১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে আমরা বহুমাত্রিক মূল্যায়ন করি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন বিজয় ইত্যাদি নিয়ে আমরা আলোচনা করি। দুঃখজনকভাবে আমাদের আলোচনাগুলো থেকে বাদ পড়ে যায় গণহত্যার বিষয়গুলো। এই দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ৯৪২টি বধ্যভূমি, প্রায় ৩০০০ গণকবর। এই দেশের এমন একটি জেলা নেই, এমন একটি থানা নেই, এমন একটি ইউনিয়ন নেই, এমন একটি গ্রাম নেই যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ করেনি। আর সেই হত্যাকাণ্ডগুলো এমন ভয়ানকভাবে তারা করেছিল যে হিটলারও লজ্জিত হয়ে যেত।

৩০ সেপ্টেম্বর। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মাহমুদপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজাকার ও আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে মাহমুদপুর গ্রামে হামলা চালায়। এ হামলার ঘটনায় ২৩ জন শহীদ ও অনেকেই পঙ্গুত্ববরণ করেন। মাহমুদপুর গ্রামের হামলার বর্ণনায় বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা জানান, বঙ্গবন্ধুর সহচর ও এমএনএ হাতেম আলী তালুকদারের বাড়িতে প্রথমে অগ্নিসংযোগ করার পর শুরু করে অসংখ্য বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। পরে তা প্রতিহত করার জন্য কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার হুমায়ুন বেঙ্গলের নেতৃত্বে স্বল্পসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মাহমুদপুর গ্রামের বটতলায় পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে হানাদার বাহিনীরা এই গ্রামে মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন ও নরহত্যা চালায়। তারা শতাধিক নিরীহ মানুষকে আটক করে পানকাতা গ্রামের ঈদগা মাঠে ব্রাশফায়ার করে। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হন অনেকেই।

এই ভূখণ্ডে ১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে নজিরবিহীন গণহত্যা পরিচালনা করেছিল সে রকম আরেকটি গণহত্যার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় রাজনৈতিক মঞ্চে যে পটপরিবর্তন ঘটে তার ফলেই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের গণহত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী অংশ রাজনীতিতে সক্রিয় হতে শুরু করে। শান্তি কমিটি-রাজাকার-আলবদর নেতারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসীন হোন। তারা শুরুতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন। এরপর শুরু হয় গণহত্যা বিষয়ে নীরবতার পালা। নীরবতা এক সময় নিয়ে যায় তথ্য-বিকৃতির দিকে, তথ্য-বিকৃতি জন্ম দেয় গণহত্যা অস্বীকারের রাজনীতি। পাকিস্তান যে শুধু বাংলাদেশের মানুষের ওপরই গণহত্যা চালিয়েছিল তা নয়, বেলুচিস্তানেও তারা গণহত্যা চালিয়েছে যুগ যুগ ধরে। তবে বেলুচিস্তানের মানুষরা পারেনি জয়ী হতে। পেরেছি আমরা। আমরা ঠিকই মনবতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধকে সমুচিত জবাব দিয়েছি। আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে অনেক অনেক। পাকিস্তানিরা '৭১-এ এতটাই নির্মম গণহত্যা আমাদের ওপর চালিয়েছিল যেটা গোটা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল।

বিভিন্ন লেখায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের যে অবর্ণনীয় অত্যাচার করে হত্যা করত সে রকম কিছু অত্যাচার আর নিপীড়নের তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও এমন বহু ঘটনা আছে যেগুলো আমাদের অধিকাংশেরই অজানা। যারা একাত্তরে নির্যাতিত হয়েছেন, সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার শিকার যারা তাদের কথা বলার কিছু নেই। তাদের ব্যথা-বেদনার উপলব্ধি শুধুই তাদের কাছে আবদ্ধ। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অপারেশন সার্চলাইটে নিহত ও আক্রান্তদের স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। যেই তিরিশ বা তার অধিক লাখ মানুষ এই জমিনে শুয়ে আছে, যাদের অনেকের কবর পর্যন্ত হয়নি। সেই প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের আলাদা আলাদা একটা ঘটনা আছে। সে ঘটনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে আনা আমাদের কর্তব্য। গণহত্যা-নির্যাতনের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে হয় ইতিহাসের প্রয়োজনে। এটি ইতিহাসের দায়। লাঞ্ছনার, নিগ্রহের ইতিহাস মানুষকে সচেতন করে, বোধ শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। নতুন প্রজন্ম এই নিগ্রহের ইতিহাস থেকে আগামীর শিক্ষা নেয়। যে শিক্ষা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার স্মৃতি একটি মানবিক ইউরোপের রূপরেখা তৈরি করেছে, মানুষের বিবেককে জাগ্রত করেছে।