বাঙালি সংস্কৃতি এই বাংলার জল, মাটি, পলি, মানুষ- এসব কিছুর সম্মিলন থেকেই উঠে এসেছে। এই উঠে আসার মধ্য দিয়ে আমরা চিনেছি বাঙালি সংস্কৃতি। মূলত এখানে বসবাসকারী মানুষদের, যাদের আমরা বলি আদি বাঙালি সমাজ কিংবা তার পরের যুগের বাঙালি কিংবা আধুনিক বাঙালি এবং সাম্প্রতিক সময়ের বাঙালি। এই প্রক্রিয়া ধারার মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করি, মানুষ তার ভাষায়, আচার-আচরণে, তার বিশ্বাস এবং তার সম্পর্ক এসব কিছু মিলিয়ে কোন কোন পদ্ধতিতে তারা জীবনযাপন করছে। একটা পদ্ধতি হলো, যেখানে জন্ম নিয়েছে তারপর সেখানে তার বসবাস, ভিটাবাড়ি এরপর তার অনেক সংস্কার। সংস্কারের পাশাপাশি তার আছে সংস্কৃতি। এই সংস্কার তার সামাজিকতায়, বিশ্বাসে, আচরণে ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে, নানাভাবে।
এর মধ্যে কিছু আছে সার্বজনীন, যে বিষয়গুলো ধর্ম-বর্ণ সবকিছু ছাড়িয়ে প্রকৃতিনির্ভর, আমাদের অরণ্যনির্ভর, সমাজ কাঠামোর বন্ধননির্ভর এবং আমাদের মানবিক সম্পর্কনির্ভর। তেমনি এক ঋতুভিত্তিক, সংস্কৃতিভিত্তিক, আচারভিত্তিক এবং সার্বজনীন মঙ্গলভিত্তিক একটি উৎসবের নাম শারদীয় দুর্গোৎসব। এর সঙ্গে জড়িত আছে আদি বা সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি বিশ্বাস, দেব-দেবীর পূজা অর্চনা এবং মানুষের মাঙ্গলিক সত্তা। দেব-দেবীকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা করেন। তারা দেব-দেবীর আরাধনা করেন। এই বিষয়গুলো হয় নানাভাবে। কখনও মূর্তি আকারে স্থাপন করে আবার কখনও কোনো আকারে না গিয়ে নান্দনিক আকারবিহীন সত্তার ভেতর দিয়ে দেখে। পার্থক্য শুধুই এটুকুই। বাকি যেটুকু তা হলো, মানুষে মানুষে সম্পর্কিত সত্তা, বন্ধন, ভালোবাসা, প্রীতির ছায়া। বাঙালি জাতির বৈচিত্র্যময় জীবনাচার, সংস্কৃতি সবকিছুই তো অত্যন্ত উৎকর্ষ। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও একই সঙ্গে যে সংস্কৃতি ধারণ করে চর্চা করে চলছে বাঙালি, এর মধ্যে সার্বজনীনতাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
শরৎ আমাদের ষড়ঋতুর মধ্যে এমন একটি ঋতু, যে ঋতুতে গরম কম, এই রোদ কিংবা এই বৃষ্টি কিংবা জল আছে কিন্তু জলও কম আবার শীত আছে কিন্তু তাও কম। অর্থাৎ, সবচেয়ে সহনীয় একটা ঋতু। আমাদের প্রকৃতিগত এই পরিবর্তন ঘিরে বাঙালি সমাজে নানা উৎসবের আয়োজন হয়। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই তো বাঙালি সমাজে আধিবাসীদেরও বসবাস। সনাতন ধর্মাবলম্বী থেকে শুরু করে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এমনকি আদিবাসী সবাইকে নিয়েই তো আমাদের সম্প্রীতির সমাজ কাঠামো। আদিবাসীদের জীবনাচারে প্রাকৃতিক বিষয়গুলো খুব প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। আমাদের সবারই এই কাঠামোবদ্ধ সমাজে বসবাস কিংবা জীবনযাপন এসব ঘিরেই নান্দনিকও। আমাদের আদিতে আছে কৃষি সভ্যতা। কৃষি সভ্যতার সঙ্গে বাঙালি সভ্যতার, বাঙালির আচার ইত্যাদির নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ধান, দূর্বা, ফুল, জল ইত্যাদি কত কিছুই তো প্রকৃতির উপাদান। আমরা যখন পবিত্র জল ছিটাই কিংবা গঙ্গা থেকে পবিত্র জল আহরণ করি, সবকিছুতেই উদারমনস্ক বাঙালিরা সুন্দর ও স্বচ্ছতারই অনুসন্ধান করে।
যদিও একটি সম্প্রদায় কিংবা ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব বলা যায় এই শারদীয় দুর্গোৎসব, কিন্তু এই উৎসবের সার্বজনীন ও মাঙ্গলিক দিক আছে যা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার, সম্প্রীতির বন্ধন মজবুত করার বড় সূত্র। তেমনি বুদ্ধদের বৈশাখী পূর্ণিমা, খ্রিষ্টানদের বড়দিন, মুসলামনদের ঈদ এই প্রত্যেকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও এর সার্বজনীনতাও এখানে গভীরভাবে দৃশ্যমান। সব ধর্মের মধ্যেই এই মাঙ্গলিক সার্বজনীন বিষয়টি রয়েছে। আমরা সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুতকরণের বিষয়টির ওপর অধিক গুরুত্ব দিই। আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও ডাকে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আমাদের এই আকুতি আরও পুষ্ট হয়েছে। আমাদের মাঙ্গলিকতা ও মিলনের সেতু হলো এই বোধটুকুই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শারদীয় উৎসব নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা যেমন সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি-মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন চাই, তেমনি চাই মঙ্গল কিংবা কল্যাণের ক্ষেত্রও আরও প্রসারিত হোক। ক্রমাগত হতেই থাকুক। এই জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনে যে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারগুলো ছিল, সেই অঙ্গীকার ধারণ করে, চর্চা-অনুশীলন করে সব অশুভর ছায়া অপসারণ করা সম্ভব। আমাদের সংস্কৃতি সব উৎসবের ঔজ্জ্বল্য দিয়েছে। উৎসবের আলোয় আলোকিত হোক চারদিক।
লেখক :বিশিষ্ট কবি; মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।