সময়কাল এলোমেলো হতে পারে। বয়স হয়েছে। ডায়েরি লিখতুম না তখন। ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ হবে হয়তো।

অগ্রজ রশীদ হায়দারের স্ত্রী ঝরার (আনিসা হায়দার) বড় আপার ডাকনাম 'বেগম'। তার অনুজ-অনুজাকুলের 'বেগমবু'। আমরাও বলতুম। হেতু, তিনিও পাবনার। আমাদের দোহারপাড়ার বাড়ি থেকে ঝরা ভাবির সাধুপাড়ার বাড়ি (পাবনা শহরেই দুটি পাড়া আছে সাধুপাড়া ও শয়তানপাড়া, দূরত্ব বেশি নয়) সাকল্যে তিন কিলোমিটার। তো, বেগমবু পাড়াতুতো। অন্য পাড়ার হলেও।

পয়লা অগ্রজ জিয়া হায়দার ছাড়া (পড়েছেন জিলা স্কুলে) বাকি ভ্রাতৃকুল সাধুপাড়ার জিসিআইর (গোপাল চন্দ্র ইনস্টিটিউট) ছাত্র।

ঢাকায় বেগমবুর বাড়ি বত্রিশ নম্বর সড়কের শুরুতে। পাঁচ-ছয়টি বাড়ির পরই শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। আওয়ামী লীগ নেতা (বঙ্গবন্ধু উপাধি পরে)। লোকেও বলতেন 'শেখ মুজিব'। 'রহমান' দরকার ছিল না। নামেই সর্বজন প্রিয়। পরিচিত।

বেগমবুর স্বামী আবুল কাসেম। ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় প্রতিষ্ঠা 'ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড'। চার ইঞ্জিনিয়ার মিলে। প্রত্যেকে বন্ধু। এর আগে সম্ভবত (ভুলও করতে পারি) ঢাকাসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কনস্ট্রাকশন নিয়ে বড় ব্যবসা হয়নি।

চার বন্ধুর একজনের নাম স্মরণ হচ্ছে না এই মুহূর্তে। বাকি দু'জন মজিদ সাহেব (কবি গোলাম মোস্তফার জামাই)। ইমাম সাহেব (শহীদ জননী জাহানারা ইমামে স্বামী)।

শেখ মুজিবুর রহমান কোন দিন, কোন মাসে মুক্তি খবর পড়ি সংবাদ, ইত্তেফাকে। দেখার বাসনা জাগে। কীভাবে সম্ভব?

বেগমবুর বাড়িতে গেলে জানা যাবে, ঘরে ফিরেছেন কিনা। দলীয় কর্মীরা নিশ্চয়ই সংবর্ধনা জানাবে, ফুলসহ। বেগমবুর বাড়ি থেকেই দেখা যাবে। কিংবা শুনতে পাব বেগমবুর বড় কন্যা শিরিনের কাছে ('খালা' বলি)।

শিরিন, লুলু আপা (সুলতানা কামাল। কবি সুফিয়া কামালের কন্যা), হাসু আপা (শেখ হাসিনা) সমসাময়িক। একই চৌহদ্দির। বন্ধু। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এঁর-ওঁর বাড়িতে যাতায়াত।

এক বিকেলে দেখি তিন সখীর আড্ডা। বেগমবুর বাড়িতে (ড্রয়িং রুমে)। এর আগে শেখ হাসিনাকে দেখিনি। লুলু আপা পরিচিত।

বেগম সুফিয়া কামালের বাড়িতে দেখেছি। পরিচিত টুলু আপা (সাঈদা কামাল। ছোটবোন লুলু আপার। শিল্পীবন্ধু কাজী হাসান হাবিবের সৌজন্যে টুলু আপার সঙ্গে আরেকটু বেশি পরিচয়। হাবিবকে সহকর্মী করেছিলুম দৈনিক সংবাদে। সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েই মনুভাই (আহমদুল কবির) এবং ভাইয়া (বজলুর রহমান)-কে আবদার কাজী হাসান হাবিবকে চাই। সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন। কাজী হাসান হাবিবকে নিয়ে লেখার ইচ্ছে, স্মৃতিচারণ)।

শিরিন খালা বললেন, 'লুলুকে চেন'। আরেকজন অপরিচিত। চুল বিনুনি গাঁথা। প্রায় পিঠ-অব্দি। দুই আঁখি ঝলমলে। মুখ-চেহারা দীপ্ত। নিঃভাঁজ। জানান, 'ওর নাম হাসু'। জিজ্ঞেস করলুম, 'পুরো নাম?' -শেখ হাসিনা। শেখ মুজিবের বড় মেয়ে।

বললুম, 'লুলুকে আপা বলি, হাসু আপা চিনি। আপনি তবে।' তিনজনের মৃদু হাসি।

বলি, "আপনার বাবাকে (না কি, 'আব্বা' বলেছিলুম?) দেখতে যাব, কীভাবে দেখা যাবে? কখন?"

উত্তর : বলতে পারব না। আসবেন। ট্রাই করবেন।

ট্রাই করলুম। মাস কয়েক পরে দেখা। শেখ মুজিব বাড়ির বারান্দায়। কয়েকজন সঙ্গী। বাড়িতে ঢোকার সাহস হলো না। সুঠাম দেহ। হাতে পাইপ। সহকর্মীদের সঙ্গে (হয়তো।) দেখে ভিরমি খাই। মনে হলো লৌহমানব। দেখে সটকে পড়ি।

বন্ধুদের বলতেও পারি না। ছাত্র ইউনিয়ন করি। মস্কোপন্থি। আওয়ামী লীগ শত্রু। আমাদের নেতা মোজাফফর আহমেদ। তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। বাড়িতে নিয়মিত যাই। তার স্ত্রী আমিনা অনেকটাই পারিবারিক। ঝরা ভাবির বন্ধু। সহপাঠিনী। প্রায়শঃ বাড়িতে আসেন।

শেখ মুজিবের বাড়িতে, ১৯৭০ সালেও দেখেছি, বত্রিশ নম্বর ধানমন্ডির কয়েক বাড়ি থেকে ডেকচিভর্তি খাবার যেত। বেগমবুর বাড়ি বাদ যায়নি। ১৯৭১-এ বাদ।

হাসু আপাকে ১৯৭১-এ দেখিনি। স্বাধীনতার পরে একবারই। কথা হয়নি। তখন ঘেরাটোপে। কামালের (শেখ কামাল) সঙ্গে বার কয়েক দেখা, বলতেন 'এসো'। (বাড়িতে)। সাহস হয়নি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে কলকাতায় আমরা (ছাত্র ছিলুম) পথে নেমে প্রতিবাদ করি। বিক্ষোভ জানাই। নেতৃত্বে শাহ মোহাম্মদ তৌজীহ। কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র (এখন তিনি ব্রিটিশ নাগরিক)। ওঁর বুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি। আমাদেরও।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিনক্ষণে শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা জার্মানিতে। বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবরে কান্নায় বাঁধনহারা (এই নিয়ে লিখেছি আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ড 'লক্ষ্মীছাড়ার ইহলোক'-এ)। অংশবিশেষ প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে।

শেখ হাসিনা, ওঁর পরিবার দিল্লিতে আশ্রিত। প্রণব কুমার মুখোপাধ্যায় (পরে রাষ্ট্রপতি) দেখাভালে। ওঁরই এক সহকর্মীর কাছ থেকে শেখ হাসিনার খবর পাচ্ছিলুম নিয়মিত। দেখা করতে যাই। বলেন, "সমস্যা। অ্যাপোয়েন্ট ছাড়া অসম্ভব।" বিফল। ফিরি ভগ্ন মনোরথ।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরছেন। জিয়ার আমলে। দিল্লি থেকে ফোন। শেখ হাসিনারই ফোন। কবে, কখন কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছুবেন। তার আগে, অমৃতবাজার পত্রিকায় জানালুম। নিউজ এডিটর প্রদীপ সেনের কড়া হুঁশিয়ারি 'ইট শুড বি এক্সক্লুসিভ। অন্য পত্রিকা না জানে।'

দমদম বিমানবন্দরে গিয়ে দেখি কাদের সিদ্দিকী, আওরঙ্গজেব। ওঁদের সঙ্গে বেশি কথা হয়নি।

ভিআইপি লাউঞ্জে নানা আলোচনা। ঢাকায় ফিরলেন। লিখলুম। ঢাকায় ফিরে হাসু আপা বললেন, সাংবাদিক সম্মেলনে, 'আমাকে সি-অফ করতে এসেছিলেন কবি দাউদ হায়দার।'

অন্য কারোর নাম বলেননি। ইত্তেফাকের সংবাদ।

বিরোধীদলের নেত্রী যখন, ওঁর বই পাঠিয়েছেন। বই পড়ে লিখিনি। নানা কারণে। না লিখলেও মনমননে সর্বদাই।

ইংরেজি ভাষায় 'বি লেটেড'। জন্মদিনে বা অভিনন্দনে দেরিতে হলেও শুভেচ্ছা। যুগ যুগ জিও।