ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম, সর্ববৃহৎ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এক ঐতিহাসিক আনন্দ ও গৌরবের মাহেন্দ্রক্ষণে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে। বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স যখন ৩৮৫ বছর, কেমব্রিজের ৭৫৫ বছর, অক্সফোর্ড ৯১৫ বছর, অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স কেবল ১০০ বছর। মহাকালের গর্ভে ১০০ বছর খুব বেশি না হলেও একটি দেশের জন্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বিপুল।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনেকেই রক্ত দিয়ে এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তাই বিশ্বের যে কোনো প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা। ১৯২০ সালে ভারতীয় বিধানসভায় গৃহীত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনবলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকার রমনা এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রাথমিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে ঢাকা কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী এবং কলেজ ভবনের (বর্তমান কার্জন হল) ওপর ভিত্তি করে। তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্রছাত্রী এবং তিনটি আবাসিক হল নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।

মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল গৌরবজনক। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রসভার আয়োজন করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। জিন্নাহর বক্তব্য তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের ওপর গুলি চালালে অন্যদের সঙ্গে শহীদ হন আবুল বরকত (রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ শ্রেণির ছাত্র)। বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নিয়ামক প্রেরণা জুগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দেখিয়েছে নতুন পথ, নতুন আলো। সে আলোর পথ ধরে এগিয়ে গেছে এ জনপদের মানুষ। প্রবেশ করেছে এক নতুন যুগে। সে যুগ স্বাধীন বাংলাদেশের যুগ। জন্ম নিয়েছে একটি স্বাধীন ভাষিক রাষ্ট বাংলাদেশ। ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১-প্রত্যেকটি আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সে কারণে গোলাপ যেমন একটি বিশেষ প্রজাতির ফুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমনি হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়।

২৫ মার্চের গণহত্যার (অপারেশন সার্চলাইট) প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষককে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী যিনি বাংলাদেশ জাতি-রাষ্ট্রের মহান স্থপতি। এ উদাহরণ বিশ্বে বিরল। আমি নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। একই বিভাগের শিক্ষক ছিলেন বহু ভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌। সে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্ররা বিশেষ গৌরব বোধ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরও কৃতী ছাত্র উপহার দিয়েছে- যারা দেশ ও জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাক্তন ছাত্র শিল্পী মনিরুল ইসলাম, এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্পী। তার শিল্পরীতি 'স্কুল অব মনিরো' ইউরোপের প্রতিটি চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। শিল্পী শাহাবুদ্দিন ফ্রান্সের অন্যতম সেরা চিত্রশিল্পী। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কলা, বিজ্ঞান, চারুকলা, সমাজবিজ্ঞান প্রতিটি শাখায় বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ব্রজেন দাস সাঁতারে প্রথম ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বহু খ্যাতিমান মানুষের পদধূলিতে এ বিদ্যাপীঠ গৌরবান্বিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।

ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে বলতে চাই, আমাদের মধ্যে অহংবোধ নয়, একজন ভালো মানুষ জন্মগ্রহণ করুক, মমতা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটুক পূর্ণ মাত্রায়। ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আমাদের হৃদয় আরও প্রস্ম্ফুটিত হোক যাতে আমরা আরও বেশি সেবা ও ভালোবাসা দিতে পারি। জীবনের উদ্দেশ্য তো তাই। দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করতে পারলাম কিনা- এটাই আসলে সবার কাজের মূল প্রেরণা হওয়া উচিত। এ চিন্তাটা সব সময় সামনে থাকলে একজন মানুষ অসাধারণ অর্জনের শক্তি পায়। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, নিজের কাজ সবচেয়ে ভালো কিংবা সুচারুভাবে করাই প্রকৃত দেশপ্রেম।

বাংলাদেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার-আপনার ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে, যা আমরা কোনোক্রমেই অস্বীকার করতে পারি না। জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন কিনা, আপনি কঠিন সময়ে ভেঙে পড়েন নাকি স্থিতি থাকতে পারেন- এটাই মানুষ হিসেবে আপনার নিয়ামক যোগ্যতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভাষায়- 'চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে ...।' চোখের আলো হারালেও আমরা যেন মনের আলো না হারাই- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে এটাই আমার অন্তরের আকুতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে গর্ব ও আনন্দ দুটোই আমার রয়েছে। সদ্য কিশোর পেরোনো ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন তারা নিতান্তই সাধারণ কিন্তু তুমুল স্বপ্নবাজ। এখান থেকে উত্তীর্ণ হয়েই তারা নিজ নিজ পেশায় সফলতার শীর্ষে পৌঁছে। এই রূপান্তর দেখাটা সত্যি স্বর্গীয় আনন্দের। বারবার এই আনন্দের দেখা পেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা যদি আবার বা বারবার আমাকে জন্মলাভের সুযোগ দেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের মাটিতেই কাজ করতে চাই- অন্য কোথাও নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শত ভাবনা বিকশিত হোক। শত ফুল নিত্য হাসি ফোটাক। শত চিন্তার প্রসারে ঘটুক ব্যক্তি ও জাতির ক্রম-উত্তোরণ। স্বপ্নে-কর্মে-উদ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমাগত আরও প্রস্ম্ফুটিত হোক, জনপ্রত্যাশা পূরণ করুক। এবং আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথার্থ ভূমিকা রাখুক- এটাই আন্তরিক প্রত্যাশা।