স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বহুমাত্রিক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং একটি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো এখনও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির নির্মম শিকার হয়েছেন অনেক শিক্ষক। শিক্ষকতার কাজ ছেড়ে বাদাম বিক্রি করতে রাস্তায় নামতে হয়েছে এমন খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও অনেক শিক্ষক করোনাকালীন মানবেতর জীবন-যাপন করেছেন। ৫ অক্টোবর প্রতি বছর শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষকেরা শুধু আশায় বুক বেঁধে থাকেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর চলে গেলেও তাদের ভাগ্যের উন্নয়নে তেমন কোনো কর্মযোগ চোখে পড়ে না। বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা যে আসতে চান না এটা দিবালোকের মতো সত্য। কিন্তু কেন? সার্কভুক্ত অন্য রাষ্ট্রগুলোতে এমন অবস্থা পরিলক্ষিত হয় না। তবে আমরা কেন পিছিয়ে থাকছি? এখানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সদিচ্ছার। এই সদিচ্ছাতেই রয়ে গেছে বড় রকমের ঘাটতি।

২০১৫ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল, শিক্ষকদের জন্য বিনিয়োগ, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। সেই প্রতিপাদ্য যেন কাগজেই বন্দি থেকে গেছে, আলোর মুখ দেখতে পারেনি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় বর্তমান সরকার ব্যক্ত করেছে সেটার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে শিক্ষকদের সহযোগিতা। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরাই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষকদের বারবার আশার কথা শোনানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই শিক্ষকেরা আশাহত হয়েছেন। ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল। স্থায়ী পে-কমিশন এবং শিক্ষকদের সম্মানজনক সম্মানীর কথা বলা হয়েছিল। শিক্ষকদের সেই প্রাপ্তি অধরাই থেকে গেলো। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতেও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। কোথায় যে এটি আটকা পড়ে থাকে শিক্ষকদের কাছে সেটাই বড় রহস্য। বিশ্বের উন্নত দেশের শিক্ষকেরা কেমন বেতন পান, কেমন মর্যাদা পান তা সহজেই অনুমেয়। তাদের বিষয়ে লিখে কলেবর বাড়াতে চাই না। তবে সার্কভুক্ত কয়েকটি দেশের শিক্ষকদের অবস্থা না উল্লেখ করে পারছি না। বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও নিচে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে একজন সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল ৫৫ হাজার টাকা, সহযোগী অধ্যাপকের ৯০ হাজার এবং অধ্যাপকের ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। পাকিস্তানে একজন সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল ১ লাখ ৪ হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের ১ লাখ ৫৬ হাজার এবং অধ্যাপকের ২ লাখ ৩৪ হাজার। শ্রীলঙ্কায় একজন সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল ১ লাখ ৫ হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের ১ লাখ ৪০ হাজার এবং অধ্যাপকের ১ লাখ ৮৬ হাজার। নেপালে একজন প্রভাষকের বেতন স্কেল ২৮ হাজার। এছাড়াও আবাসন, গাড়ি, নিরাপত্তাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এশিয়া মহাদেশে চীন ও জাপানে শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা সবার ওপরে। চীনে শিক্ষকদের এক অন্যরকম মর্যাদা দেওয়া হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কমানো হচ্ছে পরীক্ষার অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ। এছাড়ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের কথা বলা হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই আমাদের জন্য ভালো খবর। কিন্তু যাদের দ্বারা এই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে তাদের উন্নয়নের কোনো খবর নেই কেন? শিক্ষকদের জীবনমানে পরিবর্তন না এনে শুধু পাঠ্যবই বদলালেই কি শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হয়ে যাবে? মোটেও না। একটি ঘর যে খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে সেই খুঁটিকে আগে মজবুত করতে হবে। শিক্ষকদের অবহেলার জালে আটকে রেখে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার জিকির তোলা বক্রাঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের বেসরকারি শিক্ষকদের অবস্থা কী তা সকলেই জানে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা কিছু ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। অবসর-পরবর্তী সুবিধাগুলো পেতে তাদের ঘাম ঝরে যায়। পদে পদে হতে হয় নাজেহাল। তাদের যে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় তা রীতিমতো হাস্যকর। এছাড়াও তাদের প্রমোশন পলিসি অদ্ভুত ধরনের। ৩০ বছর চাকরি করেও একটি প্রমোশনের সুযোগ তারা পান না। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতার কোনো শেষ নেই। এনটিআরসির নিবন্ধন সত্ত্বেও কতজন কত হয়রানির শিকার হয়েছেন সেটির ইয়ত্তা নেই। এনটিআরসি'র প্রতি শিক্ষকদের এক সময় আস্থা থাকলেও সেটাতে ফাটল ধরেছে। এখন একটি পাকাপোক্ত শিক্ষা কমিশন পিএসসির আদলে করার পরিকল্পনা আছে। কাজও চলছে। তবে যত কিছুই করা হোক না কেন শিক্ষা খাতে যে বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে সেটা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে শিক্ষক দিবস পালন করে কোনো লাভ হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হলে শিক্ষকদের উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে।

আমি নিজেও একজন শিক্ষক। আমার বাবাও শিক্ষক ছিলেন। একজন শিক্ষকের সামাজিক এবং আর্থিক অবস্থান কেমন থাকে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ হয়েছে। শিক্ষকদের অবস্থা দেখে মনে হয় এ যেন কৃমি কীটে খাওয়া এক দগ্ধ লাশের চেহারা। মহান পেশার মানুষগুলোকে রাষ্ট্র কেন মহান রাখতে পারে না। সকল চাকরিজীবীর জীবনমানের উন্নয়ন হলেও শিক্ষকদেরটা কেন বারবার হোঁচট খায়? আমাদের দেশে চিকিৎসা, প্রকৌশল আর প্রশাসনে সবার নজর। তাহলে মহান পেশাটি কি শুধু মেধাহীনদের জন্য বরাদ্দ করা থাকবে! এ দেশের মেধাবী যুবকেরা অন্য চাকরি জোগাড় করতে ব্যর্থ হলে তখন বাধ্য হয়ে শিক্ষকতায় আসে। অনীহা নিয়ে আসে বলে এ খাতে সে ভালো কিছু দিতে পারে না।

সবশেষে এটুকু বলতে চাই, শিক্ষকতা পেশাকে আর কথার জালে বন্দি না রেখে এর রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করুন। শিক্ষকদের ভালো বেতন দিন। ভালো বেতন পেলে শিক্ষকেরা দরদ দিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবেন। শিক্ষা গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ান। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। সান্ধ্যকালীন শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষা খাতে যে অপরাজনীতি চলছে সেটি থেকে শিক্ষা খাতকে মুক্ত করতে হবে। একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা জাতি আশা করে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বেকার তৈরি করবে না, উদ্যোক্তা তৈরি করবে।