শেখ মুজিবের আদর্শ, চিন্তা-দর্শন আর রক্তস্রোতধারাকে চিরকালের জন্য বন্ধ করতে ঘাতকরা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। মহান স্রষ্টার অশেষ কৃপায় দু'বোন বেঁচে যান। এক রাতের ব্যবধানে জানা পৃথিবী অচেনা মনে হয়। বেঁচে গেলেও নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে পারেননি ছয় বছর। পিতা কর্তৃক বাঙালির জন্য একটি জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রতিদান তারা এভাবে পেয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকলেও শুরু হয় অন্য এক সংগ্রাম।

বুকভরা হাহাকার, দৃঢ় সংকল্প আর প্রিয়জনদের স্মৃতি বুকে ধারণ করে হতভাগ্য দু'বোন ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন। বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের নৌকার হাল ধরেন শেখ হাসিনা। পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে নয়; মানুষ শেখ মুজিব হত্যার বিচার করে মানবাধিকার আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। একই সঙ্গে পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেওয়া লাখো শহীদের রক্ত-ঋণ শোধ করা; পিতার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সমতা ও ন্যায়বিচারের মানবিক দর্শনের ভিত্তিতে সোনার বাংলা গড়া; দুঃখী মানুষের মুখে দু'বেলা অন্নের সংস্থান করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে নিন্দুকের অপপ্রচারের যথোচিত জবাব দেওয়ার লক্ষ্য পূরণে শুরু করেন নিরলস পরিশ্রম। লক্ষ্য পূরণে তিনি বর্ধিত জীবনের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন।

এ বছর শেখ হাসিনার 'বেঁচে থাকা'র ছেচল্লিশ বছর আর দেশে ফেরার চার দশক পূর্ণ হলো। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে 'বেঁচে থাকা'র অপরাধে তার ওপর উনিশবার হামলা হয়েছে। ১৯৮১ সালে ফ্রিডম পার্টি প্রথম হামলা করে। সবচেয়ে বড় হামলা হয় ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়; ২২ নেতাকর্মীর জীবন আর অনেকের পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে আরেকবার প্রাণে বাঁচেন। এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন; নব্বই পরবর্তী 'গণতান্ত্রিক' সরকারের অগণতান্ত্রিক কলাকৌশলের মুখে টিকে থাকার লড়াই, সরকারের প্রেরণায় সৃষ্ট জঙ্গিবাদবিরোধী সংগ্রাম, সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জেল-জুলুম ইত্যাদি মোকাবিলা করতে কেটে যায় প্রায় আড়াই দশক। বাকি দেড় যুগ রাষ্ট্রক্ষমতায়।

এ স্বল্প সময়ের অধিকাংশই আবার রাষ্ট্রে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা মুক্ত করে বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচার সম্পন্ন করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই চলে যায়। সঙ্গে চলে পিতার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার প্রাণান্তকর চেষ্টা। সীমিত সময়, অনেক কাজ, পাহাড়সম প্রতিকূলতা। লক্ষ্যে পৌঁছতে তাকে সময়ের আগে চলতে হয়েছে। প্রায় এক দশকের সংগ্রাম শেষে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারেননি। সে সময়ে তাকে দলের ভেতরে-বাইরে সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেকে দল ছেড়ে চলে গিয়েছেন। দীর্ঘদিনের অপপ্রচার আর স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের প্রভাববলয়ে গঠিত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রযন্ত্রে শেকড় গেড়ে বসা আওয়ামী-বিদ্বেষী সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বাধাবিপত্তি আর অসহযোগিতা অতিক্রম করে সামনে এগোতে হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করার পর সংঘটিত হয় বিডিআর বিদ্রোহ। অনেকের ধারণা, সামরিক বাহিনীকে ক্ষেপিয়ে রক্তাক্ত ক্যু-এর মাধ্যমে শেখ হাসিনাবিহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য ছিল। শেখ হাসিনা অসীম ধৈর্য আর প্রজ্ঞা দ্বারা সে যাত্রায় রাষ্ট্র তথা আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষা করেন। সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ দূর করতে তাকে অসীম সাহসিকতা আর কূটনীতির পরিচয় দিতে হয়েছে। ছিন্ন করতে হয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল। মোকাবিলা করতে হয়েছে রাষ্ট্রকে বিরাজনীতিকীকরণের চক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্র-বিশ্বব্যাংক আর তথাকথিত সুশীল কুশীলব অসাধু চক্রের মিলিত ষড়যন্ত্রে তাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর চেষ্টা চলে। সেটাও তিনি সামাল দেন একা হাতে।

দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা আর প্রচ্ছন্ন হুমকি উপেক্ষা করে প্রথমবারের মতো দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প পদ্মা সেতু তিনি নির্মাণ করেন। এটি করার মাধ্যমে তিনি প্রকৃত অর্থেই বাঙালিকে হাত পাতা জাতির তকমা থেকে মুক্ত করে মর্যাদাশীল জাতিতে রূপান্তর করেন। 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' স্লোগান দিয়ে তিনি একটি জাতিকে 'অ্যানালগ' থেকে ডিজিটাল জাতিতে রূপান্তর করেন। লক্ষাধিক টাকার মোবাইল ফোনকে তিনি একেবারে প্রান্তজনের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু গ্রামে গ্রামে 'বিজলী' সরবরাহের প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিলেন। আজ বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। রূপপুর প্রকল্পও আজ আর স্বপ্ন নয়। ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের স্বপ্নম্ন বাস্তবায়নের পথে দেশ। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বন্দর, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন সংক্রান্ত বাবার প্রতিশ্রুতি তিনি বাস্তবায়ন করে চলেছেন একের পর এক। এপপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের মতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যয়বহুল প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয়। কল্যাণ রাষ্ট্রের আদলে মানুষকে ভাতার আওতায় নিয়ে আসার প্রকল্প শেখ হাসিনার নিজস্ব চিন্তার ফসল।

৭০-এর সেই নির্বাচনী ভাষণে শেখ মুজিব যমুনা, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা আর কর্ণফুলী নদীতে সেতু নির্মাণ করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মায় পদ্মা সেতু (মানুষ শেখ হাসিনা সেতু নামকরণ করতে চায়), পায়রা সেতু, শেখ জামাল, শেখ কামাল, শেখ রাসেল ইত্যাদি সেতু প্রতীকী অর্থে বাংলাদেশের মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণের কাজ শেষের পথে। চট্টগ্রাম মোংলা বন্দরের উন্নয়ন, পায়রা বন্দর নির্মাণ, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং কপবাজার বিমানবন্দরকে আধুনিকায়ন করে বিশ্বযোগাযোগের হাব-এ রূপান্তর বাংলাদেশকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এসবই শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপের ফসল। শেখ হাসিনা নিজে পিতার মতোই বিদেশি তত্ত্বে মত্ত না থেকে দেশি উন্নয়ন দর্শনকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা একটি জাতির মনস্তত্ত্বকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। বিদেশি সাহায্যনির্ভর হীনম্মন্য একটি জাতিকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করেছেন। টানা তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার ফলে এটি সম্ভব হয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাস্তা বন্ধ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি; রাজনৈতিক অধিকারের নামে হরতাল-জ্বালাও-পোড়াওয়ের সংস্কৃতি থেকে দেশ আজ অনেকটাই মুক্ত। নির্বাচন বয়কট আর ভোট বর্জনের নামে অরাজকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা তিনি প্রতিহত করেছেন। এর ফলে টিকে থাকতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের অপসংস্কৃতির দিন শেষ হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে তাকে কিছুটা ঝুঁকি নিতে হয়েছে। সমালোচনাও সইতে হয়েছে বিস্তর।

২০১৪ সালে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ভোট বর্জন-প্রতিহতকরণ আর অগ্নিসন্ত্রাস মোকাবিলা করার মতো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়েছে তাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি আর সে পথে না গেলেও দু'মনা মনোভাবের কারণে নির্বাচনী মাঠ থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়ে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে মার খেয়েছে বিএনপি। তাত্ত্বিক বিশ্নেষকদের অনেক সমালোচনা সইতে হলেও এর সুফল ভোগ করছে জনগণ।

শেখ হাসিনার জীবনও বাবার মতোই দেশ ও জনগণের জন্য উৎসর্গীকৃত। প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করেছেন নিজের সন্তানদের। কন্যা পুতুল আর পুত্র জয়ের মাতৃত্বের জায়গাটি পূরণ করেছেন শেখ রেহানা। সবহারা দু'বোনের নিরন্তর সংগ্রাম পিতার রেখে যাওয়া হতভাগ্য বঙ্গসন্তানদের জন্য। একজন দৃশ্যমান, অন্যজন অন্তরালে প্রেরণার উৎসরূপে। নিন্দুকদের কত জল্পনা; কিন্তু দু' বোন যেন হরিহর আত্মা। হবেই-বা না কেন? সব হারিয়ে দিল্লির নির্বাসিত জীবনে দু'বোন বসে বসে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করেছেন। এখন চলছে তার বাস্তবায়ন।

এ দেশ আর জনগণের জন্য শেখ হাসিনার পক্ষে যা করা সম্ভব তা অন্য যে কারও পক্ষে নয়। শৈশব থেকে দেশের জন্য তার বাবার সংগ্রাম তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন, শৈশবে বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রতিনিয়ত, এমনকি প্রিয় কন্যার বিয়ের দিনেও শেখ মুজিব জেলে বন্দি। জনগণের তরে শেখ মুজিবকে যেন তার মাও উৎসর্গ করেছিলেন। মা শেখ ফজিলাতুন নেছা বিরক্ত না হয়ে বরং উৎসাহ দিয়েছেন, তিলে তিলে গচ্ছিত অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। শেখ হাসিনা নিজে রাজনৈতিক গোয়েন্দা ও দূতিয়ালির কাজ করেছেন।

তিনি যে পরিমণ্ডলে বড় হয়েছেন সেখানে; খাবারের টেবিলে নিজস্ব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির আলোচনা ছিল না। ছিল শুধু ত্যাগ, প্রত্যয় আর মানুষের বঞ্চনা মুক্তির আলোচনা। এমনই এক পারিবারিক ঐতিহ্য আর শিক্ষা শেখ হাসিনার মানস গঠন করেছে। দেশের মধ্যে তাকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণের চেষ্টা করেও ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার ঝুড়িতে অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মধ্যে ফরচুনের মহান নেতার তালিকায় দশম স্থান আর গবেষণা সংস্থা পিপলস অ্যান্ড পলিটিপের জরিপে পরিচ্ছন্ন ও সৎ সরকারপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থান প্রাপ্তি জাতি হিসেবে আমাদের মাথা উঁচু করে। পিতার অসম্পূর্ণ স্বপ্টম্ন বাস্তবায়নে কন্যার জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির হবে ঐতিহ্যিক রাজনৈতিক পরিবারের জন্য।