আজ বিশ্ব নদী দিবস। ২০০৫ সালে 'জীবনের জন্য পানি' স্লোগানকে উপজীব্য করে দশক পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেখান থেকেই পানি-নদী-জীবন এই ত্রয়ের মধ্যে চিরায়ত সংযোগ আরও গুরুত্ব লাভ করে এবং নদী দিবস পালনের রীতি প্রবর্তিত হয়। সহজ করে বললে, বিশ্বব্যাপী নদীগুলোকে দুরবস্থা থেকে রক্ষা করতেই এ বিশেষ দিনের অবতারণা।

মনে পড়ে শৈশবে দেখা নদীর কথা। কি প্রমত্তা, কি স্রোতস্বীনি সেই নদীগুলো যে দেখেনি, তাকে বোঝানো মুশকিল। জেলে নৌকাগুলো কী ভয়ংকরভাবে নাচছে, এই বুঝি পানির তলে হারিয়ে যাবে। ওই যে, শুশুক কী তাণ্ডবে না নিশ্বাস নিল পানির ওপরে, মাছগুলো ভয়ে দিগ্বিদিক লাফাচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে শৈশবের কত সময় কেটেছে দক্ষিণ বাংলার নদী আর মাটিতে। সময় যেমন অনেক গড়িয়ে গেছে, তেমনি নদীরাও যৌবন হারিয়ে বার্ধক্যে এসে উপনীত হয়েছে। পায়রা, লোহালিয়া, তেঁতুলিয়া, আন্ধারমানিক, আগুনমুখা, কীর্ত্তনখোলাসহ আরও কত নদী। আর এদের প্রবাহকে ছড়িয়ে দিতে উপশিরার কাজ করছে শাখা নদী ও খালগুলো। শিরা কিংবা উপশিরা সবই আজ শুকিয়ে মরণাপন্ন, যেমনটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে থাকা জল আর জলতরঙ্গ।

দক্ষিণ বাংলার নদীগুলোতে এক সময় শুশুক নামে পরিচিত এক ধরনের ডলফিন হরহামেশাই দেখা যেত। স্তন্যপায়ী এই প্রাণী প্রায়ই নিঃশ্বাস নিতে পানির উপরিভাগে উঠে আসে। এ ছাড়া মাছ শিকার করতে গিয়ে এরা সময় সময় পানির উপরিদেশে চলে আসে এবং খুব জোরে মুখ থেকে বাতাস নির্গমন করে। এতে করে শরীরের কতক অংশ পানির উপরিভাগে দেখা যায়। কখনও দেখা যায় শুশুকের তাড়া খেয়ে মাছগুলো বাঁচার জন্য তার মুখের সামনেই লাফ দিচ্ছে। ছোটবেলায় দক্ষিণ বাংলার নদীগুলোতে এমন দৃশ্য কত দেখেছি, তার সীমা নেই। বছর দশেক আগেও যারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লঞ্চ কিংবা স্টিমারে ভ্রমণ করেছেন, তারাও নিশ্চয়ই এ রকম দৃশ্য দেখে থাকবেন। সময়ের পরিক্রমায় এসব শুধুই স্মৃতি। এখন নদীগুলো যে গতিতে নাব্য হারাচ্ছে, তার চেয়েও বেশি গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে শুশুকের মতো এসব নদীর ডলফিন।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুসারে, গত ৫৭ বছরে দেশের ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে অপর্যাপ্ত প্রবাহ, অধিক পলি, খননের অভাব এবং দখলদারিত্বের কারণে দিন দিন হারিয়ে যাছে নদীগুলো। বাংলাদেশে ২৩০টিরও বেশি নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী। এই ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৪টি প্রতিবেশী দেশ ভারতের এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে প্রবাহিত। গঙ্গা (বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পদ্মা নামে পরিচিত) ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো তিনটি শক্তিশালী আন্তঃসীমান্ত নদী তৈরি করেছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় বাংলাদেশ নামক বদ্বীপ। দেশের মোট প্লাবন ভূমির প্রায় ৮০ শতাংশ এই অববাহিকার মধ্যে অবস্থিত। বাংলাদেশে মোট অববাহিকায় মাত্র ৭-৮ শতাংশ এবং অবশিষ্ট অঞ্চল চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানে অবস্থিত। উজানে অবস্থিত ভারত থেকে আসা পানিই বাঁচিয়ে রাখে বাংলাদেশে শিরা, উপশিরার মতো সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোকে। বলা চলে, দেশের নদীগুলোর ৯৯.৫ শতাংশ পানিই উজানে ওপরের-পশ্চিমের রাজ্যগুলোর ওপর নির্ভরশীল। প্রবাহিত এই নদীগুলো শুধুমাত্র পানিই নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে বিপুল পরিমাণে পলি ও অন্যান্য বস্তু। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র একসঙ্গে হিমালয় থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন টন পলি বহন করে এবং বর্ষার সময় এর পরিমাণ হয় প্রতিদিন দুই মিলিয়ন টন। এই বিপুল পরিমাণের পলি চলার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কিছু অংশ নদীর তলদেশে জমা হয়, যা দিন দিন নদীর গভীরতা কমাচ্ছে এবং পানিপ্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বর্ষার সময় বন্যা হয় এবং শুস্ক মৌসুমে বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ এ দেশের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, তিস্তা, মনু, খোয়াই, ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, মুহুরী ইত্যাদি নদীর অববাহিকায় বসবাস করছে এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্যও নির্ভর করছে। কর্ণফুলীর নাম শোনেননি, এমন কে-ই বা আছেন? কত গান, সাহিত্য, পুঁথি, রূপকথার জন্ম দিয়েছে কানের ফুল হারিয়ে যাওয়া সেই নদী, এখন দিন দিন পলি জমে হারাচ্ছে গভীরতা। চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নিজেই আজ নিষ্প্রাণ।

মা যমুনা কবে কখন তার কালো জলের প্রবল ধাক্কায় লৌহজং অপত্যের জন্ম দিয়েছিল, সেটা আমাদের মনে নেই। যমুনা কথা বলতে পারলে নিজেই জানাতে পারত কবে তার কোল আলো করে লৌহজংয়ের আগমন ঘটে। জীবন্ত সত্তা যমুনা বরাবরের মতো ধরণীর কোনো একটা অংশকে প্রাণ প্রাচুর্যে ভরে তোলার জন্যই যে লৌহজংয়ের আবির্ভাব ঘটিয়েছিল, তা সব জীব যারা এর প্রাণরসে সিক্ত হয়ে বেড়ে উঠেছে, সবাই তা স্বীকার করতে বাধ্য। সে যমুনার যেমন যৌবন হারিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হারাতে বসেছে তার সন্তান শাখা নদীগুলো- যেমন লৌহজং। এমন করে সারাদেশে প্রতিবছর তিলে তিলে হারাচ্ছে নদী। যে স্রোতধারায় এসব নদীর জন্ম, সেসব নদীর উজানে ভারতীয় অংশে বাঁধ নির্মাণ করায় বাংলাদেশ অংশের নদীগুলো শুস্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। বাঁধের মাধ্যমে জল প্রত্যাহার, পরিকাঠামো নির্মাণের মতো কর্মকাণ্ড যেমন শুস্ক মৌসুমে পানির সংকট সৃষ্টি করে, তেমনি বর্ষাকালে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূল সংকট শুরু হয় ভারতীয় উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করার কারণে। ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করলে এ দেশের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ অর্ধেকে নেমে আসে। একাধিকবার আলোচনা সত্ত্বেও ভারত একতরফাভাবে বহু আন্তঃসীমান্ত নদী যেমন- তিস্তা, গোমতী, খোয়াই, ধরলা, দুধকুমার, মনুর উৎসে একাধিক বাঁধ নির্মাণ শুরু করেছে। মুহুরী, ছাগলনাইয়াসহ অনেক নদী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে যে কোনো হস্তক্ষেপ ভাটিতে অবস্থিত জনগণের জন্য পানির অভাব সৃষ্টি করে এবং এতে অসন্তোষ ও অনাস্থার সৃষ্টি হয়। নদীর জোয়ারে যেমন ভাটা লাগে, তেমনি সম্পর্কেও লাগে ভাটা।

একদিকে যেমন পানির প্রবাহ কমে গিয়ে নদীগুলো মরে যাচ্ছে, তেমনি কলকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য নদীগুলোর পানিকে বিষাক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী করে তুলছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীর পানি এখন পরিশোধনেরও অযোগ্য।

উজানের নদীগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দেশের দক্ষিণে থাকা স্রোতস্বীনি নদীগুলোতে। উজানের নদীগুলোর পানি বাঁচিয়ে রাখে ভাটির নদীর স্রোতধারা। এ কারণেই ছোটবেলার স্মৃতিতে থাকা সেই পানি, পানির ঢেউ, নৌকার নাচানাচি কিংবা জেলের জালে রুপালি ইলিশের ঝলক এখন কেবলই হারিয়ে যাওয়া শত নদী পুরো দেশটাকে কেমন মানবদেহের শিরা, উপশিরা আর ধমনীর মতোই জড়িয়ে রেখেছে, যেমনটা দেখি প্রাণীদেহে। মানব শরীরে বহমান হাজারো রক্তপ্রবাহ নালির আলাদা নাম না থাকলেও মাতৃভূমির শরীরজুড়ে বহমান নদীরূপী প্রবাহ নালিগুলোকে আমরা ভালোবেসে কত বাহারি নাম দিয়েছি। দক্ষিণ বাংলার ধমনী পায়রা, লোহালিয়া, তেঁতুলিয়া, আন্ধারমানিকের মতো উন্মত্ত নদীগুলোও আজ কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এভাবে নদীগুলো মরে যেতে থাকলে পুরো দেশমাতাই তো অচল হয়ে যাবে, বিপন্ন হবে আমাদের অস্তিত্ব।\হআমাদের সমাজ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্থনীতি সব কিছুর সঙ্গে নদীর রয়েছে আবহমানকাল ধরে নিবিড় সম্পর্ক। নদীকে বলা চলে আমাদের প্রাণ। নব্বই দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড সংগীতের কথা মনে পড়ে-

'এই নদীতে সাঁতার কাইটা বড় হইছি আমি

এই নদীতে আমার মায় কলসিতে নেছে পানি

আমার দিদিমা আইসা প্রতিদিন ভোরে

থালাবাটি ধুইয়া গেছে এই নদীর কিনারে।'

কী আবেগ, ভালোবাসা আর স্মৃতির পরশ জড়িয়ে আছে নদীর সঙ্গে। অথচ আমাদের সামনেই দিন দিন কেমনভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাণের স্পন্দন, জীবনতরঙ্গ নদীগুলো। আবার কি জীবন জোয়ারের তাণ্ডবে নদীগুলোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় সেই উত্তাল ঢেউ, শুকিয়ে যেতে বসা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে আবার প্রাণের জোয়ার?