বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে যারা প্রাথমিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের এতটুকু পথ পাড়ি দিতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কারণ, এবার গণবিজ্ঞপ্তির পর যখন ফল প্রকাশ করা হবে, ঠিক তখনই নিবন্ধিত শিক্ষকদের একাংশ এক রিট করেন। এ কারণে গণবিজ্ঞপ্তির ফল প্রকাশে জটিলতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে মামলা-মোকাদ্দমার ঝক্কি-ঝামেলা শেষ হওয়ার পর গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আইনি বাধা কাটলেও অধিকতর নিশ্চয়তার জন্য এনটিআরসিএ কালক্ষেপণ করতে থাকে। এই অবস্থায় গণবিজ্ঞপ্তির ফল প্রত্যাশীদের কেউ কেউ এনটিআরসিএর দপ্তরে গিয়ে মিটিং-মিছিলও করেছেন। এমন একটা বন্ধুর ও বৈরী পথ ধরেই এবারের তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির ফল প্রকাশিত হয়। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই চূড়ান্ত সুপারিশপত্র প্রদানের আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের শর্ত আরোপ যোগদানে ইচ্ছুক নিবন্ধিত শিক্ষকদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে তোলে।

বেসরকারি শিক্ষকদের পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রাথমিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ইতিবাচক একটা দোলা দিয়েছিল। এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন-ভাতা সরকার বহন করলেও বলা হয়, 'বেসরকারি শিক্ষক'। এই অবস্থায় অন্যান্য চাকরির মতো এ ক্ষেত্রেও পুলিশ ভেরিফিকেশন শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক নিঃসন্দেহে। কিন্তু পুরো ব্যবস্থা এতটা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিলতায় ভরা তা সুপারিশপ্রত্যাশীদের কাছে এখন এটা আপদে রূপ নিয়েছে। বিব্রতকর অবস্থায় আছে নিয়োগদানে আগ্রহী অপেক্ষমাণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। পুলিশ ভেরিফিকেশনের পক্ষে বলতে গিয়ে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, 'এনটিআরসি নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশন এখন খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়। এখন জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসসহ নানা রকমের সমস্যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে জাল বিস্তার করছে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সজাগ ও সতর্ক থাকা উচিত।' (সমকাল অনলাইন, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১)। শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে সাধুবাদ ও সমর্থন জানাই। মনেপ্রাণে চাই জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদে যুক্ত বা উগ্রবাদিতা পোষণ করেন এমন কেউ যেন কোনো অবস্থাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে না পড়েন। কিন্তু বাস্তবতা বিচার করলে, কয় জনকে পাওয়া যাবে, যারা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদে জড়িত? কিংবা ফৌজদারি মামলা রয়েছে- এমন প্রার্থীর সংখ্যাইবা কত? ৩৮ হাজার শিক্ষকের পুলিশ ভেরিফিকেশনের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় বাকি ৯৮ শতাংশ সুপারিশপ্রত্যাশীরা অপেক্ষায় থাকবেন কেন?

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে চাওয়া নিবন্ধিত শিক্ষকদের বড় একটা অংশ প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে আসা। তাদের বেশিরভাগই প্রাইভেট-টিউশনিতে যুক্ত। কারোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে এদের বেশিরভাগই বেকার অবস্থায় দিনানিপাত করে আসছিলেন। করোনায় সবকিছু বন্ধ থাকলেও প্রাত্যহিক জীবন-অনুষঙ্গের চাহিদা থেমে থাকেনি। ফলে তাদের ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে এবার আশার কথা হচ্ছে, নিয়োগলাভের তারিখ থেকেই এমপিওভুক্তির তারিখ নির্ধারিত হবে। সেই আশায় অনেক শিক্ষকই আশান্বিত ছিলেন এই ভেবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরপরই যোগদান করে করোনার অভিঘাত কাটানো সম্ভব হবে। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই? করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সংক্রমণের হারও ৫ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। দাখিলসহ মাধ্যমিক পরীক্ষার রুটিনও প্রকাশিত হয়েছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পুরোদমে শিক্ষাদান কর্মসূচি শুরু করা যাবে। এই অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-সংকটের বিষয়টি আবারও নতুনভাবে প্রকট হয়ে দেখা দেবে। এক-দেড় বছরে অনেক শিক্ষক অবসরে গেছেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কিংবা নন-এমপিওভুক্ত বা যাদের অনেক সময় অস্থায়ী ভিত্তিতে 'প্রপি টিচার' হিসেবে রাখা হয়েছিল, তারা বেতন-ভাতা না পেয়ে পেশা বদলেছেন। তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির ফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একেক প্রতিষ্ঠানে দুই বা ততোধিক শিক্ষক প্রাথমিকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই বা ততোধিক শিক্ষকের চাহিদা বা শূন্যপদ রয়েছে, সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও বেশি ভোগান্তি পোহাবে।

ভেরিফিকেশনে অযোগ্য প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুত করা হবে- এমন শর্তে যদি ভেরিফিকেশনের আগেই চূড়ান্ত সুপারিশ করে নিয়োগদান করা হয়, তবে অনেক শিক্ষক-পরিবার বেঁচে যাবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় ভেরিফিকেশন-শর্তে সামান্য শিথিলতা প্রদর্শন করলে খুব একটা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ব্যাপারটা এমন নয় যে, ইতোপূর্বে পুলিশ ভেরিফিকেশনের আগে সরকারি কোনো চাকরির নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়নি। প্রায় প্রতিটি সরকারি চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রবেশন পিরিয়ডে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়ে থাকে। তাই বাস্তবতা আমলে নিয়ে যোগদানের ব্যাপারে নিয়োগ-পূর্ব পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা জরুরি।