জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকদের হাতে নিহত হওয়ার বছরখানেক আগে, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় এক মহাকাব্যোপম ভাষণ দেন। বিশ্বের জাতিসমূহের এই মহাসংগঠনটি সৃষ্টির পর এই প্রথম তার মঞ্চ থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা বিশ্বপ্রতিনিধি নেতৃমণ্ডলীর সামনে উচ্চারিত হয়েছিল। সাহিত্যে বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল জয়ের পর আরও একবার বাংলা ভাষা বিশ্বের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল পাদপ্রদীপের আলোয়।  

১৯৪৮-এ বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, প্রথমে বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং তারপর ১৯৭১-এ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি মিলিটারিকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাকে একমেবাদ্বিতীয়ম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতাতেই তিনি এ ভাষাকে বিশ্ব দরবারে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেন। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহান নেতার আজীবন প্রয়াসের ফল হিসেবেই এক পর্যায়ে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো বায়ান্নর ভাষাশহিদদের আত্মদানের স্মৃতিবিজড়িত তারিখ একুশে ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং প্রতি বছর বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য বিশ্বের সব দেশ এদিনটি সসম্মানে পালন করছে, যদিও ঘাতকেরা প্রাণ কেড়ে নেয়ায় বঙ্গবন্ধু এই সুবর্ণ সময় দেখে যেতে পারেননি। 

স্বাধীন বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার পর মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেওয়া সেদিনের ভাষণের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বলেন, 'আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এজন্যে পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এ পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্যে ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।' 

চলতি ২০২১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘ ভাষণের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে মুদ্রিত, ইলেকট্রনিক, অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের জন্য একটি ই-পোস্টার বের করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্য ২০১৯ সাল থেকে দিনটিকে 'বাংলাদেশ অভিবাসিত দিবস' হিসেবে পালন করে আসছে। এর মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত বাঙালিরা অন্যান্য প্রাগ্রসর দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের কাতারভুক্ত হলো। 

মাত্র তিন বছরের শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সরাসরি বাংলাতেই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, 'আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য, জনগণের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা।' এ কথার মধ্যে দিয়ে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সত্যিকারের জননেতা, জনগণই তার সকল শক্তির উৎস এবং সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর স্বদেশ নির্মাণে তিনি জনশক্তির ওপরেই নির্ভর করেন। 

এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু-কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার মহান পিতার সাতচল্লিশ বছর আগেকার সেই ঐতিহাসিক ভাষণের উপযুক্ত ধারাবাহিকতায় একটি সমৃদ্ধ বাঙালি জাতি থেকে আরও একধাপ উত্তরণের পথে গিয়ে এক অভিন্ন মানবজাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্বের সকল দেশ ও জাতির মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এবার ১৮তম বার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে যথারীতি বাংলাতেই তিনি বলেন, 'সবধরনের মতভেদ ভুল গিয়ে আমাদের অবশ্যই অভিন্ন মানবজাতি হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে, সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য আবারও এক সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে।'

তিনি বলেন, 'আমাদের জাতির পিতা ছিলেন বহুপাক্ষিকতাবাদের একজন দৃঢ় সমর্থক।' শেখ মুজিব বৈশ্বিক বহুপাক্ষিকতার প্রধান আশ্রয়স্থল জাতিসংঘকে জনগণের 'আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্র' বলে মনে করতেন, এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমাদের জাতিসংঘ অভিযাত্রার প্রথম দিনে ১৯৭৪ সালের পঁচিশে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রদত্ত তার ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য। জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা।' এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অংশীদারিত্ব আমাদের কাজকে সহজতর করতে পারে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারে।'

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বঙ্গবন্ধু এমন একটি বিশ্ব গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অবিচার, আগ্রাসন ও পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি থাকবে না। সাতচল্লিশ বছর আগের তার সে আহ্বান আজও সমভাবে প্রযোজ্য। এজন্যে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের যেকোনো উদ্যোগে সমর্থন ও নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসের টিকার ন্যায্য হিস্যা দাবি, ফিলিস্তিনিদের প্রতি যেকোনো ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদের দৃঢ় অবস্থান, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা- এসব আমাদের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের কতিপয় উদাহরণমাত্র।... জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।' 

আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে ১৮ বার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিলেন। অথচ বঙ্গবন্ধু জীবনে একবারমাত্র এ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৭৪-এর সেপ্টেম্বরে। পরের সেপ্টেম্বর দেখার সুযোগ তিনি আর পাননি, তার আগেই স্বজাতীয় ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সেই ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আগামীর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিমালার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, যা তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। স্বজাতি বাঙালি গণমানুষের শক্তির ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে সেদিন জাতির পিতা বলেছিলেন, 'আমাদের মতো দেশসমূহ, যাদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্যে দিয়ে, এই আদর্শে বিশ্বাসই তাদের বাঁচিয়ে রাখবে। আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্বংস নাই। এই জীবনযুদ্ধের মোকাবিলায় জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই শেষ কথা। আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই যে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যায় অংশীদারিত্ব আমাদের কাজকে সহজতর করতে পারে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারে। কিন্তু আমাদের ন্যায় উদীয়মান দেশসমূহের অবশ্যই নিজেদের কার্যক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, শুধু জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হতে পারি, গড়ে তুলতে পারি উন্নততর ভবিষ্যত।' 

ভাষণের শেষ পর্যায়ে বাঙালি জাতির শক্তিমত্তার জানান দিতে গিয়ে সেই চিরপরিচিত উদার উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের মতো যেইসব দেশ দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, কেবল তাহাদেরই এই দৃঢ়তা ও মনোবল রহিয়াছে। মনে রাখিবেন সভাপতি, আমার বাঙালি জাতি চরম দুঃখ ভোগ করিতে পারে, কিন্তু মরিবে না। টিকিয়া থাকিবার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমার জনগণের দৃঢ়তাই আমাদের প্রধান শক্তি।' 

বঙ্গবন্ধুর সেই যুগান্তকারী ভাষণের পর প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে গেছে, কিন্তু আজও সে ভাষণ  প্রাসঙ্গিক, তার আবেদন এখনও অম্লান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এ ভাষণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এটাকে বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে অভিহিত করেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি বা কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণেও এ ভাষণ এক চিরায়ু দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। 

জাতিসংঘে এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সূচনা করা সেই পথ তার সুযোগ্যা কন্যা, আমাদের প্রিয় জননেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাত ধরে আরও অনেকদূর সামনে এগিয়ে গেছে। প্রতি বছরই এর কর্মতৎপরতা ও কার্যবিধির ক্রমবৃদ্ধি হয়েছে। বিভিন্ন দফায় ক্ষমতায় আসার সুবাদে সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত আঠার বার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে বক্তব্য রেখেছেন। প্রতিবারই তিনি জাতিসংঘের দায়িত্ববান সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ বঙ্গবন্ধুকে মর্যাদাপূর্ণ জুলিও কুরি পদক প্রদান করেছিল। বর্তমানে তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিপদসঙ্কুল এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বাংলাদেশি সৈনিক শাহাদতবরণ করেছেন। 

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, আর তার সুরক্ষার ও অগ্রগতির দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করছেন তার যোগ্য রক্তের উত্তরসুরী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাকে বিশ্বসভায় উপযুক্ত মর্যাদায় উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, আর বঙ্গবন্ধু তনয়া পিতৃনির্দেশিত পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশকে ক্রমশ নিয়ে চলেছের বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সারিতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতির দিকনির্দেশক বাতিঘর, আর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের সকল আশা-ভরসার প্রতীক।