৃত্যু জীবনের পরিসমাপ্তি নয়, বরং এক জীবন থেকে মহাজীবনে উত্তরণের একটি সোপান মাত্র। তাই মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ আলিঙ্গন করেছেন সহজভাবে সাবলীল চিত্তে। তাই শেষলেখা কাব্যের ১ সংখ্যক কবিতায় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে রবীন্দ্রনাথ লেখেন : 'সমুখে শান্তিপারাবার,/ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।/তুমি হবে চিরসাথি,/লও লও হে ক্রোড় পাতি,/অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি/ধ্রুবতার-কার।' মৃত্যু কবির কাছে এসে জীবনকে আরো গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছে- জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী যে সময়খণ্ড, কবি তাকে আলোকময় পরম অস্তিত্ব-উপলব্ধির প্রাণ-উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন। মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ বিবেচনা করেছিলেন পরম শিল্প হিসেবে। মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের সৃজনভুবনের পরম বৃত্তটিকে পূর্ণ করেছিল। দিবালোকের জীবন যেমন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল শিল্প, তেমনি অন্ধকারের মৃত্যুও দেখা দিয়েছিল অপরূপ শিল্প-সত্তায়। এ কারণেই তিনি নির্মাণ করেন এমন চরণ- 'মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে।'
আমাদের প্রয়োজনেই রবীন্দ্রশক্তিকে আজ ব্যবহার করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শান্তির পক্ষে অতুলনীয় এক শক্তি। শান্তির অন্বেষায় রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখাতে পারেন প্রত্যাশিত পথ। একলা-আমির বন্ধন ছিন্ন করে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ডাক দিয়েছেন বহু-আমির প্রাঙ্গণে। বর্তমান সময়ে মানুষে-মানুষে যে চরম বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে, মানব-সম্পর্কগুলো যে ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে, করোনা মহামারি মানবসভ্যতায় সৃষ্টি করেছে যে বিপন্নতা- রবীন্দ্রনাথ সেক্ষেত্রে আমাদের কাছে হয়ে উঠতে পারেন উত্তরণের এক মহাশক্তি। মানুষকে তিনি ডাক দিয়েছেন বৃহত্তর ঐক্যের পতাকাতলে। আজকে, বিচ্ছিন্নতাপীড়িত এই সময়খণ্ডে সে-ঐক্যের ডাকই এখন আমাদের জন্য বেশি জরুরি এবং এখানেই রবীন্দ্রনাথের কালোত্তীর্ণ প্রাসঙ্গিকতা। মানবাত্মার মুক্তি-সাধনায় তিনি হতে পারেন আমাদের শাশ্বত প্রেরণা। কোনো ক্ষুদ্র দৃষ্টি দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যদি আমরা রবীন্দ্রনাথকে দূরে সরিয়ে রাখি, তা হবে আমাদের জন্য আত্মঘাতী। প্রতিদিনের পথ চলায় রবীন্দ্রনাথ থাকুন আমাদের সঙ্গে, আমাদের পাশে- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি সে কথাই যেন উদ্ভাসিত হয়েছে শামসুর রাহমানের 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি' কবিতায়, সে-কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উদ্ৃব্দত করে শেষ করি এই রচনা :
আমার দিনকে তুমি দিয়েছ কাব্যের বর্ণচ্ছটা
রাত্রিকে রেখেছো ভ'রে গানের স্ম্ফুলিঙ্গে, সপ্তরথী
কুৎসিতের বূ্যহ ভেদ করবার মন্ত্র আজীবন
পেয়েছি তোমার কাছে। ঘৃণার করাতে জর্জরিত
করেছি উন্মত্ত বর্বরের অট্টহাসির কী আশ্বাসে।
(শামসুর রাহমান/'রবীন্দ্রনাথের প্রতি')