যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রথমবারের মতো কোয়াড শীর্ষ নেতাদের মুখোমুখি বৈঠকের আয়োজন করে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছেন চীনকে। বেইজিংয়ের অখুশি হওয়ার বড় কারণ প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়াও এই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা। চার বিশ্বনেতার মুখোমুখি বৈঠক চীনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

মার্চে ভার্চুয়াল বৈঠকেই কোয়াড নেতারা ঠিক করেন সেপ্টেম্বরে মুখোমুখি বসে তারা ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে মুক্ত ও অবারিত করার বিষয়ে আলোচনা করবেন। তখনই ঠিক হয়, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আবদ্ধ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। চীনের 'দাদাগিরি' মানসকিতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলাই ছিল কোয়াড ভার্চুয়াল বৈঠকের মূল সুর।

কোয়াড বা চতুর্ভুজীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০০৭ সালে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত ফের অনুভব করে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমুদ্র পথকে সবধরনের বাধামুক্ত করার প্রয়োজনীয় কৌশল রচনা জরুরি। এই অঞ্চলে চীনের সাম্প্রতিক আধিপত্য ও চোখরাঙানি বিশ্বনেতাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রে চীন আঞ্চলিক বিবাদকে উৎসাহিত করে। বাড়তে থাকে চীনের সেনা আধিপত্য। নিজেদের তৈরি করা দ্বীপভূমিতে তারা সেনা ঘাঁটি গড়ে তুলে এখন দক্ষিণ চীন সমুদ্রে নিজের সার্বভৌমত্বও দাবি করছে। কিন্তু মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই ও তাইওয়ান পাল্টা দাবি করছে, সেখানে তাদেরও অধিকার রয়েছে। পূর্ব চীন সমুদ্র নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিবাদ রয়েছে চীনের। 

কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের আগে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র (অকুশ) ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে একটি ত্রিপাক্ষিক ঘোষণাপত্র জারি করে। নতুন এই জোট ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিরতার স্বার্থে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা হ্রাসে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু শক্তিধর ডুবো জাহাজ মোতায়নে সহায়তা করতে রাজি হয়েছে অকুশ।

দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সমুদ্রে রয়েছে প্রচুর খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ও অন্যান্য মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। দক্ষিণ চীন সমুদ্র হচ্ছে দুনিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। অর্থনৈতিক দিক থেকে তাই খুবই লোভনীয় এই দুই সমুদ্র। কিন্তু চীন দুই সমুদ্রেই শুধুমাত্র নিজেদের দখলদারিতে বিশ্বাসী।

কিন্তু তাদের এই বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে বাড়ছে বিশ্ব জনমত। তাই কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে উদ্বিগ্ন চীন। তারা মনে করে, এই এলাকায় তাদেরই একমাত্র আধিপত্য থাকবে। প্রতিহিংসা থেকে অস্ট্রেলিয়ার গরুর মাংস, মদ, বার্লি এবং কয়লা রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটায় চীন। তবে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনাইটেড স্টেটস স্টাডি সেন্টার অস্ট্রেলিয়ার ওপর বাণিজ্যিক হামলার নিন্দা করেছে। তাদের মতে, চীন একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

চীন এখন কোয়াডের বাকি সদস্যদেরও হুমকি দিচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বর পূর্ব চীন সমুদ্রে  ডুবো জাহাজের হদিশ মিলেছে। জাপান নিশ্চিত- চীনই পাঠিয়েছে ডুবোজাহাজটি। কারণ পূর্ব চীন সমুদ্র জাপানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চীন দাবি করছে তাদের অধিকার। এই নিয়ে জাপানের সঙ্গে বিরোধ বাধাতে চাইছে চীন।

ভারত মহাসাগরে চীনের 'দাদাগিরি' নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত তরঞ্জিত সিং সাঁধুর মতে, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর সকলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য মুক্ত রাখাটা জরুরি। পরস্পর নির্ভরতা মোটেই দুর্বলতা নয়- একথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জোটবদ্ধতাকে শক্তি হিসেবেই উল্লেখ করেন। সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ভারতের দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন সম্প্রতি ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির বৈঠকে জানান, ভারতের সঙ্গে 'ওভার দ্য হরিজন' যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন পথ নিয়েও চর্চা চলছে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ব্লিংকেনের এই মন্তব্য যথেষ্ট চিন্তায় রেখেছে চীনকে। গত বছর থেকে চীন ভারতীয় সীমান্তের ওপারে বিশাল সেনা পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে। লাদাখে ভারতীয় ভূখণ্ড দখলেরও অভিযোগ রয়েছে লাল ফৌজের বিরুদ্ধে।

যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে সড়ক ও বিদ্যুত সরবরাহ পরিকাঠামোর উন্নয়নে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে। ২০১৭ সালে এই ঘোষণা হলেও নেপাল সংসদে এখনও অনুমোদন মেলেনি উন্নয়নের স্বার্থে মার্কিন অনুমোদন গ্রহণের। চীনের মদদপুষ্ট নেতারাই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় সেখানে। কিন্তু নেপাল কংগ্রেস ক্ষমতায় ফেরায় নেপালও মার্কিন সহায়তায় ফের নিজেদের পরিকাঠামো উন্নয়নে মন দিতে পারবে বলে মনে করছেন অনেকে। চীনের কাছে এটাও বড় ধাক্কা।

যুক্তরাজ্য কোয়াডের সদস্য না হলেও চীনকে কড়া বার্তা দিতে ভুল করেনি। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝেং জেগুয়াংকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ঢুকতে নিষেধ করে সাত ব্রিটিশ সংসদ সদস্যের ওপর বেইজিংয়ের নিষেধাজ্ঞার বদলা নিল যুক্তরাজ্য। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সরব হয়েছিলেন এই সাত পার্লামেন্ট্রিয়ান। উইঘুর গণহত্যার প্রতিবাদে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা অফিসারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এক সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংয়ে দমনপীড়ন চালাচ্ছে চীন। স্বাধীনতা হরণ করে সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের নামে সমস্ত মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কোনো মৌলিক স্বাধীনতা সেই সেখানকার মানুষদের। শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও কোনো স্বাধীনতা নেই হংকংয়ের মানুষের। শুধু তাই নয়, তিয়েনমান স্কোয়ারের গণহত্যার প্রতিবাদে সম্প্রতি মোমবাতি মিছিল করায় ৯ জনকে জেলে ভরা হয়েছে। 

এসব কারণেই চীনের দমন নীতি ও দখলদারি মানসিকতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক দুনিয়া একজোট হচ্ছে। আর চীনের সামনে গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নেই তেমন একটা বিকল্প। তারা একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী, সামরিক প্রশাসক বা জঙ্গিবাদীদের দ্বারা গঠিত সরকারের সঙ্গে হাত মেলাতে বাধ্য হচ্ছে। পাকিস্তানের মতো দেশ, যেখানে সেনারাই কার্যত সরকার চালায়, চীনের পছন্দের বন্ধু। মিয়ানমারের জান্তা সরকারও বেইজিংয়ের পছন্দ। তাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অত্যাচারের মাত্রা বাড়ালেও চীন সেখানে তাদের কোনো প্রকল্পই বন্ধ করেনি। বরং বন্ধুত্ব অটুট রেখেছে। কাবুলে নিষিদ্ধ জঙ্গিদের নিয়ে তালেবান সরকার গঠনের পর চীন তাদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে, যদিও তালেবানকে ক্ষমতায় আনার জন্য চীনের মদদের কথাও সবার জানা। তালেবান সরকার গঠনের পর ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য ঘোষণা করেছে বেইজিং। বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিশুলো এসব ঘটনায় বিস্মিত।  

কোয়াডের মুখোমুখি সংলাপকে তাই ভয় পাচ্ছে চীন। কোয়াড এবং অকুশ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মরিয়া- এটাই ভাবাচ্ছে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে। আর এ কারণে কোয়া়ডবিরোধী চীন।