বড় রকমের পরিবর্তন আসছে শিক্ষা কার্যক্রমে- এই বার্তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রণীত এই শিক্ষাক্রম মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যোগ্যতাভিত্তিক। বলা যায়, শিক্ষাক্রমে এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সংগতই।
বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হবে। যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। দীর্ঘদিন এ নিয়ে কাজের পরিপ্রেক্ষিতেই এসেছে পরিবর্তনের এ সিদ্ধান্ত।
এই পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল। যে পরিবর্তনের কথা বলছি, তা অবশ্যই বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তবে এর ফলে প্রয়োজন হবে অনেক বিনিয়োগের। আমি বিশ্বাস করতে চাই, বর্তমান সরকারের এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অঙ্গীকার রয়েছে। যদি প্রয়োজনমাফিক বিনিয়োগ না করা যায়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল মিলবে না। প্রাথমিক, মাধ্যমিক শ্রেণিতে যারা পড়ে তারা তো বটেই, সামগ্রিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ভালো শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে আনতেই হবে। যেহেতু ক্ষেত্রটা বিস্তৃত তাই অনেক বড় বিনিয়োগ অপরিহার্য। আমি মনে করি, আমাদের মতো দেশে যেখানে বসতি এত ঘন, সেখানে নানা রকম সমস্যাও বিরাজমান। এই পরিবর্তনে ব্যবহার করতে হবে উৎপাদনশীল পদ্ধতি। আরও অন্য আধুনিক পদ্ধতিও ব্যবহার করতে হবে। আমরা যদি ভালোমানের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সে রকম ব্যবস্থাও তৈরি করতে পারি, যেখান থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞানপিপাসা বাড়বে, তারা বিষয়গুলো বুঝতে পারবে, তাহলে তাদের নানা দিকে দৌড়াতে হবে না। যেমন- কোচিং সেন্টারে কিংবা প্রাইভেট পড়ায় নির্ভরতা হ্রাস পাবে। উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তকের গুরুত্ব এক্ষেত্রে সর্বাধিক।
আমরা ছাত্রজীবনে যখন শিক্ষা অর্জনের চেষ্টারত ছিলাম কিংবা লেখাপড়া করতাম, তখন পাঠ্যপুস্তক অনেক ভালো অথবা মানসম্পন্ন ছিল বলে আমার ধারণা। এখন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে যথেষ্ট সময় দিয়ে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ ও সংশ্নিষ্ট বিষয়ে দক্ষদের দিয়ে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজটি করতে হবে এবং তাদের যথেষ্ট সময় দিতে হবে। এই পাঠ্যপুস্তক লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়বে, জ্ঞান অর্জনের পাথেয় হিসেবে নেবে। তাই পাঠ্যপুস্তক হতে হবে সেরকমই। এ জন্যই চাই পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। ভালো বিনিয়োগে বের হয়ে আসবে ভালো মানের পাঠ্যপুস্তক এবং আরও ভালো ফল। এই পাঠ্যপুস্তক আমরা কাজে লাগাব চার-পাঁচ দশক। এতসংখ্যক বই যেসব শিক্ষার্থীরা পড়বে, এই বইয়ে শিক্ষার্থীর অনুপাতে কত টাকা আর খরচ লাগবে? এই পাঠ্যপুস্তকই হবে শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের মূল ভিত্তি। এখনকার বিশ্ববাস্তবতা অন্যরকম। এরই মধ্যে আমাদের দেশে প্রযুক্তির অনেক বিকাশ ঘটেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় পাঠদান শুরু হয়েছে। তা আরও উন্নত করতে হবে, প্রথিতযশা কিংবা জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে শিক্ষণ কার্যক্রমে।
গ্রামাঞ্চলে দক্ষ-অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব রয়েছে- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। শিক্ষার্থীরা যদি জানতে কিংবা বুঝতে পারে, সবচেয়ে দক্ষ শিক্ষক তাকে পাঠদান করছেন, তখন তার আগ্রহও বেড়ে যাবে। প্রযুক্তির আওতায় হয়তো সবাইকে একসঙ্গে আনা যাবে না। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও এ জন্য দৃষ্টি গভীর করা চাই। যাদের এমন ব্যবস্থায় আনা যাবে না, তাদের জন্য অন্য আরেকটি ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রচেষ্টা থাকতে হবে বহুমুখী। এসব কারণে ব্যয় বাড়বে কিন্তু শিক্ষার মান উন্নত হবে। এদেশের প্রজন্ম যদি যথাযথ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের সামগ্রিক অগ্রগতির পথটা আরও মসৃণ হবে। যেহেতু দীর্ঘদিন পর আমাদের প্রত্যাশিত একটা পথের সন্ধান আমরা পেলাম, সেহেতু এখন লক্ষ্য হতে হবে এই পথ মসৃণ করার জন্য যা যা করা দরকার, সবই করতে হবে সে নিরিখেই। এই বিনিয়োগ সমগ্র জাতির জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে। আমি সরকারকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ রচনার জন্য অভিনন্দন জানাই।
দেশে যত রকম বিভাজনই থাকুক না কেন, দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিসহ আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সবকিছুই পাঠ্যসূচিভুক্ত করাই নয়, তা যাতে নির্ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটিও বড় বিষয়। সমাজের সব অসংগতি দূর করতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকেই সবকিছু বিকাশের পথ করতে হবে মসৃণ। এসবের আলোকে পাঠ্যপুস্তকে যা যা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার, সবই করতে হবে। উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তি যতটুকু ছাড়িয়ে দেওয়া যায়, তা-ই করা বাঞ্ছনীয়। হয়তো সবাইকে আমরা একসঙ্গে সব সুবিধার আওতায় আনতে পারব না; কিন্তু তাই বলে বসে থাকলে চলবে না। বৈষম্যের নিরসন করতে হবে। সুবিধাভোগীর ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন যেন না হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণই শেষ কথা নয়; এর সুফল বাস্তবায়ন হলো বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের যে বার্তা মিলল তা সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অপরিহার্য ছিল। মনে রাখতে হবে, আমরা এক নতুন বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছি। এর বাস্তবায়নেও সেরকম প্রত্যয়ই থাকতে হবে। আমাদের আশাবাদের ক্ষেত্র যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি দায়িত্বের পরিধিও বেড়েছে অনেক। কাজেই সংশ্নিষ্ট সবারই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান সাধনায় শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশের বিষয়ে দায়িত্বশীলদের মনোযোগও আরও বাড়াতে হবে।
লেখক :অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়