এক মহাবৈপ্লবিক চেতনার নাম লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)। যিনি জন্মেছিলেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন পাড়াগাঁয়ে ২৪৪ বছর আগে। ১১৬ বছরের সুদীর্ঘ জীবনে ভজনসাধনে সিদ্ধি লাভ করে হয়ে ওঠেন বাউলসম্রাট। লালন ফকিরের সাধনা ও দর্শন দুটো ধারায় পরিব্যপ্ত। একদিকে মরমি সাধনার ভদ্রনম্র দিক, অন্যদিকে তার বিদ্রোহের দাবানল। সুধীর চক্রবর্তী তার 'ব্রাত্য লোকায়ত লালন' গ্রন্থে বলেন, 'লালন ফকির আমাদের আছে মান্যতা পান তাঁর চমৎকার গানগুলোর জন্য। কিন্তু তাঁর গান কেবল মরমিয়া উৎসরণে ভাবাতুর নয়, তাতে প্রশ্ন আছে, সংশয় আছে, আছে সঠিক পথ সন্ধানের আর্ত আকুতি। সেই জন্য লালনগীতি মধ্যযুগের প্রান্তবিন্দু থেকে সূচিত হয়েও সর্বাধুনিক মনকে ছুঁয়ে যায়'।

সত্যিই সাঁইজির গানগুলোর যৌক্তিক আদি উৎস তার পাণ্ডুলিপি। হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্তির পরও এসব পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনের আর্কাইভস এবং অন্যান্য স্থানে রক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিতে সংগীত রচয়িতার নাম 'লালন' নয়, লেখা আছে 'নালন'। বাঙালি শিক্ষিত সমাজে ১৮৭২ সালের দিকে এক নিবন্ধে এই সাধনসংগীতজ্ঞকে 'লালন শাহ' নামে পরিচয় করিয়ে দেন কুমারখালীর কাঙ্গাল হরিনাথ (১৮৩৩-১৮৯৬)। উপেন্দ্রনাথ মুখার্জির 'বৃহৎ বাউলসঙ্গীত' শীর্ষক সংকলনে সম্ভবত লালন শাহের গানও প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, লালনের গানে কাঙ্গাল হরিনাথ এতোই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি ১৮৮৯ সালে (১২৯৬ বঙ্গাব্দে) তার ব্রহ্মাণ্ডবেদ-৩য় ভাগ, ৬ষ্ঠ সংখ্যায় লালন ফকিরের 'কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা' গানের সুরে বাঁধা তার নিজের কয়েকটি গান উদ্ধৃত করেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঞ্চম পুত্র জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৮-১৯২৫) শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বাঙালির নবজাগরণ, ইংরেজ সংসর্গ, হিন্দু মেলার প্রেরণা, নাট্যমঞ্চের চাহিদা এবং ব্রাহ্ম ধর্মের উপাসনা নান্দনিক সৃজনশীলতার পরিবৃত্তে উনিশ শতকের শেষার্ধে বাংলা গানের অন্যতম প্রাণপুরুষ জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের গান শুনেছেন এবং সে সুবাধেই ঠাকুরবাড়ির এই মানুষটির সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবিগুরুর জ্যোতি দাদার স্ত্রী বিয়োগ ঘটে ১৮৮৯ সালে। স্ত্রী বিয়োগে বেদনায় ভারাক্রান্ত জ্যোতিদা প্রায় সংসার বিবাগি, জমিদারি দেখাশোনায় অনীহা, এমনই এক সময়ে লালন ফকিরের গানে মশগুল। এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই জ্যোতিবাবু লালন আখড়াটিকে নিস্কর করে দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। এ ছাড়া সাঁইজির মৃত্যুর এক বছর পাঁচ মাস আগে ৫ মে জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে বোটের ওপর লালন ফকিরকে চেয়ারে বসিয়ে পেন্সিল দিয়ে তার একটি রেখাচিত্র আঁকেন। অসম্পূর্ণ হলেও এটাই একমাত্র আদর্শ চিত্রকর্ম। আজও রবীন্দ্রভারতী চিত্রশালায় এটি বিরাজ করছে। যদিও সাঁইজির মৃত্যুর (১৮৯০) ছাব্বিশ বছর পর ১৯১৬ সালে শিল্পী নন্দলাল বসু সম্পূর্ণ কল্পিত একটি চিত্র অংকন করেন। এই অঞ্চলগত ঘনিষ্ঠতার ঘটনাই ফকির লালন শাহকে কুমারখালী, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর ও বৃহত্তর নদীয়া কুষ্টিয়ার শিষ্ট মহলে তার ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

লালন শাহের শেষ জীবন স্থান করে নিয়েছে আঞ্চলিক পত্রিকার পাতায়। তার গান ছাপা হয়েছে কাঙ্গাল হরিনাথের ব্রহ্মাণ্ডবেদ-এ। রেখাচিত্র স্থান করে নিয়েছে রবীন্দ্রভারতী সংগ্রহশালায়। তার শিষ্যরা গান গেয়ে তার সাধনার কথা বলেছেন। নদিয়া, কুষ্টিয়া, পাবনা, যশোর এবং ফরিদপুর অঞ্চলের লক্ষকোটি লালনপন্থি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় তখন দুঃখ-দৈন্য আর দারিদ্র্যের বেষ্টনীতে বদ্ধ হলেও খাঁটি বাউল আর শখের বাউল লালন গানের আচ্ছন্নতায় বিভোর। লালন স্থান করে নিয়েছেন লক্ষকোটি মানবতাবাদী লালন অন্তপ্রাণ মানব হৃদয়ে।