আমাদের মনে আছে, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের হুন্ডি কাজল মানুষের মুখে মুখে এজেন্টের হাতবদলের মাধ্যমে এক লাখ টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ জেলার প্রায় ২৫ লাখ পরিবারের কাছ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। 

২০০০ সালে প্রতারণার বিষয়টি সামনে এলে সটকে পড়েন কাজল। দীর্ঘ দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আজও বিনিয়োগকারীরা সেই অর্থ ফেরত পাননি। ডেসটিনি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসার মাধ্যমে ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। ২০১২ সালে ধরা পড়ার পর কেটে গেল ৯ বছর। অথচ এত বছরেও গ্রাহকদের কেউ কোনো টাকা ফেরত পাননি। যুবক, ইউনিপে ইত্যাদি এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলেও একটি ঘটনারও আজ পর্যন্ত সুরাহা হয়নি।

হালের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, আলেশা মার্টসহ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বেছে নিয়েছে প্রতারণার এক নতুন ফাঁদ হিসেবে। অর্থের পরিবর্তে অস্বাভাবিক ডিসকাউন্টে পণ্য সরবরাহের প্রলোভন দেখিয়ে সাজানো হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের স্কিম। তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়েছে লোভনীয় চোখ ধাঁধানো চটকদার বিজ্ঞাপন ও করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে। ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেলিব্রেটি কাউকে কাউকে। শত শত কোটি টাকার প্রতারণার পর এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। অভিজ্ঞতা বলে, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরাও টাকা ফেরত পাবেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান দেশে ব্যবসার নামে প্রতারণা করে যাচ্ছে। গতিবিধি দেখে আগে থেকে কি কিছুই বোঝা যায় না? মানুষের অসচেতনতা ও অজ্ঞতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে। জনগণের সুরক্ষা দেওয়া যাদের দায়িত্ব তাদের দায়িত্বহীনতার সুযোগ নিয়েও প্রতারকরা ফুলে-ফেঁপে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। বিপুল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। কখনও কখনও এই প্রতারণায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যও যুক্ত। ই-অরেঞ্জের ক্ষেত্রে দেখা গেল বনানী থানার এক পুলিশ পরিদর্শক সরাসরি এ ক্ষেত্রে যুক্ত।

এমন প্রতারণা থেকে বাঁচাতে প্রথমত রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগণকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কারণ একমাত্র জনসচেতনতাই পারে নাগরিকদর সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতে। আমাদের কোনো কোনো সেলিব্রেটিও অর্থের বিনিময়ে বাছবিচার ছাড়াই যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে যান। ভুয়া প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে তারা নিজেদের মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ করছেন এবং সেই সঙ্গে জনসাধারণের সর্বনাশ করছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের সংযমী হওয়া উচিত। তাদের অন্তর্ভুক্তির কারণে সাধারণ জনগণ আস্থা পেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানে। কোথাও তাদের যুক্ততার কারণে জনগণ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তারা কোনোভাবেই সেই দায় এড়াতে পারেন না। এ ছাড়া এসব স্কিমে যুক্ত হওয়া মানুষের আশপাশেও অনেক মানুষ থাকে, যারা বুঝতে পারে বিষয়টি প্রতারণামূলক। তারা অন্তত তাদের পাশের মানুষটিকে বুঝিয়ে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে অভিযোগ দিতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকেই জেনে-বুঝেও পাশের বিপদে পড়তে যাওয়া মানুষটিকে বোঝান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও অভিযোগ দেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেকে এ ধরনের ঘটনা দেখে এড়িয়ে যান পরবর্তীতে ঝামেলার কথা ভেবে। আবার বিচ্ছিন্নভাবে অভিযোগ দিলে হিতে বিপরীত ঘটনাও ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর অসাধুদের এর মাধ্যমে অবৈধ আয়ের পথ খুলে যায়। এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি জরুরি।

পুলিশ সদর দপ্তর কর্তৃক পরিচালিত আমাদের সামনে একটি অনন্য উদহারণ আছে ৯৯৯ সেবার। দ্রুতগতিতে পুলিশের সাহায্যের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্সসহ অনেক সেবাই মেলে এখান থেকে। সরাসরি সদর দপ্তর সম্পৃক্ত থাকায় অতি দ্রুত সেবা দিয়ে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের নাগরিকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে এই সেবা মাধ্যম। ৯৯৯-এর মাধ্যমে কোনো থানার সেবা পাওয়া আর ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে সেবা পাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। অভিযোগগুলোর প্রতিটি পদক্ষেপে সদর দপ্তর থেকে মনিটর করা হয়। এ কারণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এ সেবা। কাজেই অনলাইন-অফলাইনে অপরাধের অভিযোগও ৯৯৯-এর আওতায় আনা বা এমন অনুকরণীয় আলাদা কোনো সেবার মাধ্যমে গ্রহণ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে মানুষ অভিযোগ প্রদান করতে আগ্রহী হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা ফুলে-ফেঁপে ওঠার আগেই এমন অপরাধ বন্ধ করা সহজ হবে। আমাদের সর্বোচ্চ আদালত কখনও কখনও স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে জনস্বার্থে রায় দেন। পুলিশ সর্বোচ্চ আদালতের এমন পদক্ষেপ দেখে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে জনস্বার্থে অপরাধের উৎস সন্ধান করতে পারে। পুলিশেরও লোকবলসহ নানা সীমাবদ্ধতা আছে। তার পরও প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশ বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে আসবেন এটি প্রত্যাশা।