'কপ২৬' যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, স্কটল্যান্ডের সেই গ্লাসগো আমার কাছে স্মৃতির শহর। সত্তর দশকের শেষভাগে এখানে আমি সাময়িক আবাস গড়েছিলাম পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য; এখানকার স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটি থেকে। ঢাকার বাইরে গ্লাসগো তাই আমার কাছে সবসময়ই বিশেষ কিছু, নস্টালজিয়া জাগানিয়া জনপদ।
সত্তর দশকের শেষ ও আশির দশকের প্রথমভাগে এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় দেখা সেই শান্ত নিরিবিলি গ্লাসগো শহর অবশ্য এখন লোকজনের ভিড়ে গমগম করছে। জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, বিজ্ঞানী, আমলা, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিকদের পদচারণায় মুখরিত। বিপুল সংখ্যক মানুষের সাময়িক গন্তব্যে পরিণত গ্লাসগোতে এখন তাই আবাসিক হোটেল বা বাড়ি ভাড়া পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশ থেকে আমরাও অনেকে এসেছি। বিভিন্ন স্থানে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছি।
আমরা যেখানে রয়েছি, সেখান থেকে জলবায়ু সম্মেলনের মূল ভেন্যু ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে। মূল সম্মেলনস্থলে 'হাই লেভেল সেগমেন্ট' সোমবারই শুরু হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে যথার্থই বলেছেন যে, উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে হবে। বিশেষত প্রধান নিঃসরণকারী দেশগুলোকে তাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বা এনডিসি বাস্তবায়ন করতে হবে।
মুশকিল হলো, যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে তারা খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না। এটা ঠিক যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান বদলেছে। নতুন প্রেসিডেন্ট জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। প্রায় এক মেরু বিশ্বের মোড়ল দেশের এমন অবস্থানে আরও কিছু শক্তিশালী দেশও নিজেদের অবস্থান পাল্টাচ্ছে।
তাদের দেশের জনসাধারণের চাপও এক্ষেত্রে কাজ করছে। কারণ তারা চোখের সামনে দেখছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখনই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে যে দেশগুলো, সেই চীন, ভারত ও রাশিয়া তাদের অবস্থান খুব একটা বদলেছে বলা যাবে না।
রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের যে সভায়, সেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত। আমরা অনেকে সভাকক্ষের বাইরে বড় বড় পর্দায় সরাসরি ভেতরের কার্যক্রম দেখেছি। সেখানে উপস্থিত অনেকের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাদের হতাশ করেছে। ভারতের মতো বৃহৎ ও গণতান্ত্রিক একটি দেশের কাছে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আরও দায়িত্বশীলতা আশা করেছিলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য আরও সময় চেয়েছেন। বলেছেন, ২০৭০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। কিন্তু ততদিনের বৈশ্বিক উষ্ণতা শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী সময় থেকে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। আমার আশঙ্কা, তিন ডিগ্রিও বাড়তে পারে।
আশার কথা গোটা বিশ্ব থেকে তরুণরা এসেছে এবং খুবই শক্তিশালী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। কেবল গ্লাসগোতে নয়, গোটা বিশ্বেই এমন প্রতিবাদ হচ্ছে। এতে করে নিশ্চয়ই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্যারিস চুক্তির যথার্থ বাস্তবায়নে বিশ্ব এগিয়ে যাবে।
স্মৃতির শহর গ্লাসগোতে এসে আমি আরেকটি সম্ভাবনার হাতছানি দেখতে পাচ্ছি। গত কয়েকটি কপে যে ঝিমিয়ে পড়া পরিস্থিতি ছিল, সেখান থেকে সবাই যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস চুক্তিতে ফিরে আসা সবাইকে আশাবাদী করে তুলেছে। সবুজ জলবায়ু তহবিলের বাস্তবায়নের প্রশ্নেও ঐকমত্য বেড়েছে।
হাইলেভেল সেগমেন্টের পর মূল আলোচনা আজ বুধবার শুরু হচ্ছে। পর্দার অন্তরালে আরও আগে থেকেই আলোচনা ও দরকষাকষি চলছিল। ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আলোচনা চলবে। শেষের দুই-তিন দিনে গিয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে থাকবে।
গোটা বিশ্বের পরিবেশকর্মী, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতো আমিও আশাবাদী। মানবজাতি এই বৈশ্বিক দুর্যোগের অভিঘাত মোকাবিলায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এখনই বিশ্বজুড়ে স্পষ্ট হওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিবেচনা করলে এর বিকল্পও নেই।
লেখক :পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : সম্ভাবনার হাতছানি

মন্তব্য করুন