বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কৃতির একটা কালো দিক হচ্ছে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে কথায় কথায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা। অনেক দিন ধরে চলে আসা এই অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশও অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে কেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এগোবে না! স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ড আমাদের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, পাবলিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির কারণে অনিশ্চিত শিক্ষার পরিবেশ। এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী, দুর্ভোগে পড়ছে তাদের পরিবার এবং পিছিয়ে যাচ্ছে গোটা জাতি।

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় রয়েছে। দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি আওয়ামী লীগের কাছে। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগেরই অঙ্গ সংগঠন। এমতাবস্থায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে কেন অনির্দিষ্টকালের জন্য কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেল? একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন হঠাৎ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন শিক্ষার্থীর অধ্যয়নের ধারাবাহিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। দীর্ঘায়িত হয় একজন ছাত্রের শিক্ষাজীবন। চাকরিতে ঢোকার বয়সও অনেক সময় অনেকের শেষ হয়ে যায়। সন্তানের শিক্ষার পেছনে পরিবারের খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ, জাতি এবং অর্থনীতি। অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ বা গোলযোগ সৃষ্টিকারী সবাইকে দল-মত নির্বিশেষে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। ভবিষ্যতে তাহলে কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ বা গোলযোগ সৃষ্টির সাহস পাবে না।

তবে দেশের স্বার্থে পাবলিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররা কতটুকু রাজনীতি করতে পারবে বা পারবে না, তা ভেবে দেখার একটা সময় এসেছে। সহজ অর্থে রাজনীতি বলতে বোঝায় রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তার আদর্শিক নীতিমালার সমষ্টি। এভাবে আমরা বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের প্রচলন দেখি এ বিশ্বে; যেমন- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি ধাঁচের শাসন ব্যবস্থা। সময় মানুষের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের জীবন হচ্ছে সময়ের একটা সমষ্টি মাত্র। একজন ছাত্র সাধারণত একটা সময় অতিক্রম করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে আসে। তাই ছাত্র রাজনীতির কারণে সৃষ্ট সংঘর্ষ বা গোলযোগের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কারও কাম্য হতে পারে না।

একটি আদর্শ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য— ১. শিক্ষা প্রদান ২. গবেষণা, ৩. বিদ্যমান জ্ঞানের উন্নয়ন সাধন এবং (৪) নতুন কোনো কিছুর উদ্ভাবন করা। এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত ধরে রাখা সম্ভব তখনই, যখন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালাবে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক গোলযোগকে আসুন না-বলি। হঠাৎ অনির্দিষ্টকালের জন্য উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয় তার প্রধান দয়িত্ব নিতে হবে ১. উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, ২. সরকারকে, ৩. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ৪. রাজনৈতিক দলগুলোকে। কঠোর হস্তে দমন করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো কি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে না? ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে না? উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির পরিবর্তে হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা আদায়ের রাজনীতি!

ইতোমধ্যে, করোনা অতিমারি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে। অনেকে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়েছে। অনেকে হারিয়েছে আপনজনকে এবং অনেকে শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতার সম্মুখীন। এখন যতটা পারা যায় এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। আগামীতে যেন আর কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক সংঘর্ষের বা গোলযোগের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। খুলে দেওয়া হোক বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীরা ফিরে আসুক তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে, শ্রেণিকক্ষে, ছাত্রাবাসে। আমরা বিজয়ী জাতি, আমরা অনেক কিছু পারি। আমরা এটাও নিশ্চিত করতে পারব, আমাদের পারতেই হবে। আমরা যেন প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতার কথ ভুলে না যাই।