শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের পরতে পরতে রয়েছে নেতৃত্বের ছাপ। জাতির পিতার রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত আনুকূল্যের গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক সৌধ গড়ে তোলেননি। কিংবা ক্ষমতার গজদন্ত মিনারে বসে অতীত গৌরবের উষ্ণতায় আচ্ছন্ন থেকে কাল কাটাননি। বরং বৈরী-স্রোতে হাল ধরেছেন নৌকার। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশের প্রতিকূল পরিবেশে অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে, দলের ভেতর-বাইরের অসংখ্য সংকট মোকাবিলা করে, নীলকণ্ঠ পাখির মতো অনেক বিষ হজম করে তাকে বেয়ে যেতে হচ্ছে রাজনীতির তরণী।

কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক জীবনের বাঁকে বাঁকে উদ্ভূত রকমারি চ্যালেঞ্জ সততা, সাহস ও কৌশলের সঙ্গে মোকাবিলা করে যে নতুন রাজনীতি ধারা তিনি সূচনা করেছেন, তা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং দক্ষ নেতৃত্বের প্রসূন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর থেকে অদ্যাবধি তার কর্মধারা পর্যালোচনা করলে এর প্রমাণ মিলবে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একেবারে সম্মুখসারি থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে যখন প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী শক্তির কাঁধে চড়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি কৌশলে মসনদে বসে, তখনও ভেঙে পডেনি তার মনোবল। বরং আরও বেশি শানিত হয় তার পিতৃ-প্রভাবিত জননন্দিত রাজনীতি। অবশেষে অনেক ত্যাগ এবং আন্দোলনের বিনিময়ে একসময় শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বই আবারও বিজয়কেতন ওড়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে। দীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, একাত্তরের গণমানুষের রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। বলা যায়, শেখ হাসিনা ফিরে এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন (ঠবহর, ারফর, ারপর)।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। কিসিঞ্জার-কথিত 'তলাবিহীন ঝুড়ি' এখন স্যাটেলাইট যুগের মানচিত্রে জায়গা করে নেওয়া এক গর্বিত দেশ। বিশ্বব্যাংকের অসহযোগিতাকে অগ্রাহ্য করে নিজ সামর্থ্যে পদ্মা সেতুর মতো একটি স্টেট অব দ্য আর্ট স্থাপত্য গড়ে তোলার যোগ্যতাসম্পন্ন এক স্বাবলম্বী জাতি। 'তলাবিহীন ঝুড়ি'র তকমা এখন একুশ শতকের সেরা প্রহসন। আর এসবের পেছনে ছায়া হয়ে মিশে আছে একজনের অনিঃশেষ দায়বোধ, অপরাজেয় উদ্যম, অপরিসীম দক্ষতা, দুর্মর দেশপ্রেম এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং শেখ হাসিনা। জরিপকারীরা ভুল বলেননি, 'শেখ হাসিনা তার দলের চাইতেও অধিক জনপ্রিয়।' কেবলই তার সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ আর গতিশীল নেতৃত্বের কারণে।

সব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। বেড়ে চলেছে জিডিপি গ্রোথ, মাথাপিছু আয়, ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় সবকিছুই। অর্থনীতির সব সূচকই এখন ঊর্ধ্বগামী। আর এই অগ্রগামিতার উত্তাপ যে কেবল সূচকচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে, তাও নয়। একেবারে খালি চোখেও তার অস্তিত্ব দেখা যায়। সারাদেশ ঘুরে কোথাও এখন আর সেই জীর্ণ কুঁড়েঘর, ক্ষুধাতুর মানুষ, অস্থিচর্মসার হালের বলদ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়তো সাময়িকভাবে নিম্নবর্গীয় জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। কিন্তু তা সামলিয়ে উঠতেও খুব বেশি সময় লাগে না। যে জনজীবনের সঙ্গে একদা দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা, মন্বন্তর শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, সেই জনজীবন এখন অনেক বেশি সুখকর, স্বস্তিদায়ক এবং নিরাপদ।

শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টির একটি কৌশলগত দিক হলো অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে স্থিতিশীল রাখা, স্থিতিস্থাপক রাখা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য দিক হলো- এই উন্নয়ন কোনো আকস্মিক উন্নয়ন নয়। মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার আকাশে হঠাৎ আলোর ঝলকানি নয়। এই উন্নয়ন সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং টেকসই। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলসের সিঁড়ি বেয়ে আমরা অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস বাস্তবায়নের দিকে। আর সে কারণেই অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন্স নেটওয়ার্ক শেখ হাসিনাকে ঝউএ চৎড়মৎবংং অধিৎফ প্রদান করেছে। রূপকল্প-২০২১-এর যে অভীষ্ট, একুশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুতেই মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া- তা সম্ভবত আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। তার সুলক্ষণগুলো এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে গ্রোথ রেট ৭-এর উপরে ধরে রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ২০২১-এ গিয়ে ৩২২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। অসংখ্য বিনিয়োগ সুবিধা সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে, জন্মহার কমেছে, যা নির্ভরতা হার কমাতে এবং মাথাপিছু আয় বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। বাংলাদেশের বাজারনির্ভর অর্থনীতি আজ সাধারণ বিচারে বিশ্বের ৪৪তম অর্থনীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার সাম্যের বিচারে বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৪তম অর্থনীতিতে উন্নীত হবে। পরবর্তী ১১-এ উদীয়মান বাজার অর্থনীতির তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব মতে, বাংলাদেশ ৭.১% প্রবৃদ্ধিসহ বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধিষুষ্ণ অর্থনীতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এ দেশের অর্থ খাত এখন উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থ খাত। আইএমএফের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ২০০০ ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ বর্তমানে কমনওয়েলথ, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন, সার্ক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সুযোগ্য সদস্য হিসেবে উন্নয়নের সোপান বেয়ে এগিয়ে চলেছে।

বাংলাদেশের এই অসামান্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৈবযোগে সংঘটিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এ দেশের মানুষের স্বপ্টম্নসাধ, অসংখ্যের শ্রম-ঘাম, আর একটি সুদক্ষ সরকারের নেতৃত্ব, বিশেষ করে সেই সরকারপ্রধানের দক্ষতা, আন্তরিকতা, দেশপ্রেম এবং দূরদৃষ্টি। সত্যিই আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের উপাখ্যানে জননেত্রী শেখ হাসিনার অবদানের জুড়ি মেলা ভার। শেখ হাসিনার চৌকস নেতৃতে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল।

শেখ হাসিনা আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক। এরই মধ্যে ভূরাজনীতিতে তার স্বাধীন একটি কণ্ঠস্বরও তৈরি হয়েছে। তিনি বিশ্বে তার উপস্থিতি অনুভব করাচ্ছেন এবং বিশ্বনেতারাও তাকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে বিবেচনা করেন। উপমহাদেশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা দারুণ সাহস ও কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়ে চলেছেন। তিনি নিজেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আধিপত্যের জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশ্বে শেখ হাসিনা খুব ভালোভাবেই বাংলাদেশ এবং বাকি বিশ্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে পারছেন এবং তার স্বার্থ রক্ষার জন্য লড়াই করার সামর্থ্য অর্জন করছেন। শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী নেতা এবং এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে দূরদর্শী রাজনীতিবিদদের একজন।

শেখ হাসিনা তার অনুপম ব্যক্তিত্ব, গতিশীল চৌকস নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা, মেধা ও ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে নিজেকে বিকল্পহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। চার যুগেরও অধিককাল ধরে নিজের দলকে সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিগত কাউন্সিলে তার দলের নেতাকর্মীরা তাকে আমৃত্যু পার্টিপ্রধান হিসেবে কাজ করে যাওয়ার ম্যান্ডেট দিয়েছেন।

তবে তিনি কেবল তার দলের জন্যই নয়, দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বটে। বঙ্গবন্ধু যেমন আওয়ামী লীগের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন; সাড়ে সাত কোটি মানুষকে চূড়ান্ত স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং স্বাধীনতা পাইয়ে দিয়েছিলেন। তার রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনাও তেমনি ষোলো কোটি মানুষকে নিয়ে অতিক্রম করে চলেছেন উন্নয়নের একেকটি সিঁড়ি। নতুন নতুন স্বপ্টম্ন দেখাচ্ছেন। দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ দিয়ে চলেছেন সেসব স্বপ্ন- একের পর এক। ভয়াল করোনা- সংক্রমণের এই বৈশ্বিক বিপর্যয়ও তাকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারেনি।