রাজস্ব আদায়ের জন্য দেশের নাগরিক ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর আরোপ করে থাকে সরকার। এই রাজস্বের অর্থ পরবর্তীতে বাজেটের চাহিদা, যেমন: সরকারি, জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কাজের ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য দেশের সরকারের মতো এটি বাংলাদেশ সরকারেরও আয়ের অন্যতম উৎস। করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদায়কৃত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের পরিমাণ ছিল ২,৫৯,৮৮১.৮০ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে আয়কর, করপোরেট কর, সম্পদ কর, উপহার কর, ভ্রমণ কর ইত্যাদি মিলে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ছিল ৮৫,২২৪.১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে আবগারি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), টার্নওভার কর, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর, কাস্টমস ডিউটি (সিডি), রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) ইত্যাদি পরোক্ষ করই এখনও বাংলাদেশের মূল আয়ের উৎস। ২০২০-২১ অর্থবছরে পরোক্ষ করের এসব খাত থেকে ১,৭৪,৬৫৭.৬৩ কোটি টাকা আয় হয়। এসব কর প্রধানত আমদানিকারক, প্রস্তুতকারক, সরবরাহকারী, সেবাদাতা ও ব্যবসায়ীর ওপর ধার্য করা হয়, যারা পরবর্তীতে তা ভোক্তা বা সেবাগ্রহীতাদের প্রতি হস্তান্তর করে। চূড়ান্তভাবে ভোক্তাই করের মোট ভার বহন করে থাকে। সুতরাং, জনগণের ওপর এর একটা সরাসরি প্রভাব আছে।

একটি দেশের অর্থনীতির জন্য কর আদায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এই কর যৌক্তিক, সময়োপযোগী, ব্যবসাবান্ধব ও জনগণের অনুকূল হওয়া জরুরি। কোনো দেশে করের হার বেশি হলে তা শিল্প ও ব্যবসায়ের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দিতে পারে। কভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা বিবেচনা করে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু পরিস্থিতি ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পরোক্ষ করের নীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বেভারেজ শিল্পের মতো ভোক্তাকেন্দ্রিক ব্যবসাগুলোকে পরোক্ষ কর দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাতে এ শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষত স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক দিতে হচ্ছে, যা বেশ অসুবিধাজনক। কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে দেওয়া মূসক মওকুফের সুবিধা বাতিল করে এবং ৮২ লাখ আয়কর নিবন্ধিত সচ্ছল ব্যক্তিকে আয়করের আওতায় এনে কর ভিত্তি সম্প্রসারণ করা যায় এবং এই বোঝা কমিয়ে আনা যায়।

বর্তমানে বেভারেজ শিল্প কার্বনেটেড সফট ড্রিংকসের জন্য মোট ৪৩.৭৫% (২৫% সম্পূরক শুল্ক ও ১৫% মূসক) হারে এবং এনার্জি ড্রিংকসের জন্য মোট ৫৫.২৫% (৩৫% সম্পূরক শুল্ক ও ১৫% মূসক) হারে স্থানীয় পর্যায়ে পরোক্ষ কর পরিশোধ করছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং প্রতিবেশী দেশ যেমন: ভারত ৪০%, নেপাল ৩৮.৪৩%, ভুটান ৩০% ও মালদ্বীপ ৬% এর তুলনায়ও বেশি।

বহুজাতিক কোম্পানি, স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খাদ্য ও পানীয় শিল্পে দেশীয় কর কমানোর জন্য বহুদিন ধরে বলে আসছে। মিষ্টান্ন, বিস্কুট, কেক, চকলেট, দই, বোরহানি, মাঠা, এমনকি উন্নত বিদেশি ফাইভস্টার রেস্তোরাঁ ও হোটেলের খাবারও সম্পূরক শুল্কের আওতাভুক্ত নয়। এসব পণ্যের সঙ্গে কার্বনেটেড সফট ড্রিংকসের একটি সুষম প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেভারেজ শিল্প যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে স্থানীয় পরোক্ষ করের ক্ষেত্রে ১০৭১.৭৭ কোটি টাকা রাজস্ব পরিশোধ করা এই খাত প্রধান ১০টি খাতের মধ্যে একটি। বেভারেজ শিল্পের গত ১০ বছরের রাজস্ব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেভারেজের ওপর বর্তমানে ধার্য করা উচ্চ হারের সম্পূরক শুল্ক থেকে বাংলাদেশ সরকারও কোনোভাবে লাভবান হচ্ছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক ও মূসক মিলিয়ে এই রাজস্ব ছিল ১৫৮.০৫ কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ৬২৫.৬৭ কোটি এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৭৩৩.৭৫ কোটি। প্রথম পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল চার গুণ বেশি, যা পরবর্তী পাঁচ বছরে ছিল ১.১৭ গুণ বেশি। এমনকি নতুন তিনটি বড় শিল্প এই খাতে যুক্ত হওয়ার পরও ২০১৪ সালে সম্পূরক শুল্ক হার বাড়ানোর পর থেকে বেভারেজ শিল্পের প্রবৃদ্ধি একদম কমে গেছে। এর ফলে কোনো কোম্পানি আর এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না।

২০২০ সালে মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষত ভোক্তাকেন্দ্রিক ব্যবসাগুলো তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রবল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের সীমিত বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা। এর কারণে রাজস্ব আদায় করা, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে তাদের নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তাদের প্রবৃদ্ধি, এমনকি টিকে থাকাই কষ্টকর হবে। বর্তমানে দেশে বেকার তরুণের সংখ্যা চার কোটির বেশি। এমন সময় বেভারেজ শিল্পের মতো বড় কোম্পানিগুলো ক্রমাগত ক্ষতির মুখোমুখি হতে থাকলে দেশের বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার অনেক বড় আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট প্রভাব পড়বে। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, কর নীতি ও পদ্ধতিতে কোনো যৌক্তিক পরিবর্তন না আনা হলে দেশের বেভারেজ শিল্পের ভবিষ্যৎ বিরাট হুমকির মুখে পড়বে। অনুপযুক্ত কর নীতি ও পদ্ধতির কারণে বেভারেজ শিল্পের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী, যা শোধরানো জরুরি।

যে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, সেগুলোর অনুকূলে কর নীতি ও পদ্ধতিতে ইতিবাচক সংশোধনী আনার সময় এখনই। এই কঠিন সময়ে একটি স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তীকালীন কর নীতি ও পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে করের ভারকে একটি সহনীয় মাত্রায় রাখা প্রয়োজন। করোনা মহামারি ইতোমধ্যে আমাদের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ এখনই নেওয়া উচিত। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কার্বনেটেড সফট ড্রিংকসের স্থানীয় পর্যায়ে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে আনার জন্য সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন এই প্রত্যাশা। তাতে কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম আবার শুরু করতে পারবে এবং একই সঙ্গে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে। কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফা এই খাতে ব্যবসার প্রসারে বিনিয়োগ করবে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে, সরকারের রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এ ছাড়া এ ধরনের একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে দেশে বিদ্যমান শিল্পকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করা যাবে। এর ফলে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।