আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি, তাদের শৈশবের বিনোদন মিটিয়েছে সাদা-কালো টেলিভিশনে। ওই সময় টেলিভিশনের অনুষ্ঠানসূচিতে নাটক-ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান থাকলেও সাপ্তাহিক প্রচারিত চলচ্চিত্রগুলো ছিল আমাদের মূল আকর্ষণ। যেসব সিনেমায় মারধরের দৃশ্য বেশি থাকত, সেগুলোই আমাদের চোখে ছিল সেরা সিনেমা। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা কম হতো না। তবে আমাদের সিনেমা দেখার গণ্ডি ছিল ঢাকার চলচ্চিত্রগুলো।

এর বাইরে আরও যে সিনেমার জগৎ আছে তা ছেলেবেলায় কখনোই মাথায় আসেনি। তবে মাঝেমধ্যে টেলিভিশনের অ্যান্টেনা বাতাসে ঘুরিয়ে গেলে পশ্চিমবঙ্গের সেই পুরোনো সিনেমাগুলো চোখে পড়ত। আর আমাদের পাশে বসা বয়োজ্যেষ্ঠরা বলে উঠত এই যে মহানায়ক উত্তম কুমার, ওই যে সৌমিত্র বাবু কিংবা তুলসী চক্রবর্তীর নাম। তখনও এই অভিনেতাদের পূর্ণ সিনেমা দেখিনি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পশ্চিমবঙ্গের কিছু আধুনিক সিনেমা দেখা হলেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নায়ক বেশে সিনেমা তখনও আমার দেখা হয়নি। এই অভিনেতাকে শৈল্পিক সিনেমায় বাবার ভূমিকায় বেশি চোখে পড়েছে।

তবে দেশত্যাগের পর ফেলে আসা শৈশবকে খুঁজতে বছর সাতেক আগে ওল্ড বেঙ্গলি মুভি ইউটিউবে সার্চ দিয়ে 'পথের পাঁচালী'র হাত ধরে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এরপর সত্যজিতের দেড় কুড়ি সিনেমা লিস্ট ধরে ধরে সাপ্তাহিক অবসর সময়ে দেখা শুরু করলাম। এসব সিনেমা দেখতে গিয়ে আবিস্কার করলাম সেই সৌমিত্র বাবুকে অপুর সংসারে। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া 'অপুর সংসার' সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাবলীল অভিনয় দেখার পর মনে হয়েছে, আমি সদ্য সিনেমা দেখা শুরু করেছি।

সত্যজিৎ রায়ের স্কেচে ধরা পড়া 'তিন কন্যা'য় অপর্ণা সেনদের হাতে হাত ধরে এগিয়ে চলা সৌমিত্র বাবু যেন নিমেষে বাংলা সিনেমায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব মেলে ধরতে 'অভিযানে' নেমে পড়লেন। বাংলা সিনেমায় সর্বকালের সেরা প্রভাবশালী পরিচালকের হাত ধরেই অভিযান শেষে আমরা সৌমিত্র বাবুকে পেয়েছি 'অরণ্যের দিনরাত্রি'তে। বন্ধুদের নিয়ে যাযাবরের মতো বেড়িয়ে পড়া, গহিন অরণ্যে ভ্রমণপিপাসুদের সুড়সুড়ি দেওয়া সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কেবল প্রাঞ্জল দ্রাঘিমায় নয়, সেই সঙ্গে 'চারুলতায়' প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠে কাপুরুষতা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। মাধবী মুখার্জির বিপরীতে সৌমিত্র যেন হাজারো প্রেমিকের অনুপ্রেরণা হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।

অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। জলসাঘরে শুটিং দেখতে আসা কৈশোরের সেই সৌমিত্রকে আমরা পেয়েছিলাম ফেলুদারূপে। 'সোনার কেলল্গা' এবং 'জয় বাবা ফেলুনাথ' হিসেবে আমরা এখনও সৌমিত্রের ভেতর সত্যিজিৎ রায়কে খুঁজি। বাংলা সিনেমা জগতের তিন স্তম্ভ সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা- সৌমিত্র এই তিন মহিরুহের সিনেমায় দাপট দেখিয়ে থিয়েটারে কেবল দর্শকদেরই আনেননি, তৈরি করেছেন বাংলা সিনেমার প্রতি ভালোবাসা।

দীনেন গুপ্তর 'বসন্ত বিলাপ'-এ সৌমিত্র বাবুর কমেডি যেমন দর্শক দেখেছে, তেমনি উদয়ন পণ্ডিত বেশে 'আতঙ্ক'-এর মাস্টারমশাই-বা কম কীসে। দুর্নীতি আর ঘুণে ধরা সমাজের সংস্কার করতে 'গণশত্রু' থেকে 'শাখা-প্রশাখা' তার বিচরণ আমাদের কেবল প্রতিবাদী হওয়ার প্রেরণাই দেয়নি, 'ঘরে বাইরে' ফিরে 'গণদেবতা'-র দেবু পণ্ডিত হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটেছিল বেশ অনায়াসে। চলচ্চিত্রের বাইরে বাস্তবেও এই তো কয়েক বছর আগে ভারতে যখন ধর্মীয় ছুতোয় মানুষ মারা হচ্ছিল তখন পশ্চিমবঙ্গে যে কয়েকজনের মেরুদণ্ড আমরা দেখতে পেয়েছিলাম তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

'অশনি সংকেত'-এ বাংলার দুর্ভিক্ষকে ছাপিয়ে ঢাকাইয়া কন্যা ববিতার যেমন আদর্শিক স্বামী হিসেবে নন্দিত হয়েছিলেন, তেমনি 'মাল্যদান', 'খুঁজে বেড়াই', কিংবা 'স্ত্রী'র হাত ধরে সৌমিত্রকে আমরা অভিনয় শিল্পের অন্য মেরুতে দেখতে পেয়েছি।

সিনেমার বাইরে সৌমিত্র বাবুর যে বিষয়টি আমাকে বেশি টানে তা ছিল, তার আবৃত্তিক কণ্ঠ। কবিতা আবৃত্তি শুনে যেন শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। অন্যের কবিতার আবৃত্তির বাইরেও তিনি সিনেমার নায়ক থেকে হয়ে উঠেছিলেন একজন কবি। তা আমরা তার লেখা কবিতা 'পূর্ব মৌসুমী', 'সহচরী', 'উৎসর্গ' ও 'রাত্রিশেষে' দেখতে পেয়েছি। যদিও মঞ্চে তার আধিপত্য ছিল বলে জেনেছিলাম, তবে যদি সুযোগ থাকত তাহলে সামনে বসে 'টিকটিকি', 'নাম জীবন', 'রাজকুমার', 'ফেরা', 'নীলকণ্ঠ', 'ঘটকবিদায়', 'ন্যায়মূর্তি' দেখতে ভুল করতাম না।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করা সৌমিত্র বাবু সত্যি একজন আপাদমস্তক বাঙালি যেন 'কাচকাটা হিরে'। উত্তম কুমার যদি বাংলা সিনেমায় মহানায়ক হয়, তবে সিনেমার রাজপুত্র হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দর্শকরা বছরের পর বছর মনে রাখবে।

আজ এই জনপ্রিয় নায়কের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর তিনি দূর আকাশে শুভ্র মেঘমালায় বসতি গেড়েছেন। প্রয়াণ দিবসে এই মহিরুহের প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমরা এই দিনে তাকে স্মরণ করছি, তিনি আমার মতো কোটি মানুষের অন্তরে অপু কিংবা সাহসের 'উদয়ন পণ্ডিত' হিসেবে থাকবেন যুগের পর যুগ।