২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পথে। এই বছরের প্রথম দিকে কয়েক দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও মাঝে করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নির্বাচন বন্ধ ছিল। ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন প্রায় এক হাজারের ওপর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে এবং এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রার্থী মনোনয়ন করছে। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই দল প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে কতটুকু সমর্থ হবে সেটি দেখবার বিষয়। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করেছি সরকারি দল আওয়ামী লীগ আগামী ধাপে অনুষ্ঠিতব্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে। নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবার পর দেখা গেল নারায়ণগঞ্জের কোনো এক ইউনিয়নের ছাত্রদলের এক সময়ের সভাপতি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। এটিই একমাত্র উদাহরণ নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক অনুপ্রবেশকারী আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। এই ধরনের মনোনয়ন আওয়ামী লীগের জন্য আখেরে একটি নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে।

একথা সত্য যে, রাজনৈতিক দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত হলেও বাংলাদেশে এটি খুব সফলভাবে অনুশীলন হচ্ছে না। যদিও আমাদের পাশের দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এই পদ্ধতি প্রচলন হবার পর থেকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলাদলি ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ। কারণ, এই মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দল বিভিন্ন সময়ে উপদলে বিভক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলে আসা বিপুলসংখ্যক অনুপ্রবেশকারীর আধিপত্য ও মনোনয়ন বাণিজ্য। এই অনুপ্রবেশকারীরা এমনি এমনি দলে আসেনি, দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং কখনও কখনও জনপ্রতিনিধিদের হাত ধরে তারা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করেছে। গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের পদে আসীন নেতা এবং কখনও কখনও এমপি এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেকেই চেষ্টা করেন স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিগুলোকে এমনভাবে তৈরি করতে, যাতে তাদের অবস্থান স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী হয়।
এই ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করবার জন্য প্রত্যেকেই চেষ্টা করেন বিভিন্ন দল থেকে আসা নেতাকর্মীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে। শুধু দলে অন্তর্ভুক্ত করেই তারা ক্ষান্ত হন না, তাদের বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন এবং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন, যাতে করে তারা তাদের কথায় কাজ করে এবং তাদের অবস্থান স্থানীয় পর্যায়ে সুসংহত থাকে। অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করে যে কোনো মূল্যে অনুপ্রবেশ আটকানোর তাগিদ দিয়েছে। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ গত ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করছে। এই অনুপ্রবেশকারীরা একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের লেবাস ব্যবহার করে নিজের পূর্ববর্তী দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, ঠিক তেমনিভাবে দলের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত রয়েছে। তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে কীভাবে নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের অবস্থান আওয়ামী লীগে সুসংহত করা যায়, যাতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারা পুনরায় দলে ফিরে গিয়ে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে পারে।
এই অনুপ্রবেশকারীরা যদি ব্যাপক মাত্রায় মনোনয়ন পায় এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসে তাহলে আওয়ামী লীগের এবং সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে তারা বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে। আমরা জানি, স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি বাস্তবায়িত হয়। সেই সমস্ত নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই নেতারা বাধা সৃষ্টি করে জনগণের সামনে এমন একটা বার্তা প্রদান করার চেষ্টা করবে যে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের সরকার নয়। এরপরে তারা দুর্নীতি করে নিজেদের আখের গোছাবে যার দায় যাবে আওয়ামী লীগের ওপরে। কারণ তারা আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়েছে।

দলে অনুপ্রবেশকারীদের প্রাধান্য এবং মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের বঞ্চনার শিকার হওয়া- দুটোই দলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ত্যাগী নেতারা আজীবন আওয়ামী লীগের আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করে যদি মনোনয়ন না পান এবং জনগণের সেবক হতে না পারেন তাহলে তারা আস্তে আস্তে নিজেদের গুটিয়ে ফেলবেন এবং দলীয় কার্যক্রমে শূন্যতা দেখা দেবে। এই ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করা গেলে শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নয়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই খেসারত দিতে হতে পারে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাই আছেন, যারা নিজেদের অবস্থান স্থানীয় পর্যায়ে সুসংহত করার জন্য ত্যাগী নেতাদের ক্ষমতার বাইরে রাখেন এবং সংগঠনে তাদের মূল্যায়ন করা হয় না। এর আরেকটি কারণ হলো, নিজেদের 'ইয়েস ম্যান'দের নিয়ে কমিটি করে নিজেদের সকল কার্যক্রমের বৈধতা প্রদানকে সহজতর করা।

আমরা জানি, স্থানীয় সরকার হচ্ছে গণতান্ত্রিক চর্চার সূতিকাগার। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন করেই মানুষ একসময় জাতীয় পর্যায়ে নীতি প্রণেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। সেই কারণেই স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃত ত্যাগী নেতাদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া প্রয়োজন। এটি করা গেলে তারা শুধু জনগণকে ভালো সেবা প্রদান করবে না, সময়ের আবর্তে এই নেতারা অনেক বেশি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে পরিণত হবে, যারা আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন-২০৪১কে সামনে রেখে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আর দলের কিছু নেতা নিজের ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন স্তরে অনুপ্রবেশকারীদের দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করছেন। এটা ঠিক যে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সভাপতির নেতৃত্বে একটি মনোনয়ন বোর্ডের মাধ্যমে। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা উপস্থাপন করেন মনোনয়ন বোর্ডের সভায়। সেই তালিকা উপস্থাপনের সময় যদি অনুপ্রবেশকারীদের নাম তালিকায় থাকে সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতির পক্ষে সকলের অতীত বিবেচনা করে মনোনয়ন প্রদান করা সম্ভব নয়।

আবার অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার কাছে প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজ নেবার দায়িত্ব প্রদান করলেও তারাও কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন সে বিষয়টিও ভেবে দেখবার অবকাশ রয়েছে। এই সুযোগে অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সংগঠন, ২০২৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ভিশন ২০৪১ অর্জনের বিষয়টিকে মাথায় রেখে দলে ত্যাগী নেতাদের গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদান করা হলে আওয়ামী লীগ উপকৃত হবে। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক দল যাদের নেতা-কর্মীর অভাব নেই। ফলে, সকলের একটিই প্রত্যাশা নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতারাই মনোনয়ন পান। মনে রাখতে হবে, অনুপ্রবেশকারীরা দলের নেতাকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে, কিন্তু কখনোই তারা নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করবে না। এই সত্যকে উপলব্ধি করে আসুন সকলে মিলে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সংগঠনের জন্য চিন্তা করি।
অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়