স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়ে বিশ্বকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় অঙ্গীকারে একীভূত হয়েছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতি ও ধ্বংস কাটিয়ে ওঠার জন্য ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া না গেলেও মিলেছে প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে বাংলাদেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে দেরিতে হলেও সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে বন ধ্বংস বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন অঙ্গীকার পূরণে গুরুত্ব দিতে হবে বাংলাদেশকে।

কপ২৬ সম্মেলনে বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশ থেকে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, গবেষক, পরিবেশকর্মী,  সাংবাদিকসহ ২৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা শেষে গ্লাসগো ক্লাইমেট প্যাক্ট হয়েছে।

এ সম্মেলন থেকে যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বন নিধন বন্ধের চুক্তি, মিথেন গ্যাসের বৈশ্বিক উৎপাদন হ্রাসের অঙ্গীকার, ক্রমান্বয়ে কয়লার ব্যবহার হ্রাস এবং ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি)। এগুলোর সবই ঐচ্ছিক হলেও এসব অঙ্গীকারের ফলে কিছু দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এসব অঙ্গীকারের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছে।

কপ২৬ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ কী পেল, তার চেয়ে বড় বিষয় বাংলাদেশ কী কী অঙ্গীকার করেছে। বন উজাড় বন্ধ করা এবং জলবায়ু সহনশীলতার মধ্য দিয়ে ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার চুক্তিসহ বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য অর্থায়ন প্রাপ্তিতেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়েছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থ তহবিল বরাদ্দ এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সম্মেলনে তুলে ধরেন। তিনি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে 'ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি)' নির্ধারণ, ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নেতৃত্বে জলবায়ু তহবিলের ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হয়েছে বলে জানিয়েছে তহবিল গঠনে নেতৃত্বে থাকা দেশগুলো।

এ বছর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ৯ বছরের মধ্যে বন নিধন বন্ধের অঙ্গীকার করেছে কানাডা, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোসহ ১১০টির ও বেশি দেশ। পৃথিবীর মোট বনভূমির প্রায় ৮৫ শতাংশই এসব দেশে রয়েছে। ফলে আশা করা যায়, এই চুক্তিটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এই চুক্তিতে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশও।

এ ছাড়া বনভূমি ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য মিলিয়ে ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ডের একটি তহবিলও এই চুক্তির আওতায় গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ১২টি রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এই তহবিলটি গঠন করা হয়েছে, যার বেশিরভাগ অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে গৃহীত। এ ছাড়া গঠিত তহবিলের অর্থ উন্নয়নশীল দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি উদ্ধার, দাবানল মোকাবিলা ও আদিবাসী সম্প্রদায়কে সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। খুশির সংবাদ হলো, সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্ব, ভয়াবহতা বুঝতে এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ স্বাক্ষর করে এবং তাতে কার্বন নির্গমন হ্রাস করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রির নিচে রাখা যায়। দুর্ভাগ্যবশত এটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করেনি এবং বিশ্ব নেতারা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্য আবার সমবেত হন কপ২৬-এ। ফলে গ্লাসগোতে যে প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হোক না কেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত কপ২৬ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোকে অর্জন হিসেবে নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অঙ্গীকার পূরণ করে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।

লেখক: জলবায়ু সম্মেলন গল্গাসগোতে অবস্থানরত স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক