২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে, কারণ এই দিন উচ্চ আদালত একটি রায়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন সেই ভাষণটি ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত ভাষণের মধ্যে সবচেয়ে উদ্দীপনাময় ভাষণ।

এই ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের লাখ লাখ মানুষ এবং দেশবাসীর সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কারণ তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন যে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা অনেকদিন ধরেই তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। সেই দিন যদি তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করতেন তবে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুবিধা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের।

৭ মার্চের ভাষণের পরে বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনের গতিপথ একেবারেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। বাংলার জনগণ তাদের মুজিব ভাইয়ের এই নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কারণ দেশভাগের পর থেকে পূর্ববাংলার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসনের নিষ্পেষণে এতটাই নিষ্পেষিত হয়েছিল যে জনগণ পাকিস্তান থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আকুল হয়ে প্রহর গুনছিল। আর জনগণকে এই স্বপ্টম্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজে। বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় সব সময় চেয়েছিলেন বাংলার মানুষের মুক্তি। বাংলার মানুষ যেন মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে পৃথিবীর বুকে বাস করতে পারে, এটিই ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। তিনি সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সারাটা জীবন আন্দোলন করে গেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চের ভাষণ এতটায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন নিউজ উইক তাদের ১৯৭১ সালের এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে 'রাজনীতির কবি' বা 'পোয়েট অব পলিটিপ' উপাধিতে ভূষিত করছিল। ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরের ৭ মার্চের ভাষণকে 'ডকুমেন্টারি হেরিটেজ' (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বিগত সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে ইতিহাসের অংশ থেকে মুছে ফেলার যাবতীয় কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য পাঠ্যক্রমে তার সব অবদানকে বাদ দেওয়া হয়েছিল যাতে আমাদের নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে না পারে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে কেবল আওয়ামী লীগের হালই ধরেননি, বরং তিনি দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পরে চেষ্টা করেছেন বাংলার স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে। অনেকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন এই মর্মে যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার জোরে বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের অবদানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদিও বিষয়টি একেবারে কল্পনাপ্রসূত এবং সত্যের অপলাপ মাত্র। তার পরেও ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের দেওয়া রায়টি এই শ্রেণির মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করবে। কারণ উচ্চ আদালত রায়ে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে একদিকে যেমন পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, আবার ঠিক তেমনিভাবে রেসকোর্স ময়দানের যে স্থানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ভাষণ প্রদান করেছিলেন সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি তৈরি করতে হবে। এই রায় একদিকে যেমন আগামী প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে, ঠিক তেমনিভাবে প্রকৃত সত্য উদ্ভাবন করতে সহায়তা করবে।

৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটি হলো তার সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন নেতৃত্ব। রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো লিখিত বক্তব্য পাঠ না করে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন সেটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিটি মানুষের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও যখন সেই ভাষণ শুনি তখন এক ধরনের শিহরণ অনুভব করি। একটি বিষয় সব সময় ভাবি যে, একজন মানুষ কতটা দূরদর্শী হলে এই ধরনের ভাষণ প্রদান করতে পারেন। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা, নিষ্পেষণ, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং স্বাধীনতা সবকিছু ছিল সেই ভাষণে। আর এই কারণেই বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ একটি ভাষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব দিক বিবেচনা করেই অনেক ইতিহাসবিদ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের 'গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস' ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের 'আই হ্যাভ এ ড্রিম' ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই ভাষণকে তাদের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল ওই ভাষণগুলোর চেয়েও শক্তিশালী। কারণ একটি বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে একটি জাতির আজন্ম লালিত স্বাধীনতার স্বপ্টেম্নর রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, যা ইতিহাসে এক এবং অদ্বিতীয়।

উচ্চ আদালত যে রায় প্রদান করেছেন সেই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অনন্যসাধারণ ঘটনা হয়ে থাকবে যতদিন বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে অবস্থান করবে। এই রায়ের মাধ্যমে শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত নিশ্চিত হবে না, বরং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠনে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যারা খাটো করে দেখতে চায় তাদের জন্য একটা শক্ত বার্তা প্রদান করবে। বঙ্গবন্ধুকে খাটো করে দেখার কিংবা অন্য কোনো নেতাকে বঙ্গবন্ধুর সমতুল্য করে ব্যাখ্যা করার কোনো অপপ্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। আর এই কারণেই এই রায়ের তাৎপর্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি। এ রায়ের ফলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হলে আমাদের আগামী প্রজন্ম একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারবে আবার অন্যদিকে তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত হবে- এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।