বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশ একটা সংকটের মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দেশ আবারও নির্বাচনকালীন সংকটের দ্বারপ্রান্তে। আগামী নির্বাচন বিষয়ে উদ্ভূত এ সংকট নিরসনের উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে।

সমকালকে দেওয়া ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জাসদের এ নেতা জোটের নিষ্ফ্ক্রিয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, ১৪ দল আমাদের কাছে এখন গৌরবময় অতীত। বর্তমানে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে; যে কাজটা আওয়ামী লীগ আমাদের সবার জন্যই কঠিন করে ফেলেছে।

সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শরীফ নুরুল আম্বিয়া চলমান রাজনীতির নানা বিষয় ছাড়াও বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতি, এ সংকট নিরসনে করণীয় এবং জাসদের বিভক্তি নিয়েও কথা বলেছেন।

প্রশ্ন: করোনাভাইরাস-জনিত বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো সংকট দেখছেন কি?

উত্তর: করোনা মহামারির ফলে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি উন্মুক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্তিমিত হয়ে আছে। এর মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন বিষয়ে বিবৃতি ও অনলাইনে সভা-সেমিনারের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও করোনার প্রভাব থেকে যাবে। আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে, করোনা কিন্তু এখনও চলে যায়নি। করোনার চতুর্থ ঢেউও নাকচ করা উচিত নয়। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রশ্ন: করোনাকালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে কি?

উত্তর: করোনাকালে দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি ও সামাজিক সংগঠন সক্রিয়ভাবে নিজস্ব সামর্থ্যমতো মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দল বাংলাদেশ জাসদও সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় দুস্থদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা সামগ্রী প্রদান, মাস্ক বিতরণসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে চলেছে।

প্রশ্ন: করোনার শুরু থেকেই সংকট মোকাবিলায় সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এসব পদক্ষেপ কি যথেষ্ট?

উত্তর: সরকারের পদক্ষেপগুলো মোটামুটি ঠিকই আছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি জাতীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত কর্মকৌশল নিলে ভালো হতো। এতে সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খলা কমানো যেত। কিন্তু সরকারের অনিচ্ছায় সেটা সম্ভব হয়নি। এই মুহূর্তে করোনার সংক্রমণ কম থাকায় দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে খোলা হয়েছে, সেটাও ঠিক আছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে কোনো রকম শিথিলতাকে যেন প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। সামাজিক অনুষ্ঠান, পর্যটন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমাবেশ সংকুচিত রাখা উচিত। আর করোনা মোকাবিলায় টিকার বিকল্প নেই। সম্ভাব্য সব ক্ষেত্র থেকে প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ এবং দেশেই টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়ে করোনার সম্ভাব্য চতুর্থ ঢেউ এড়াতে হবে।

প্রশ্ন: এই সংকটকালে স্বাস্থ্য খাতে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে।

উত্তর: আসলে সরকার শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, সব খাতেই দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের জন্য দুয়ার খোলা রেখেছে। তবে এক স্বাস্থ্য খাতে যে লজ্জাজনক দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, সে জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করলে ভালো দৃষ্টান্ত হতো।

প্রশ্ন: গত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলের নানা অভিযোগ ছিল। আগামী নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে মনে করছেন?

উত্তর: ২০১৮ সালের তথাকথিত জাতীয় নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। এ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের হেয় করা হয়েছে; জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে, যা শাসনব্যবস্থায় দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশ একটা সংকটের মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। দেশ আবারও নির্বাচনকালীন সংকটের দ্বারপ্রান্তে। আগামী নির্বাচন বিষয়ে উদ্ভূত এ সংকট নিরসনের উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়াই সংকট? পরবর্তী নির্বাচনের জন্য কী করণীয়?

উত্তর: বিগত জাতীয় নির্বাচনসহ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো যেভাবে হয়েছে, তাতে মানুষ নির্বাচন নিয়েই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নির্বাচন এখন প্রশাসন, ক্ষমতাসীন দল ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে জনগণের ইচ্ছা ও সচেতনতার পাশাপাশি 'নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার' গঠন এবং নির্বাচন কমিশনকে তাদের দায়িত্বের প্রতি সৎ ও বলিষ্ঠ হওয়ার বিকল্প নেই। অনেক আশা নিয়ে জনগণ বিগত নির্বাচনে বিদ্যমান সরকারকেই 'নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার' হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এ সরকার জনগণকে হতাশ করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় থেকে তারা মুক্ত হতে পারে না।

প্রশ্ন: বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা যেতে পারে?

উত্তর: নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন করে নেওয়া ভালো। তবে সেটাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গ্যারান্টি নয়।

প্রশ্ন: আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে আপনাদের দলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে?

উত্তর: নির্বাচন নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনও আসেনি। কোন কৌশলে আমরা নির্বাচন করব, সেটা সময়ই বলে দেবে।

প্রশ্ন: গত নির্বাচনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু বলেছিলেন, ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের এখন থেকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

উত্তর: আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো দলই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল করে না। পরিবেশ-পরিস্থিতি ও নিজস্ব দলীয় রাজনীতির আলোকেই সব দল নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিয়েই চলে।

প্রশ্ন: ১৪ দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কী বলবেন?

উত্তর: প্রথমত, আওয়ামী লীগ ১৪ দলকে একটি আদর্শিক জোট হিসেবে কখনও পরিচালিত করেনি। জোটকে নিম্ন পর্যায়ে কখনও বিস্তৃতও করেনি। এ জোটের শরিক দলগুলো বরং জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে আরও দুর্বল হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৪ দল গড়ে উঠেছিল। এ ষড়যন্ত্র নির্মূল করতে ১৪ দল অনেকটাই অবদান রেখেছে- এটাও ঠিক। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এ জোটের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সে প্রতিশ্রুতি থেকে বর্তমান সরকার সরে গেছে। আসলে ১৪ দল আমাদের কাছে এখন গৌরবময় অতীত। বর্তমানে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যে কাজটা আওয়ামী লীগ আমাদের সবার জন্যই কঠিন করে ফেলেছে।

প্রশ্ন: জাসদ এখন সব মিলিয়ে তিন অংশে বিভক্ত। আপনাদের অংশের নিবন্ধন, দলীয় কার্যালয় ও প্রতীক নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে। এসব আগামী নির্বাচনে আপনাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না?

উত্তর: আমাদের দল বাংলাদেশ জাসদ নিজস্ব মার্কা নিয়েই আগামী নির্বাচন করার আশা করে। দলীয় মার্কা ও নিবন্ধনের বিষয়টি উচ্চ আদালতে দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে বলে আশা রাখি। আর ঢাকার ৩৫/৩৬, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর জাসদ অফিসে সব অংশের নৈতিক অধিকার রয়েছে, যদিও সেটা একটি পক্ষের দখলে চলে গেছে। সেটা নিয়ে এখানে বেশি কিছু বলব না। তবে ঢাকার ২২/১, তোপখানা রোডে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে সাংগঠনিক সব কাজ করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ জাসদ জনগণের শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনার ওপরেই বেশি আস্থাশীল। কোনো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ জাসদকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।