খুব কৌতূহলী কণ্ঠে দীপাদি জিজ্ঞেস করেন একবার, 'কালাচাঁদপাড়ায় কী আগের মতো খুব জাঁকজমকের দুর্গা পুজো হয়? পুজোর শুরু থেকে শেষ নানা অনুষ্ঠান, নানা মেলা, হৈ চৈ হয়? হিন্দু-মুসলিম সবাই যায়, আনন্দ-স্ম্ফূর্তি করে? নাটক, যাত্রা হয়?'

এত প্রশ্নে জল ঢালি। 'দেশভাগের আগের কথা বলছেন? জন্ম হয়নি তখন। দ্বিখণ্ডিত ভারতের পাঁচ পরে জন্ম, তারও ছয় বছর পরে, যতদূর মনে পড়ে, স্মৃতি বিটলেমিও করতে পারে, মেজআপা-সেজআপা (মেজদিদি-সেজদি) ভাইবোনদের সঙ্গে (চাচাতো ভাইবোন। কেউ বড়, কেউ ছোট) দলবেঁধে রিকশায় চেপে পুজো দেখতে গেছি। কখনও মা-চাচিরাও থাকতেন। ওদের মতলব ভিন্ন। পুজো মণ্ডপের চত্বরে, আশপাশে, মাঠে মেলা। হরেক পসরা সাজিয়ে বিক্রি। গহনা থেকে মালা, শাড়ি, তৈজসও। ওরা কিনতেন। আমাদের বরাদ্দ ছিল আট/দশ আনা। কটকটি (পোড়া গুড় দিয়ে তৈরি), দিল্লিকা লাড্ডু, চিনির খাগড়া, এক পসরা দিয়ে চোঙের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে দুই মিনিটের বায়োস্কোপ দেখা। রসকদম্ব, মালপোয়া কেনার পয়সা থাকত না। যে ময়রা মিষ্টির ডালা খুলে বসতেন, ঘুর ঘুর করতাম, ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতাম। ময়রার ধমক, 'ভাগ।' কারোর দয়া, জিজ্ঞাসা : 'তুমি কোন বাড়ির ছাওয়াল?' আব্বার নাম শুনে, 'আচ্ছা। একটা রসকদম্ব, একটা প্যারা দিলেন। পয়সা লিলেম না। চাচাক (চাচা) ক'বে (বলবে)।' বলি 'কবো নে' (বলবো)। শুনে মহাখুশি। 'কালকে অ্যাসপে (আসবে)। আবার দেবো নে।'

পাশের মিষ্টির দোকানি বলছেন : 'হাকিমউদ্দীন চাচার ছাওয়াল। ছাওয়ালের হাতে টাকাপয়সা দেয় না, ছাওয়াল দুকানের (দোকান) সামনে আ'সি (এসে) ঘুর ঘুর করে। না দিলি, চাচার কানে কতা (কথা) গিলি বেইজ্জত।' দেশভাগের আগে শেখ হাকিমউদ্দীন (সম্ভবত) পাবনার শেষ জমিদার। তাঁর দাপটে হিন্দু-মুসলিম অনেকেই তটস্থ থাকতেন হয়তো। আমাদের বাড়িতে দেখেছি বহু হিন্দু পুজোর চাঁদা নিতে, পুজোর সময় গরিব হিন্দুদের পোশাকও দিতেন আব্বা।

বলি দীপাদিকে। 'আপনাদের কোন পাড়া?' প্রশ্ন। 'উত্তর :দোহারপাড়ায়।' 'ওই পাড়ার এক মেয়ে রমাদির (সুচিতা সেন) সঙ্গে পড়তেন। চেনেন?'- তিনি আমার বড় আপা। ওদের সখ্যসম্পর্ক ছিল। আমাদের বাড়ি আসতেন। দিলালপুরে। পরে আমরা দোহারপাড়ায়। শহর সংলগ্ন মিউনিসিপালটির বাইরে। আব্বার বুদ্ধি, শহরের ট্যাপ দিতে হতো না। কিন্তু শহরের সব রকম সুযোগ-সুবিধা। জমিদারের বুদ্ধি।

- শুনে, দুই ঠোঁট টেপে স্মিত হাসি।

দীপাদিকে বঙ্গীয়জনকুল চেনেন। একদা নামি টেনিস খেলোয়াড়। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী। নাট্যজন, নাট্যঅভিনেত্রী পৌলমী এবং কবি সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের জননী। পুলুদা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) দেখা হলে বলতেন, 'কি হে শালা।' কৈফিয়ত দিলেন একবার আকাশবাণীর 'সংবাদ পরিক্রমা' লেখক প্রণবেশ সেনের দপ্তরে। পুলুদা এসেছেন। দপ্তরে কবিতা সিংহ। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। 'শালা সম্বোধনে প্রণবেশ সেনের জিজ্ঞাসা : 'কী করে?'

পুলুদার উত্তর :'ও তো দীপার পাড়াতুতো। কালাচাঁদপাড়ার।' ঠিকই। কালাচাঁদপাড়া-দোহারপাড়ার দূরত্ব (মাঝখানে দুই রাস্তা) তিন মিনিটের। প্রণবেশ সেন বললেন, 'ওঁর অগ্রজ কবি জিয়া হায়দার আমার স্কুলজীবনের বন্ধু। কতবার গিয়েছি ওদের বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে জিয়া হায়দারের কবিতা 'রবীন্দ্রনাথ', শেষ পংক্তি : 'আমার অস্তিত্বে তুমি ঈশ্বরের মতো।' সৌমিত্র :'এই কবিতা পঁচিশে বৈশাখে, সংবাদ পরিক্রমায় বহুবার শুনিয়েছেন।' কবিতা সিংহ :"বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রসদনে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মহিলা কবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন : আমার অস্তিত্বে তুমি ঈশ্বরের মতো। সাহস আছে কবির।' প্রণবেশ সেনের ফোঁড়ন : 'জ্বলজ্যান্ত সুপুরুষ। গোমাংস বেশি খায়। আমার ছোট ভাই টোনার গুরুদেব।'

কবে, কোন বয়সে, ভারত ভাগের আগে না পরে, কখনও জিজ্ঞেস করিনি দীপাদিকে। কিন্তু তাঁর মনে আছে দোহারপাড়া সংলগ্ন বিখ্যাত শীতলাইয়ের জমিদারের বাড়ি। গোটা পাবনায় তথা উত্তরবঙ্গে এ রকম চাকচিক্য, সুদৃশ্য, মোহনীয়, আকর্ষণীয় বাড়ি বা ভিলা কোথাও নেই। ওই বাড়ির, জমিদারের বংশীয় কবি-গায়ক জৌতিনিন্দ্রনাথ মৈত্র, শিল্পী রথীন মৈত্র। ওদেরই জ্ঞাতীকুল আশুতোষ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী। 'রবীন্দ্রনাথও নাকি গিয়েছিলেন একবার (না, যাননি)।' গুজব শুনে থাকবেন। রবীন্দ্রনাথ 'গোবিন্দ লাইব্রেরিতে গিয়েছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন।

দীপাদির প্রশ্ন :'শীতলাইয়ের জমিদারবাড়ির পুজো দেখেছেন?'

- কী করে দেখবো? জন্ম হয়নি। দেশভাগের আগেই জমিদার কলকাতায়। না দেখলেও, জমিদার বাড়ি-ঘেঁষে ইছামতী নদী। দুটি ঘাট। দুই ঘাট থেকে শুরু (বিজয়া দশমীর পরে) নৌকো বাইচ। প্রতিযোগিতা। শত শত মানুষ। মহাউল্লাস। হিন্দু-মুসলিম একাকার।

পাক-ভারত যুদ্ধের (৬-১৭ সেপ্টেম্বরে ১৯৬৫) পরে এই কালচারে ভাটা। ইছামতী এখন ধু-ধু বালুচর। চাষজমি। বাড়িঘর। ইছামতী ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় 'ইছামতী' বেঁচে।

দীপাদির স্মৃতিতে কৃষ্ণপুর, রাধানগরের পুজো আমল পায় না, 'ওরা কালচাঁদপাড়ার কাছে নস্যি।'

বলি, রাধানগরের পুজো নিয়ে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের স্মৃতিকথা : 'আহা! কী রূপ। ধারেকাছে কেউ নেই।'

লক্ষ্য করি, দেশভাগের পরে যারা পূর্ববঙ্গ ত্যাগী, পুজোনস্টালজিয়ায় কাতর। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও। খুব স্বাভাবিক।

ভিটেমাটি ছাড়ার ব্যথাবেদনা, অতীত, শৈশব, আনন্দবেদনার দিন কুরে খায়। যেমন খায় পাবনার মহেন্দ্রপুরের কৃষ্ণচন্দ্র পালের। বয়স ৯৪ (এখন মৃত)। বলতেন : 'দুর্গামা'র শরীরচেহারা আমরাই তৈয়ারি করতাম। গোটা পাবনায় আমাদেরই দুর্গামার চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমরা পাল বংশের পুতুল, প্রতিমা তৈরি আমাদের হাতের প্রাণ পায়। দেশভাগের পর কলকাতায় এসে আমরা কেউ নয়। রমেশচন্দ্র পালের দখলে সব। দেশভাগে মাদুর্গাও বেহাত, দখলে।'

দীপাদি বললেন, 'দেশভাগে পুজোও নস্টালজিয়া, অতীতপুজো। বর্তমান পুজোয় আকাশপাতাল তফাত। সেই আনন্দ, স্ম্ফূর্তি নেই। সবই নগর, নগর-মহল্লায় অসংস্কৃতি।'

- 'অসংস্কৃতি, অধর্মীয়?' প্রশ্নের উত্তর : 'এই কি পুজোর আনন্দ? ইয়াং ছেলেমেয়ের কাছে পুজো এখন ভ্যালেনটাইন ডে, জোড়ায়-জোড়ায়। পুজোয় এ-ও এক নব্য কালচার। আমাদের সময়ে ছিল না। এই কালচারে ধর্ম নেই, প্রেমই মহাত্ম্য।'

- পুজো তা হলে ভ্যালেনটাইন ডে, প্রেমও!!

- আহা! পুজোয় কেন আমাদের সময়ে ছিল না? এই দুঃখ দীপাদিরও।

বিষয় : নস্টালজিয়া

মন্তব্য করুন