করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্বের বড় দেশগুলোর নাম থাকলেও ছোট দেশগুলোর নাম তেমন শোনা যায় না। তবে বিশ্বপরিমণ্ডলে এবার বাংলাদেশের নামও শোনা যাবে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য। টিকা আবিস্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত এমনকি এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস প্রতিরোধের বড় উপায়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ফেসিয়াল মাস্কের ব্যবহার। বলা বাহুল্য, উন্নত দেশে গবেষকরা নানা তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন মাস্ক পরিধানের পক্ষে-বিপক্ষে। তবে সে গবেষণার কোনোটাই গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের ছিল না। সম্প্রতি ওই মানের বিশ্বের সবচেয়ে বড় গবেষণা হয় বাংলাদেশে। যেখানে ৬০০০ গ্রামের প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার লোক এ গবেষণায় অংশ নেন। গবেষণাটি করা হয় যৌথভাবে, যেখানে মূলত বাংলাদেশের এক এনজিওসহ ইয়েল, স্ট্যানফোর্ড, ইউসি বারক্লে, এবং জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জড়িত ছিলেন। এ গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মাস্ক ব্যবহারের ফলে কভিড-১৯ এর সংক্রমণ অনেকটা কম হয়।

বড়মাপের এ গবেষণার ফলে মাস্কের উপকারিতা সম্পর্কিত সারাবিশ্বে যে বিতর্ক রয়েছে, তার একটা সমাধান হয়তো পাওয়া যাবে। যদিও গবেষণাকর্মটি এখনও প্রকাশ হয়নি; ইতোমধ্যে ওয়াশিংটন পোস্টসহ কয়েকটা মিডিয়া এ গবেষণা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আমাদের হাতেও রয়েছে গবেষণাটির একটি কপি। আমাদের এ লেখায় গবেষণাকর্মটির সারাংশ তুলে ধরা ছাড়াও মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা এবং মাস্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তা ছাড়া এ গবেষণা থেকে আমাদের দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে উন্নত করা যায়, তারও একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে।

যখনই কোনো নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, বিশেষ করে ছোঁয়াচে রোগ; মানুষ বেশি আতঙ্কে থাকে। কারণ ওই রোগের তৎক্ষণাৎ সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা থাকে না। আবার যারা গণস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করেন বা চিকিৎসা দেন, তারাও থাকেন অনিশ্চয়তায়। তাদের অপেক্ষা করতে হয় নতুন রোগটির উপসর্গ বুঝতে; কারা বেশি সংক্রমিত হচ্ছে; কোন কোন কারণে হচ্ছে এবং সংক্রমিত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটুকু। যেহেতু এসব বিষয় জানার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন তাই তাৎক্ষণিক প্রতিকার হিসেবে বিশেষজ্ঞরা প্রিভেন্টিভ হেলথ বা রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে তারা আগেকার সংক্রামক রোগগুলো প্রতিরোধের ফর্মুলাগুলোই বেশি অনুসরণের চেষ্টা করেন। তাই করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও বিশ্বের বড় বড় স্বাস্থ্য সংস্থা একই পরামর্শ দেয়। যেমন হাত ধোয়া, দূরত্ব বজায় রাখা এবং মাস্ক পরিধান করা। এ ছাড়া রোগের উপসর্গ দেখা দিলে প্রাথমিক চিকিৎসা বা ঘরোয়া চিকিৎসা নেওয়ার উপদেশ দেন।

তবে করোনাভাইরাসের সময় রোগ প্রতিরোধের যেসব মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেক কথা হয়। প্রথমদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মাস্ক পরার ওপর তেমন গুরুত্ব আরোপ করেনি। একইভাবে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মাস্ক ব্যবহারকে ঐচ্ছিক হিসেবে নিয়েছিলেন। ফলে মাস্ক পরিধান বিষয়ে জনমনে অনেক বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এ ছাড়া কিছু গবেষণায় মাস্কের উপকারিতা নিয়ে মিশ্র ফল পাওয়া যায়, যা ওই বিতর্ককে আরও চাঙ্গা করে।

গত বছর ৬ জুন বিবিসি এক রিপোর্টে উল্লেখ করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে জনপরিসরে মাস্ক পরার নির্দেশনা দেয়। এর আগে সংস্থাটি বলে, সুস্থ-সবল মানুষের মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তার কোনো পর্যাপ্ত প্রমাণ তাদের হাতে ছিল না। মাস্ক পরা নিয়ে বেশি বিতর্ক হয় সম্ভবত আমেরিকায়। আমেরিকার অনেক রাজ্যে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক ছিল না। গত বছর নভেম্বরের ১০ তারিখে ফপ-১৭ তার এক নিউজে উল্লেখ করে, টেনেসির গভর্নর ঘোষণা দেন- কেন্দ্রীয় সরকারে যিনিই ক্ষমতায় আসুন, তারা জনগণের ওপর একতরফা মাস্ক পরা চাপিয়ে দেবেন না। একই ধরনের বিতর্ক কম-বেশি ইউরোপের দেশগুলোতেও দেখা যায়। প্রথমদিকে বাংলাদেশেও মাস্ক পরিধান বিষয়ে শক্ত অবস্থান ছিল না। মাস্ক নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয় আগের বিভিন্ন গবেষণার ফল ঘিরে।

যেমন ২০১০ সালে আমেরিকাতে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ওপর হওয়া গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্ক রেসপিরেটরি সম্পর্কিত রোগ কমাতে সাহায্য করে, তবে তাদের ফলাফল স্ট্যাটিস্টিক্যালি সিগনিফিকেন্ট ছিল না। একই জাতীয় ফল পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ার আরেক গবেষণায়। যেখানে মাকেনটের এবং তার টিম (২০০৯) মাস্ক ব্যবহারকারী এবং যারা মাস্ক ব্যবহার করেনি তাদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার দিক থেকে খুব একটা তারতম্য দেখেননি। ওয়্যারড.কম (রিৎবফ.পড়স) গত বছর ৮ এপ্রিল এ দুটি গবেষণাকে উল্লেখ করে তাদের প্রতিবেদনে বলে, গবেষণাগুলো সুনির্দিষ্ট করে মাস্কের উপকারিতা বা ক্ষতির দিক কোনোটাই ভালোভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। তবে দুটি গবেষণারই কম-বেশি পদ্ধতিগত সমস্যা ছিল বলে সংবাদ মাধ্যমটি উল্লেখ করে। সে হিসাবে করোনাভাইরাসের সময়ও মাস্কের ব্যবহার কতটুকু কাজে আসবে, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলে ধরেন। যার জন্য একটা বিশ্বাসযোগ্য গবেষণার অভাব রয়েই যায়। যেটি পূরণ করার চেষ্টা করেন যৌথভাবে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহমেদ মুশফিক মোবারক, স্ট্যানফোর্ডের আশরাফুল হক, আলমগীর কবিরসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তবে এ গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেসন এবালাক।

সারা বাংলাদেশে এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় নভেম্বর ২০২০ থেকে এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত। এ গবেষণার আওতাধীন ছিল ৪০টি জেলার ১০০০ ইউনিয়ন। তবে ঢাকা, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ কয়েকটি কোস্টাল এরিয়া এ গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। গবেষণাটি মাস্ক ব্যবহারের স্ট্র্যাটেজি চিহ্নিত করার পাশাপাশি দেখার চেষ্টা করেছে কাপড়ের মাস্ক ও সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহারের পার্থক্য। এ গবেষণায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের দু'ভাগে ভাগ করা হয়। একটা ভাগে (ইন্টারভেনশন গ্রুপ) ফ্রি মাস্ক দেওয়া ছাড়াও বিভিন্নভাবে উৎসাহ দেওয়া হয় মাস্ক পরতে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। আরেকটা ভাগে (কন্ট্রোল গ্রুপ) মাস্কও দেওয়া হয়নি, আবার কোনো ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনাও দেওয়া হয়নি। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ইন্টারভেনশন গ্রুপে মাস্ক পরার সংখ্যা বেড়েছে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু কন্ট্রোল গ্রুপে তার সংখ্যা ছিল ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়াও দুই গ্রুপের মধ্যে যাদের প্রথম থেকেই কভিডের বিভিন্ন উপসর্গ ছিল, তাদের মধ্যে ইন্টারভেনশন গ্রুপের ১১ দশমিক ৯ শতাংশের ওই উপসর্গগুলো কমে যায় মাস্ক পরাসহ অন্যান্য পদক্ষেপের ফলে।

গবেষণার ফলাফল নিয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক মন্তব্যে গবেষক দলের প্রধান এবালাক বলেন, সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি আপনারা দেখেন কভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে মাস্ক শুধু ১০ শতাংশের মতো সুরক্ষা দিতে সক্ষম। তিনি বলেন, এর ফলাফল হবে কয়েক গুণ, যদি মাস্কের ব্যবহারকে সর্বক্ষেত্রে করা হয়। বিভিন্ন হেলথ বিশেষজ্ঞও ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া মন্তব্যে এ গবেষণার মানদণ্ডের অনেক প্রশংসা করেন এবং বলেন, এ গবেষণাটি মাস্ক ব্যবহারের উপকারিতা বিষয়ে শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করতে পেরেছে। যেটাকে তাদের ভাষায় বলা হয় গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্টিফিক নলেজ।

বাংলাদেশে হওয়া এ গবেষণাটি জার্নালে প্রকাশ হওয়ার পর গণস্বাস্থ্যের জন্য এটা হতে পারে একটা অকাট্য দলিল। বিশ্বের যে কোনো স্বাস্থ্য সংস্থাই হয়তো এ গবেষণাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবে যখনই কোনো ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে। বিশেষ করে সংক্রমণ রোধে মাস্ক ব্যবহারের উপকারিতা বিবেচনায় নিয়ে। আর যতবারই এ গবেষণাকে উদ্ৃব্দত করা হবে ততবারই বাংলাদেশের নামটি চলে আসবে, যা স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রত্যেক বাংলাদেশির জন্য একটা অনুপ্রেরণা। আর ধন্যবাদ বাংলাদেশি গবেষকদের, যারা এ গবেষণার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন।

এ ছাড়াও এর থেকে আমাদের দেশের রয়েছে অনেক কিছু শিক্ষার সুযোগ। এ গবেষণায় অনেক রোগ প্রতিরোধের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কমিউনিটি লেভেলে স্বাস্থ্যকে প্রমোট করার জন্য। বিশেষ করে তারা রোগ প্রতিরোধের টুলের সঙ্গে কমিউনিটি শক্তি যেমন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, মসজিদের ইমামদের কাজে লাগিয়েছেন। যেটিকে স্বাস্থ্য যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মোহন জে. দত্তের (২০০৭) ভাষায় বটম আপ অ্যাপ্রোচ বা কালচার-সেন্টার্ড অ্যাপ্রোচ বলা হয়। যেখানে পার্টিকুলার কমিউনিটির সঙ্গে কথা বলে হেলথকে বোঝা হয়। অর্থাৎ তাদের মতো করে স্বাস্থ্যকে বোঝা। প্রচলিত যে হেলথ প্রমোশনের ধারণা, তা হলো মূলত পশ্চিমা অর্থাৎ ইউরোপ-আমেরিকার ধারণা।

তাদের দেশের চলাফেরা, আইনকানুন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক সহায়তা পদ্ধতি আমাদের দেশের মতো নয়। তাই যে ওষুধ বা ডোজ দিয়ে তাদের চিকিৎসা চলে, সেই ওষুধ বা ডোজ দিয়ে আমাদের চিকিৎসা চালালে ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। আমাদের ওষুধ বা ডোজ আমাদের দেশের লোকদের সংস্কৃতি, জীবনধারা, আর্থ-সামাজিক বিবেচনা রেখে করলেই ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকার কথা। মাস্ক নিয়ে যে গবেষণাটি হয়েছে সেখানেও এই 'কালচার-সেন্টার্ড অ্যাপ্রোচ'-এর কিছু থিওরি কাজে লাগানো হয়েছে। আমাদের দেশে যারা 'হেলথ প্রমোশন' নিয়ে কাজ করেন তারাও এই অ্যাপ্রোচকে কাজে লাগাতে পারেন, যা গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।