বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেছেন, অতীতের মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনেও জনমতের প্রতিফলনের বদলে নানা 'কারিকুরির হিসাব-নিকাশ' সম্পন্ন করার আয়োজন চলছে। কারসাজি রুখে দিয়ে নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে বড় ধরনের সংস্কার ও প্রচণ্ড জনমতের চাপ লাগবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বাম গণতান্ত্রিক জোটের এই শীর্ষ নেতা নির্বাচন ব্যবস্থার বদল করে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন ও দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন বাঞ্ছনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
খালেকুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস বামপন্থিদের অগ্রগামী ভূমিকা ও অবদান ছাড়া রচিত হতে পারে না। এখনও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বামপন্থিরাই ধারণ করেন। বুর্জোয়া শক্তিগুলো কেবল চেতনার বাণিজ্য ও মুনাফা লাভ করে।
সাক্ষাৎকারে খালেকুজ্জামান চলমান রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতি এবং এই সংকট নিরসনে করণীয় বিষয়েও তার পরামর্শ তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে দেশের বাম রাজনীতিতে বিরাজমান সংকট ও বিভেদ এবং এ থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ বিষয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন বর্ষীয়ান এই বামপন্থি রাজনীতিক।
প্রশ্ন :করোনাকালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো সংকট দেখছেন?
উত্তর :এ মহামারি গোটা বিশ্বকে ঝাঁকি দিয়ে গেছে, যার অভিঘাত বহুমুখী ক্ষেত্রে প্রসারিত হবে। আর্থিক বৈষম্য, সামাজিকভাবে সাম্যহীনতাজনিত অপরাধ ও অরাজকতার বিস্তার, যুদ্ধ ও যুদ্ধোন্মাদনার প্রসার, রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রকোপ ইত্যাদি বাড়াবে। বাংলাদেশে ভিন্নমাত্রায় হলেও তা ব্যতিক্রম নয়। দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের হাহাকার নতুন-পুরোনো বিত্তবান গোষ্ঠীর উল্লাস আর কোলাহলে চাপা পড়ে আছে। আত্মতুষ্টির আড়ালে চলমান সংকটের বোঝার ভার বহন করা শাসকদের ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
প্রশ্ন :করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার গৃহীত পদক্ষেপগুলো কী যথেষ্ট?
উত্তর :সরকার নানা সময় নানা পদক্ষেপ নিলেও সব সময়োপযোগী ও কার্যকর হয়নি। পদক্ষেপগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা যায়নি, সমন্বয়সাধন করে চলাও সম্ভব হয়নি। একেক সময় একেক সিদ্ধান্ত নেওয়া, তাৎক্ষণিকতার দ্বারা পরিচালিত হয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টানো, তথ্যবিভ্রাটে ভোগা ইত্যাদি মিলে প্রয়োজনের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি।
প্রশ্ন :এই সংকটকালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে কি? এক্ষেত্রে আপনাদের দলের ভূমিকা কী?
উত্তর :শ্রেণিতে ভাগ করা সমাজে শোষক-লুটেরা শ্রেণির পক্ষের রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের আর শোষিত শ্রমজীবী মানুষের পক্ষের রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও কর্তব্য এক সমীকরণে মেলানো যাবে না। ক্ষমতাসীন শাসক বুর্জোয়া দলের দায়-দায়িত্ব প্রধান হলেও কর্তব্য করণীয় ক্ষেত্রে 'তেলা মাথায় তেল ঢালা' নীতির কারণে জনস্বার্থ বিবেচনায় সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ফলে করোনাকালে নতুন করে যখন আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে, তখন এগারো হাজার নতুন কোটিপতি জন্ম নিয়েছে।
করোনাকালে আমাদের দল বাসদ ঢাকাসহ সারাদেশে গণসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি জনগণের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে রোগাক্রান্ত, দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছাবার চেষ্টা করেছে। দলের পক্ষ থেকে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিয়ে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানো, অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করা, কমিউনিটি কিচেন খুলে হতদরিদ্র ভাসমান মানুষদের খাবার দেওয়া, অদম্য পাঠশালা করে দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালানো, মানবতার বাজার থেকে বিনামূল্যে পণ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং গণদাবিতে সোচ্চার থাকা ইত্যাদি কার্যক্রম যথাসাধ্য চেষ্টাও করা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় তা সামান্য হলেও উদ্যোগটি ছিল অসামান্য।
প্রশ্ন :করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে...
উত্তর :এগুলোর সবই সত্য। স্বাস্থ্য খাতকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করার ধারা অব্যাহত রাখলে সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। যদিও রাজনৈতিক জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সুশাসনের প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। সর্বজনের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রশ্ন :আগামী জাতীয় নির্বাচনের আড়াই বছরের মতো সময় বাকি রয়েছে। গত নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলের নানা অভিযোগ ছিল। এবারের নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে মনে করছেন?
উত্তর :ভূমিকম্পে দালান ধসে গেলে সিঁড়ির কার্যকারিতা থাকে না। তেমনি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, রীতিনীতি, আইনকানুন, নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থাসহ সকল প্রথা ও প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে দিয়ে শুধু নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিস্কলুষ রাখা যায় না। আগামী নির্বাচনেও জনমতের প্রতিফলনের বদলে নানা কারিকুরির হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করার আয়োজন চলছে।
প্রশ্ন :সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি সংসদের উপনির্বাচনগুলোতেও ভোটার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো নয় কেন?
উত্তর :মানুষ খোলা চোখে দেখছে ভোটের নামে তামাশা হয়। তাই তাদের উপস্থিতি ভোটকেন্দ্রে চোখে পড়ার মতো হয় না।
প্রশ্ন :নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কোনো পরামর্শ?
উত্তর :বড় ধরনের সংস্কার ও প্রচণ্ড জনমতের চাপ লাগবে। নির্বাচন ব্যবস্থার বদল দরকার। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন ও দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজনও বাঞ্ছনীয়। দলমত নির্বিশেষে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন গঠন ও পরিচালনার আইন করা দরকার। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ; আমলাতন্ত্র, পুলিশ প্রশাসনসহ সকল সাংবিধানিক, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারমুক্ত স্বাধীন দেশের উপযোগী গণতান্ত্রিক সংস্কার দরকার। এই সংস্কার শাসক শ্রেণির ইচ্ছামুক্তভাবে সর্বমহলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হবে।
প্রশ্ন :বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা যেতে পারে?
উত্তর :সাংবিধানিক অঙ্গীকার অনুসারে আইন প্রণয়ন এবং নির্বাচন কমিশনকে সর্বস্তরে স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঠামোগত সামর্থ্যে দাঁড় করাতে হবে, যাতে প্রশাসনিক নির্ভরতা হ্রাস পায়।
প্রশ্ন :নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কারে আপনারা বেশ আগে থেকেই আন্দোলন করে আসছিলেন। কতটুকু এগোলো?
উত্তর :এ ব্যাপারে জনমত সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। যে কারণে সরকারি মহল থেকেও এখন আলোচনা শোনা যাচ্ছে। যদিও তাদের উদ্দেশ্য নির্মোহ নয়।
প্রশ্ন :আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছেন? জোটগতভাবে নাকি আলাদাভাবে অংশ নিচ্ছেন?
উত্তর :সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ রচনার আন্দোলন ও সফলতার মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আগামী নির্বাচনে আমরা কীভাবে অংশগ্রহণ করব। পরিস্থিতি অনুকূল হলে জোটগতভাবে নির্বাচনের সম্ভাবনাই বেশি।
প্রশ্ন :সাম্প্রতিক কোনো নির্বাচনেই বামপন্থিদের কোনো সফলতা নেই, কী বলবেন?
উত্তর :দূষিত আবহাওয়া ও পরিবেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা হয় না। বামপন্থিদের সাফল্যের সঙ্গে আদর্শবাদিতার সাফল্য সম্পর্কিত। যে কারণে আদর্শবর্জিত দুর্বৃত্তায়িত বুর্জোয়া রাজনীতির দাপটে বামপন্থা কোণঠাসা হয়েছে, নির্বাচনী জাল-জালিয়াতিতে টিকতে পারেনি। তবে বামপন্থিদের ওপর থেকে ব্যাপক গণপরিসরে আস্থার জমিন নষ্ট হয়নি। এটা আমরা করোনাকালে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার সময় বুঝতে পেরেছি।
প্রশ্ন :বামপন্থিরা তো রাজনীতিতে কোনো অবস্থানও গড়ে তুলতে পারছেন না?
উত্তর :বামপন্থার শক্তি যত দুর্বল হবে, জনগণের উন্নত জীবন নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন সংগ্রাম তত দুর্বল হবে, মার খাবে। বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বিস্তারকারী বুর্জোয়া রাজনীতি এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মহিমা-মাহাত্ম্য এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ কোথাও এর ব্যতিক্রম নেই, মাত্রাগত তারতম্য হয়তো আছে। আন্তর্জাতিক অভিঘাত ও বাংলাদেশের বামপন্থিদের অতীত ভুল-ভ্রান্তির খেসারত দিতে গিয়ে এদেশের বাম রাজনীতির অবস্থান পিছিয়ে পড়েছিল। তবে একথা তো সত্য, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস বামপন্থিদের অগ্রগামী ভূমিকা ও অবদান ছাড়া রচিত হতে পারে না। এখনও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বামপন্থিরাই ধারণ করে। বুর্জোয়া শক্তিগুলো চেতনার বাণিজ্য করে, মুনাফা লাভ করে।
প্রশ্ন :বলা হয়, বামপন্থিরা নানা ভাগে ও নানা মতে বিভক্ত। এক জায়গায় আসাটা কী খুবই দুরূহ?
উত্তর :ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে একই লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া দোষের নয়। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট পুঁজিবাদী বাজারের অংশীদারিত্ব অথবা আত্মমোহে পরিচালিত হলে ভিন্ন অবস্থান শুধু বিভক্তি রেখাই টানে না, উদ্দেশ্যচ্যুতিও ঘটায়। জনগণের আন্দোলনের শক্তি দুর্বল করে, শোষণমুক্তির লড়াইকে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে এখন যতটুকু বোধোদয় ঘটেছে, তাতে বামপন্থিদের দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সহসাই পরিলক্ষিত হবে বলে আশা করা যায়।