গতিশীলতায় মুগ্ধ যে মানুষটির কথা বলছি, নাম তার পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। সাংবাদিকতায় যিনি আমার গুরু। মানবসভ্যতার আনন্দবাজারে নিবিষ্টজন তিনি। বড্ড আমুদে, সর্বোতভাবে আন্তরিক ও সাংগাঠনিক। এ মানুষটির জন্মদিন। লাল-সবুজ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সাংবাদিকতায়। সেটি তরুণ বয়সে। জীবনের সহস্ররাগের একটি বয়স সত্তরে। ইতিহাসখ্যাত টিভি চ্যানেল একুশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যখন তিনি। মহান একাত্তরের অকুতোভয় আজকের দিনে ছাড়িয়ে গেলেন বয়স ৭১। তার প্রতি রইলো নিরন্তর ভক্তি ও ভালোবাসা।

পীযূষ বন্দোপাধ্যায়কে এদেশের অনেকেই চেনেন নাটকের মানুষ হিসেবে। আমিও তাই জানতাম। পরে ক্রমশ পরিধি বাড়ে। এসবের বাইরে তিনি একজন ঝড়ো হাওয়ার নাবিক। বিপরীতের স্রোত ভেদিয়ে উজানে নৌকো টানতেই তার পছন্দ। ক্রান্তিকালের সংস্কৃতিকর্মী তিনি। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে যিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের 'পাঞ্জেরি'। মুক্তবুদ্ধির কথা বলেছেন, দেশ কিংবা দেশের বাইরে।

উইকিপিডিয়া বলছে, তার জন্ম ফরিদপুরে ১৯৫০ সালে। আর পড়ালেখায় হাতেখড়ি গোপালগঞ্জে। এরপর রাজেন্দ্র কলেজ টপকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স। সাবজেক্ট ছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা। দস্তুর বোহেমিয়ান পীযুষ বন্দোপাধ্যায় ছাত্রজীবন থেকেই চষেছেন দেশের এ প্রান্ত-ওপ্রান্ত। চেনাজানায় গোটা বাংলাদেশকে তিনি গ্রাম বানিয়ে ফেলেছেন।

আমজনতা তাকে চেনেন অভিনেতা রূপে। বন্ধুদের কাছে সব্যসাচী। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন আবৃত্তিকার। কারুনাট্যকারও বটে। আছে গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখার পারঙ্গমতা। পত্রিকায় কলাম লেখাকে দায়িত্বজ্ঞান করেন।

এদেশের বাইরে তিনি একজন সংগঠকও বটে। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্যদের মতোই গণজাগতিক অপার ক্ষমতা তার। চিন্তার রূপকে তিনি কাশফুল। অমল-ধবল। শরতের বাতাসে শুধুই দোলেন-মুক্তমেঘে। পরিশুদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশে নবনাট্যধারার সূচনা তার হাতে। অন্যরাও ছিলেন সামনে-পেছনে। চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর থাকতে জোর দিয়েছিলেন বিকল্পধারায় সৃজনশীল ছবি নির্মাণে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীসহ আরও কজন মিলে গঠন করেন 'শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টার।' লন্ডনে এর যাত্রা শুরু-২০০০ সালের শুরুতে। যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে অনেকেই সাহস করতেন না। ক্রান্তিকালে গাফফার চৌধুরী লিখেছিলেন 'পলাশি থেকে ধানমন্ডি'। আর সেই নাটক লন্ডনে মঞ্চন্থ হলো প্রথমবারের মতো। রব উঠলো দেশে দেশে ধন্যিরূপে। এ নাটকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন পীযূষ বন্দোপাধ্যায়।

যদিও পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের শাহেদ চরিত্রের কথা অনেকেরই জানা। গত শতকের আশির দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল 'সকাল সন্ধ্যা'। এতে শাহেদ চরিত্রে অভিনয়ের পর রাস্তাঘাটে লোকজন তাকে ডাকা শুরু করেছিলেন এই নামে। রিকশাওয়ালা থেকে প্রতিবেশীরাও তাকে শাহেদ নামে ডাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এরপর একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা পীযূষ বন্দোপাধ্যায় 'একাত্তরের যীশু' চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাস অবলম্বনে স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে নির্মিত এ ছবির পরিচালক ছিলেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। 

'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' নাটকটি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রথিতযশা লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, ''বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য যখন অভিনেতা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসান ইমাম (তিনি তখন নাটকটির রিহার্সাল দিচ্ছিলেন) বললেন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রস্তাব দিলে কেমন হয়? আমি বললাম, তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক। মুসলমান অভিনেতারাই যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অভিনয়ে রাজি নন, তখন তিনি কি রাজি হবেন? আর তাকে কোথায় পাব? তার ঢাকার ঠিকানা তো জানি না। হাসান ইমাম বললেন, পীযূষ অন্যদের মতো সুবিধাবাদী নন। সাহসী অভিনেতা। তিনি রাজি হতে পারেন। ঢাকায় অনেককেই টেলিফোন করে পীযূষের খোঁজ জানতে চাইলাম। তারা কেউ খোঁজ জানলেও না জানার ভান করলেন। শেষ পর্যন্ত তারানা হালিম জানালেন, 'গাফ্ফার ভাই, আমি পীযূষকে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য লন্ডনে যেতে রাজি করাব।' আমাদের সমস্যা দূর হলো। তারপর এক শুভ সন্ধ্যায় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় লন্ডনে এসে পৌঁছলেন। বিএনপির ভাড়াটে গুন্ডারা থিয়েটার হলে হামলা চালাবার হুমকি দিয়েছিল। তাতে সফল হয়নি। হাজারো দর্শকভর্তি হলে পীযূষ বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করে নাটকের শেষ অঙ্কে সকলকে কাঁদিয়েছেন।'' (দৈনিক জনকণ্ঠ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০)

আবদুল গাফফার চৌধুরী আরও বলেছেন- ''লন্ডনে 'পলাশী থেকে ধানমন্ডি' নাটকের সফল মঞ্চায়নের পর নিউইয়র্কেও নাটকটির মঞ্চায়ন হয়। সেখানেও বিএনপি ও জামায়াতের লোকেরা হল ঘেরাও করেছিল হামলা চালানোর জন্য। পুলিশের তৎপরতায় পারেনি। নিউ ইয়র্কেও হল ছিল দর্শক ভর্তি।'' (দৈনিক জনকণ্ঠ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০)

এ ঘটনার পর পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের প্রাণনাশের চেষ্টা হয়। এমনকি লন্ডন ও বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের হামলা থেকে বেঁচে যান পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। অনুষ্ঠান চলাকালীন নিউইয়র্কে অডিটরিয়ামের বাইরে মিছিল করে রাজাকার দোসররা। চায় তাকে হত্যা করতে। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে তিনি একাধিকবার নিগৃহীত হন। তারপরও একাত্তরের সম্মুখযোদ্ধা পিছু হটেননি। সব বাধা টপকে এখনও তিনি আছেন বিশ্বব্যাপী গণমানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে। তার দৃঢ়তা ও সাংগাঠনিক প্রজ্ঞায় এগিয়ে চলেছে সমসাময়িক আলোচিত সংগঠন 'সম্প্রীতি বাংলাদেশ'।

গ্রাম থিয়েটার ও ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। তার অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গঠনে। পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের স্কুল শুরু হয়েছিল গোপালগঞ্জে এস এম মডেলে ক্লাস টুতে। উপন্যাস, নাটক, ছড়া, কবিতা ও গল্পের সংখ্যা মিলে তার বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। জাতীয় তো বটেই, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তার নিবন্ধ ও রাজনৈতিক কলাম প্রকাশিত হয়েছে অনেক। 'লাল সবুজ' নামে পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক থাকতে সাংবাদিকতার দায় নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন। সমসাময়িক সাংবাদিতা যে ঘূর্ণিপাকে প্রবিষ্ট, এ ব্যূহ ভেদের বীজমন্ত্র রোপিত হয়েছিল 'লাল সবুজ' এ তার হাতেই।

২০০৬ সালে ইউরোপে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার মাঠ থেকে সরাসরি সংবাদ পাঠাতেন পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এ খবর তখন ছাপা হতো। বিগত শতকের সত্তর দশকের শেষ ভাগে তিনি ছিলেন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। আর এ কারণেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। ১৯৮৫ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা প্রতিবাদী সংগঠক তিনি। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ যুব ঐক্য ছিল অসম্ভব গতিশীল সংগঠন। যার সভাপতি ছিলেন পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। সংগঠক হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে। উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ছাত্র যুব সম্মেলনে অংশ নেন তিনি। 

বাংলাদেশ থেকে প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন পীযূষ বন্দোপাধ্যায়। বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লোক উৎসব, হলদিয়া ও কলকাতায় আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব, জার্মানের ফ্রাংকফুর্টের বইমেলায় অংশ নিয়েছেন তিনি।

আমার মতো অনেক সাংবাদিকের কাছে তিনিই গুরু। সর্বেব ব্যর্থ! কারণ আমরা কেউ-ই যোগ্য নই। অর্জন করতে পারিনি কোনকিছুই। কায়মনে প্রত্যাশা করি, আপনার আসন্ন দিনগুলো হোক রোদ্রকরোজ্জ্বল, সুমহান। জয়তু পীযুষ বন্দোপাধ্যায়।