আমরা বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে। একাত্তরে বাঙালি যে রক্তগঙ্গা পেরিয়ে এই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল, সেই বাংলাদেশ পঞ্চাশ বছরে নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে আজ উপনীত হয়েছে নতুন অধ্যায়ে। বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্নেনারি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমরা জানি, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। বাংলাদেশের পাশাপাশি লাওস ও নেপালের ক্ষেত্রেও একই সুপারিশ করা হয়েছে। এই তিনটি দেশই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে সময় পাচ্ছে পাঁচ বছর। সাধারণত এই প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়া হয় তিন বছর। করোনার কারণে অর্থনীতিসহ নানা খাতে অভিঘাত লাগায় দেওয়া হলো বাড়তি সময়। এই বাড়তি সময় আমাদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হবে বলে মনে করি।

একই সঙ্গে আমাদের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জও। রপ্তানির ক্ষেত্রে মিলবে না বাড়তি সুবিধা। ঋণ পাওয়া যাবে না কম সুদে। আমাদের নজর আরও বাড়াতে হবে সুশাসন নিশ্চিত করতে। এটা সত্য, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পথ নিস্কণ্টক হলো। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসব। উন্নয়নশীল দেশের কাতারভুক্ত হবো। এ জন্য সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেসব মোকাবিলা করার জন্য করণীয় আছে অনেক কিছু। প্রস্তুতি নিতে হবে সেই নিরিখেই। বিশেষ প্রেক্ষাপটে তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর এই দুই বছর বাড়তি সময় অর্থাৎ পুরো সময়টা ধরেই আমাদের পরিকল্পিত ছক কষে এগোতে হবে। সরকার, রপ্তানিকারক এবং আরও অনেককেই পালন করতে হবে যথাযথ ভূমিকা। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জন করা। এখন অধিকতর নজর দেওয়া জরুরি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিত করার দিকে। এ ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি আছে। এ জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি নির্মূল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, সহজে সেবা প্রাপ্তির পথ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।

এ কথা অমূলক নয়, অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের উচ্ছ্বাস, ভাবাবেগ, অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি অনুপাতে উদ্যোগ তুলনামূলক কম। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে আমরা নানাদিক থেকেই আছি ভালো অবস্থানে। কিন্তু এটুকুতেই স্বস্তি খুঁজলে কিংবা থেমে থাকলে হবে মারাত্মক ভুল। আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। আমাদের সমস্যাগুলো অচিহ্নিত নয়। সামাজিক, রাজনৈতিক সমস্যার বিরূপ প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে এবং পড়েছিলও। এটাই স্বাভাবিক। এমন নজির আমাদের সামনে আছে। যেমন ধরা যাক, আমাদের লক্ষ্য পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা। কিন্তু মাঝপথে উঠে বাকিটুকুর জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সেক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে লক্ষ্য থেকে যাবে অনার্জিত। তাই সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে সমন্বয়ের ঘাটতির কথা অহরহ শোনা যায় এবং বাস্তবে আমরা এর নেতিবাচক প্রতিফলও দেখছি। তাই সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। মানবসম্পদের উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা, জনঅধিকারের পথ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মসৃণ করার মতো জরুরি বিষয়গুলোর দিকে বাড়তি নজর খুব প্রয়োজন। আমাদের প্রতিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং একই সঙ্গে গতিশীলতা বাড়ানোরও বিকল্প নেই। আমাদের অভিজ্ঞতা এসব ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই নয় প্রীতিকর।


আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের ব্যাপক কাজ করতে হবে। ব্যাংক খাতের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনাসহ যেসব খাত ঘিরে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ, সেসব দিকে সরকারকে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দৃষ্টি দিতে হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা দূর করতে কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্বের অনেক দেশই কিন্তু সামনে এগিয়েও আবার পেছনে চলে গেছে। আবার অনেকেই পেছন থেকে সামনে এসেছে। এই উদাহরণ আমাদের সামনে থাকুক। আমি মনে করি, একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের শুধু অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে তাকিয়ে না থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকতর দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এসব খাত ঘিরে জনঅসন্তোষ আছে। আমাদের সামনে এর অনেক নেতিবাচক দৃষ্টান্তও আছে। এসব ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উপনীত হতে করণীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে উদাসীন থাকার কোনো অবকাশ নেই। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সমভাবেই জরুরি। অর্থাৎ চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে প্রস্তুতি যেমন নিতে হবে, তেমনি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নেও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। আমাদের নীতিনির্ধারকদের জানা আছে সব কিছুই কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিকল্পনা, অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির মধ্যেই বিষয়গুলো আটকে আছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা জবাবদিহির মতো করণীয় জরুরি বিষয়গুলোর ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে অধিকতর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়েও তা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিকসহ বেশ কিছু জরুরি খাত আছে, যেগুলোর সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। ভালো ফল পেতে হলে অবশ্যই ব্যবস্থাপনা ভালো করতে হবে। অব্যবস্থাপনা যদি বিরাজ করে, তাহলে সুফলের আশা দুরাশা বৈ কিছু হবে না। অঙ্গীকার হোক দেশ-জাতির কল্যাণের বিষয়গুলো সামনে রেখে, রাজনৈতিক স্বার্থ সামনে রেখে নয়।
রাজনীতি অবশ্যই দরকার। রাজনীতিবিহীন সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো। কিন্তু সেই রাজনীতি হতে হবে দেশ-জাতির কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অবশ্যই এক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সবার অধিকারের মাঠ সমতল করতে না পারলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের যেসব কথা বলা হয়, তা কার্যকর করা কঠিন। আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি কৃষি খাত। সংবাদমাধ্যমে কৃষকের বঞ্চনার নানা চিত্র প্রায়ই উঠে আসে। কৃষকের দুর্দশা যদি দূর করা না যায়, তাহলে কৃষির আরও বিকাশের যেসব কথা শোনা যায়, তা বাস্তবায়ন করাও কঠিন হবে। কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান, তা নিশ্চিত করার দায় সরকারেরই। আমাদের এও মনে রাখতে হবে, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে না পারলে আমাদের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের পরিসর বাড়ানোর জোরদার উদ্যোগ নেওয়াও সময়ের দাবি।

গবেষণা বাড়াতে হবে বেসরকারি খাতেও। অর্থাৎ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে যেসব লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করে সামনে এগোতে হবে, সেক্ষেত্রে ঘাটতি রাখা যাবে না। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার সুবিধা তো রয়েছেই। যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের মূল্যায়নও হবে সেভাবেই। আমাদের উদীয়মান অর্থনীতিতে বড় বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ছেই। এই বার্তাগুলো বিশ্বের দেশে দেশে পৌঁছবে। আমরা জানি, এলডিসি থেকে উত্তরণের অন্যতম শর্ত হলো, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া। আমরা তা পেয়েছি বটে কিন্তু এখন তা শুধু ধরে রাখাই নয়, আরও মজবুত অবস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, লক্ষ্য হতে হবে সেটিই। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সব প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার নিরসন করার পাশাপাশি যেসব খাত আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখছে, সেগুলোর প্রতি আরও যত্নবান হওয়া দরকার। জীবনযাত্রার সার্বিক মানোন্নয়নে মনোযোগ আরও বাড়ানোও জরুরি। আরও মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতির আরেক শক্তি সঞ্চারক। করোনা দুর্যোগে আমাদের অনেক প্রবাসী কর্মী দেশে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। পুনরায় তাদের যাওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে নেতিবাচক চিত্র। প্রবাসী কর্মীদের সমস্যার দিকে দেশের স্বার্থেই দৃষ্টি গভীর করতে হবে। নতুন নতুন শ্রমবাজার খোঁজা ও প্রবাসীদের দিকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করাও জরুরি। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনায়ও নজর বাড়াতে হবে।

সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক