প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজে কিছু কিছু শিশু নির্যাতনের চিত্র উঠে আসছে। এর বাইরে অসংখ্য ঘটনা, এমন চিত্র আড়ালে থেকে যায়। নিরপরাধ শিশুরা শিকার হয় খুন, ধর্ষণ কিংবা ভয়াবহ নির্যাতনের। এসব ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দৃষ্টান্ত খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় না। অনেক সময় ভোক্তভোগী আইনের আশ্রয় নিলেও অপরাধী ফাঁকফোকরে ছাড়া পেয়ে যায়। করোনা মহামারিতে মানুষ যখন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে, তখনও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ নেই বরং বেড়েছে। 

সম্প্রতি আসকের করা একটি গবেষণা প্রতিবেদন দেখে আঁতকে উঠেছি, আতঙ্কিত হয়েছি। নিয়মিত ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা মোটেই স্বস্তিকর নয়। করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই কর্মহীন হয়েছেন, তাদের আয় কমে গেছে। কারও আয় বন্ধ হয়েছে। অনিশ্চিত জীবনযাত্রার হতাশা থেকে মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে। এসব কমাতে হলে মানুষের অপ্রতুল জ্ঞান, বৈরী মনোভাব ও অন্যের ক্ষতি করার মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কার্যকর তথ্য, অংশগ্রহণের মঞ্চ এবং উপযুক্ত নীতি নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু সেই কাজ করবে কে?

ইউনিসেফ বলছে, দেশের ৫ থেকে ১২ বছরের শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ৭০ শতাংশই যৌন নির্যাতনের শিকার হয় আমাদের দেশে। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৭ মাসে হত্যার শিকার হয়েছে ৩৬৫ শিশু। এদের মধ্যে অনেকে গৃহকর্মী। এ ছাড়া ৪৬২ শিশু ধর্ষণ ও অর্ধশতাধিক শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এ সময় শিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১৯৯টি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, করোনার সময় শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ও এর ভয়াবহতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। গত বছর ২০২০ সালে একই সময়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ছিল ৯৮৬টি। ২০১৯ সালে বছরজুড়ে ঘটেছিল দুই হাজার ১৮৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা। আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৫৩২টি। 

গবেষকরা বলছেন, করোনা মহামারি সামাজিক অস্থিরতা ও শিশু নির্যাতনের প্রবণতা বাড়িয়েছে। বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিকৃত মানসিকতার কারণে শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে।

আমাদের দেশের মানুষের আচরণ দিন দিন আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সমাজ হয়ে উঠেছে অনিরাপদ। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য মানুষের সামাজিক আচরণের কারণগুলোর দিকে নজর দিতে হয়। এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে যেসব আচরণ শিশুর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে, সেসব আচরণের সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবার বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় সবাই সমান সুবিধা পায়নি বলে অনেক পরিবার শিশুর চাহিদা মেটাতে পারছে না। এসব শিশুর অধিকার, বিকাশ ও সুরক্ষা নিয়ে কোনো কথাও তারা বলতে পারছে না। শিশুর অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়গুলো সম্পর্কেও তারা তেমন অবগত নয়।

গত ২২ জুলাই রাতে সিলেটে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ছোটমণি নিবাসে দুই মাস বয়সী শিশু নাবিল কান্না করলে আয়া সুলতানা বিরক্ত হয়ে তাকে বিছানা থেকে ছুড়ে ফেলেন। বিছানার স্টিলের রেলিংয়ে বাড়ি খেয়ে নাবিল মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারায়। তার মুখের ওপর বালিশচাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। গত ৯ আগস্ট ৫ বছরের শিশু জিসানুল ইসলাম আকাইদকে হাত-পা বেঁধে ক্ষুর দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের জন্য তাকে অপহরণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। রাজধানী খিলগাঁওয়ের মধ্য নন্দীপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসব থেকেই বোঝা যায় এ সমাজ শিশুদের জন্য কতটা অনিরাপদ। দেশে শিশু আইন আছে। এই আইন ১৯৭৪ সাল থেকেই ছিল। শিশু অধিকার বিষয়ক এই পুরোনো আইনটি সময়ের চাহিদা পূরণে যথার্থ ছিল না। এ জন্য ২০১৩ সালে প্রণীত হয় নতুন একটি আইন। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুদের বিশেষ অধিকারের কথা বলা আছে। এ অধিকারগুলো শিশুর বেড়ে ওঠা ও নিরাপদ শৈশবের জন্য অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক আইনের এ বিধানগুলো আমাদের ২০১৩ সালের আইনেও স্থান পেয়েছে। কিন্তু শিশু নির্যাতন বন্ধ হয়নি।

কেন বন্ধ হয়নি? কারণ আইনের প্রয়োগ না হলে তা কাগুজে বাঘই রয়ে যায়। আর শিশু নির্যাতনের বিচার করা আরও কঠিন। কারণ শিশুরা ভয়ে নির্যাতনের কথা গোপন রাখে। তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। সেই সঙ্গে অনেক নির্যাতনের কোনো সাক্ষী থাকে না। শিশু নির্যাতনের মতো পৈশাচিক ঘটনার সঙ্গে যেসব অপরাধী জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা আইনগত ও সামাজিক দায়িত্ব। আর সমাজে অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। কোনো শিশুকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার ঘটনা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদে বর্ণিত অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারা অনুযায়ী শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মনে রাখতে হবে, জাতি গঠনে শিশু অধিকার সুরক্ষা ও শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। করোনার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য শিশুর প্রতি নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দেশের সামগ্রিক শিশু অধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ। শিশুর শৈশবের সব পর্যায়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক আচরণের একটা রূপরেখা তৈরি করে সেটির ব্যাপক প্রচার ও কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবেই সুফল পেতে শুরু করব আমরা।

বিষয় : শিশুর প্রতি সহিংসতা

মন্তব্য করুন