ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। বাঙালির অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু এ মাছ যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নিরাপদ আমিষ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইলিশ দেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় দেশের প্রত্যেক নাগরিকের এগিয়ে আসা জরুরি। ইলিশের সহনশীল উৎপাদন বজায় রাখার লক্ষ্যে ডিমওয়ালা মা ইলিশ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা ইলিশ রক্ষা পেলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এ লক্ষ্যে ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন দেশের অভ্যন্তরীণ নদনদীর ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার জলসীমায় মা ইলিশ ধরা নিষেধ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

প্রধান প্রজনন মৌসুমে জেলে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি হারে ভিজিএফ চাল দেওয়া হচ্ছে। ২০২১ সালে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪৪টি জেলে পরিবারে ১১ হাজার ১১৮ দশমিক ৮৮ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। ইলিশ মাছ প্রজননের ক্ষেত্রে চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম উদিত চাঁদের পূর্ণিমার আগের চার দিন, পরের ১৭ দিন এবং পূর্ণিমার দিনসহ মোট ২২ দিন এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১১ দিন, ২০১৫ সালে ১৫ দিন নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়।

ইলিশ মূলত সারা বছর কমবেশি ডিম ছাড়লেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এই সময়েই প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়ে। মা ইলিশ বলতে প্রজননক্ষম পরিপকস্ফ স্ত্রী ইলিশ মাছ বোঝায়। ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় শতকরা ৮৬ ভাগ আহরণ করা হয় এই দেশে। ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়।

বৈচিত্র্যময় জীবন ইলিশের। ইলিশ প্রধানত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননকালে এ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য বেছে নেয় স্বাদু পানির উজানকে। এ সময়ে ইলিশ দৈনিক প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯-১০ শতাংশ হারে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার জাটকা আহরণও নিষিদ্ধ করেছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে প্রতি অর্থবছরে সরকার বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল দুই কোটি টাকা। বর্তমান অর্থবছরে সরকার বরাদ্দ দিয়েছে আট কোটি ৫০ লাখ টাকা। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৯৯ হাজার টন, সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। এর চলতি বাজারমূল্য প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফল বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদনদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১৭৪টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি ইলিশ একসঙ্গে কমপক্ষে তিন লাখ ও সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ে। এসব ডিমের ৭০-৮০ শতাংশ ফুটে রেণু ইলিশ হয়। এর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, যা পরবর্তীকালে ইলিশে রূপান্তরিত হয়। ইলিশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রপ্তানি ছাড়াও ইলিশের নুডলস, স্যুপ ও পাউডার তৈরির প্রযুক্তি আবিস্কারের ফলে ইতোমধ্যে তা বাজারজাত শুরু হয়েছে। অর্থনীতিতে ইলিশের রয়েছে বিরাট অবদান। যদি প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা ও জাটকা নিধন বন্ধ থাকে তাহলে ২১ থেকে ২৪ হাজার কোটি নতুন পরিপকস্ফ ইলিশ পাওয়া যাবে। তাতে বছরে সাত হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টি সম্ভব হবে বাংলাদেশে। অর্থের প্রবাহ বাড়বে। বাড়বে দেশের কর্মসংস্থান। পাশাপাশি দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ হবে।

গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

alam4162@gmail.com