ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র 'হিকিস বেঙ্গল গেজেট'। স্বল্পায়ু ইংরেজি সাপ্তাহিকটি ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রকাশিত। আমাদের গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে ভূখণ্ডে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেয় তার অন্তর্গত রংপুর জেলায় ১৮৪৭ সালে দেশের প্রথম ছাপাখানায় মুদ্রিত সাপ্তাহিক 'রঙ্গপুর বার্তা' প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। সেই আদিযুগে কলকাতার 'সমাচার দর্পণ', কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথের প্রথম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার 'গ্রাম বার্তা প্রকাশিকা' ইত্যাদি অনেক গল্পই আছে ইতিহাসের ঠাকুরমার ঝুলিতে। শ' খানেক বছর পেরিয়ে মুসলিমদের রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্মের পটভূমিতে ১৯৩৬-এ কলকাতায় প্রকাশিত হয় 'আজাদ', যেটা ১৯৪৭-এর পরে সেখান থেকে গুটিয়ে ঢাকায় এসে হয়ে যায় পূর্ব বাংলার রাজধানী থেকে প্রকাশিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ দৈনিক। তবে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে ৫০ বছরের বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর এক নজর তাকাতে ও ভবিষ্যতের কথা ভাবতে এত পুরোনো ইতিহাস উল্লেখের প্রয়োজন নেই, পরিসরও নেই।
পটভূমির ঐতিহ্য :পাকিস্তানের অংশ হিসেবে অধীনস্ত থাকার ২৫ বছর আমাদের সাংবাদিকতার গৌরবের যুগ। কালিঝুলি মাখা লেটার প্রেসে সিসার অক্ষর আর কাঠের ব্লকে ছবি ছাপানোর সে-যুগে আমাদের সংবাদপত্রের সে গৌরব শারীরিক জৌলুসে নয়, ছিল মনের উজ্জ্বল আলোয় ও মননের প্রবল শক্তিতে। এটাই সে-সময়ের বৈশিষ্ট্য। বিনিয়োগ করেননি বড় শিল্পপতিরা। দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের পকেটের পয়সায় কাগজ বের করার সূচনা। মওলানা ভাসানী, ইয়ার মোহাম্মদ খান ও তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিকরূপে শুরু করা ও ১৯৫৩-তে দৈনিক হওয়া 'ইত্তেফাক'-এর জন্য সম্পাদক মানিক মিয়ার অনুরোধে শেখ মুজিবুর রহমানকে (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা) কোর্টের বারান্দায় পিছে পিছে হেঁটে রাজনৈতিক নেতা ও ধনী আইনজীবী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে আনতে হয়েছে। এই ইত্তেফাক ১৯৭১ পর্যন্ত ছিল বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের পতাকার মতো। দৈনিক ইত্তেফাকের আগে 'দৈনিক সংবাদ'-এর আবির্ভাব ১৯৫১ সালে, খায়রুল কবিরের সম্পাদনায়। মুসলিম স্বরে আজাদ, জাতীয়তাবাদী স্বরে ইত্তেফাক ও সমাজতান্ত্রিক স্বরে সংবাদ প্রকাশিত হতো।
স্বরের উল্লেখ এ জন্য যে, রাজনৈতিক চিন্তাধারা সেকালে সংবাদপত্রে প্রচ্ছন্ন ছিল না। বর্তমানের মতো বস্তুনিষ্ঠ বা নিরপেক্ষ সংবাদপত্র প্রকাশের উচ্চকিত ঘোষণাও ছিল না। বস্তুনিষ্ঠ খবর প্রকাশের সততা ও সৎ চেষ্টা অবশ্যই লক্ষণীয় ছিল। তবে সম্পাদকীয় নীতিতে পুরো পাকিস্তান আমলে সংবাদপত্র লড়াই করেছে পাকিস্তানি শাসকদের সংবাদপত্র দলনের বিরুদ্ধে, গণবিরোধী সামরিক শাসন ও অত্যাচার-নির্যাতন, গণতন্ত্রের জন্য, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্য লেখালেখি দিয়ে। সাংবাদিকরা জেল-জুলুম সয়েছেন। এই তিনটি পত্রিকা বাঙালি জনগণের অধিকারের পক্ষে থেকেই নিজ নিজ রাজনৈতিক মতধারায় প্রচার চালিয়েছে চমৎকার বিতর্কের মাধ্যমে। সাংবাদিকতায় দেশপ্রেমের বিভায় সে যুগকে আমাদের সংবাদপত্রের স্বর্ণযুগ বলা যায়।
আরও উল্লেখযোগ্য দৈনিক ছিল আইনজীবী-রাজনীতিবিদ হামিদুল হক চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত ও আবদুস সালাম সম্পাদিত ইংরেজি 'পাকিস্তান অবজারভার' ও কলকাতা থেকে আসা 'মর্নিং নিউজ'। শেষোক্তটি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সমর্থক হয়ে জনরোষে পড়েছিল। আইয়ুবের প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রেস ট্রাস্টের কাগজ হয়েও 'দৈনিক পাকিস্তান' (মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিন থেকে 'দৈনিক বাংলা', ১৯৯৭-এ বিলুপ্ত) কয়েকজন সেরা সাংবাদিকের পরিচর্যায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
তখন রেডিও ও টেলিভিশন একটি করে প্রতিষ্ঠান ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ও সরকার নিয়ন্ত্রিত। ইন্টারনেট, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবই ভবিষ্যতের গর্ভে।
স্বাধীনতা ও ক্রান্তিকাল :একটি জাতির জন্য স্বাধীনতা অবশ্যই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। যে গণতন্ত্র, মুক্ত সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমরা দীর্ঘ সংগ্রাম ও একাত্তরে মরণপণ লড়াই করেছি, সেগুলো চর্চার সুযোগের সঙ্গে প্রাথমিক উদ্দীপনাও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু শুরুতেই আমরা কিছু দুর্ভাগ্যে পড়ি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সময় আর্থ-সামাজিক তীব্র সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক-সাংবিধানিক যে পরিবর্তন ঘটানো হয় তাতে সংবাদপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। চারটি সংবাদপত্র রেখে অন্য সবগুলোর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারনিয়ন্ত্রিত রেডিও-টিভি যথারূপে থাকে। এর ক'মাস পরেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনার বিপরীত মনোভাবাপন্ন সামরিক ও আধাসামরিক শাসনের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। এটা চলে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ও জনগণের দুর্বার আন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯৯০ সালে এরশাদের স্বৈরতন্ত্রের পতন পর্যন্ত। এই সময়কালে একদিকে আবার মুক্তভাবে নতুন নতুন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় বটে, তবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বেড়ে যায়। সংবাদপত্রের একাংশ সুবিধাবাদে গা ভাসায়। মূল ধারার প্রধান সংবাদপত্রগুলো সামরিক নিয়ন্ত্রণে সেন্সরশিপ বা কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে নানাভাবে আন্দোলন করে। স্বৈরশাসক কিছু সংবাদপত্র বন্ধ করেও দিয়েছিল। তবে সাংবাদিকতার ঐতিহ্যবাহী এই লড়াইয়ের অভ্যাস এ সময় থেকেই ঝিমিয়ে পড়তে থাকে।
আধুনিকতার আলো-আঁধার : দেশে সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পাঠক বৃদ্ধি, বৈচিত্র্য, বৈশ্বিক প্রসার প্রভৃতি সব দিক দিয়ে প্রকৃত আধুনিক যুগ বলা যায় ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু। রাজনৈতিকভাবে ১৯৯১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত নানা ঘটন-অঘটন ও সমালোচনা সত্ত্বেও টানা ৩০ বছর নির্বাচিত সরকারগুলোর দ্বারা গণতান্ত্রিক শাসন রয়েছে, যা আগের মতো সামরিক অভ্যুত্থান ও স্বৈরতন্ত্র দ্বারা বিঘ্নিত হয়নি, ২০০৬-০৮ দুই বছর সেনাসমর্থিত অস্থায়ী সরকার ছাড়া। এই পর্বে বড় ব্যবসায়ীরা সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগ করেছেন, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান হয়েছে, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি দ্রুতই ব্যবহারে এসেছে। ব্রিটিশ আমলে যা ছিলই না, পাকিস্তান আমলে খুব কম আর এই সময়ে প্রচুর, তা হলো অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ শাস্ত্র ও সাংবাদিকতা বিদ্যা হিসেবে পড়ানো। ঝাঁকে ঝাঁকে নবীন স্নাতক এসেছে সাংবাদিকতার শ্রমবাজারে।
১৯৯০ সালে নাঈমুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় 'আজকের কাগজ' পুরোনো ধারার বিপরীতে তথা রাজনৈতিক মতাদর্শের ছায়াতলের বাইরে মুক্ত সাংবাদিকতার অনুশীলন নিয়ে আসে। এই ধারায় মতিউর রহমান সম্পাদিত প্রথমে 'ভোরের কাগজ' কতকাংশে ও পরে 'প্রথম আলো' বিরাট আকারে সফল সংবাদমাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আরও বের হয় গোলাম সারওয়ারের সম্পাদনায় 'যুগান্তর' ও 'সমকাল', 'জনকণ্ঠ', 'কালের কণ্ঠ' প্রভৃতি এক গুচ্ছ দৈনিক।
এই বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি আরেকটি কাহিনি হচ্ছে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য সংবাদপত্রের উদ্ভব, যেগুলো মুক্তবাজারের স্বাভাবিক নিয়মে টিকে থাকার কথা নয়। গত সেপ্টেম্বরে সরকার প্রকাশিত তথ্যে শুধু ঢাকা মহানগরেই ৫০২টি দৈনিক ও ৩৪৮টি সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে। দেশের বাকি অংশে আছে ৭৭৭টি দৈনিক ও ৩৪৭টি সাপ্তাহিক। বিস্ময় জাগানিয়া পরিসংখ্যান!
পাকিস্তান আমলের একমাত্র টিভি চ্যানেল ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত 'পাকিস্তান টেলিভিশন' (পিটিভি) স্বাধীন বাংলাদেশে হয় 'বাংলাদেশ টেলিভিশন' (বিটিভি)। এই মনোপলি ১৯৯৭ সালে ভাঙে বেসরকারি চ্যানেলের আগমনে। প্রথম তিন বছরে 'এটিএন', 'চ্যানেল আই' এবং 'একুশে টিভি' দিয়ে শুরু করে এখন সংখ্যা ৪৫টি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের পর দেখা যায় বিনিয়োগ সক্ষমতা ও টিভি চালানোর পেশাদারিত্বের দিক না দেখে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স বণ্টন হয়। সে লাইসেন্স নানা অস্বচ্ছ কৌশলে হাতবদল হয়।
তরঙ্গ সম্প্রচারের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন এফএম রেডিওর সংখ্যা অনেক ও ক্রমবর্ধমান বলে কতগুলো তা বলা নিরর্থক। তেমনি কমিউনিটি রেডিও, যা পরিচালনার সরকারি নীতিমালাও তৈরি হয়েছে। তবে শেষোক্ত দুই ধরনের রেডিও প্রধানত বিনোদন ও উন্নয়নের কাজে ব্যবহূত।
সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে পুরোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন সংস্করণ, নতুন নতুন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে খবর প্রচারের এক অবিশ্বাস্য বিস্ম্ফোরণ। অনলাইন সংবাদ পোর্টাল সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে কুটির শিল্পের মতো ইতোমধ্যে কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল রয়েছে দেশে।
এই যে বিস্ম্ফোরণ, অর্থ, সুযোগ, প্রযুক্তি তথা শারীরিক জৌলুস, এর বিপরীতে সাংবাদিকতার গুণগত মান, মানসিক শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তার সন্ধান করলে বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। কেন এত পত্রিকা, টিভি, অনলাইন পোর্টাল? কী তাদের আর্থিক-বাণিজ্যিক অবস্থা?
সংবাদ প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপনের আয় প্রয়োজন। দেশে বিজ্ঞাপনের বাজার ছোট। বেসরকারি বিজ্ঞাপন কম। কয়েক বছর আগে এক সরকারি জরিপেই জানা গিয়েছিল যে অসংখ্য পত্রিকার কোনো অফিস নেই। গলিঘুপচির একই বাণিজ্যিক প্রেসে অনেক পত্রিকা ছাপা হয় সংখ্যায় নামমাত্র। তবে এই পত্রিকাগুলো সরকারি বিজ্ঞাপন পায়। সে জন্য সরকারি খাতায় সার্কুলেশন বহুগুণ বেশি দেখানো হয়। এ এক দুর্নীতি ও সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ। এই দুর্নীতির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভালো ও পেশাদার সংবাদ প্রতিষ্ঠান।
বড় বিনিয়োগের সংবাদ প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা ও বিভিন্ন সুবিধা বেড়েছে। সংবাদপত্র শিল্প হয়ে ওঠার ইঙ্গিতসহ এ এক সুখবর। তবে এতে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীর প্রতিষ্ঠানে মালিক ও সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। কিছু মালিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেন তার অন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনিয়মযুক্ত স্বার্থ রক্ষার জন্য। সেসব প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা সংবাদের পেশাদারি মান রক্ষা করতে সক্ষম হন না। এই মালিকরা তাদের অন্য শিল্পপণ্যের গুণগত মান ভালো করেন যাতে ক্রেতা পাওয়া যায়, কিন্তু বুঝতে চান না যে সংবাদের মান হচ্ছে তার বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। নির্বিচারে তারা নিজ সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশিত খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেন, খবর প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করেন। কারণ পাঠক পাওয়ার চেয়ে সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। তবে এতে সাংবাদিকদের পেশাগত সুনাম বিনষ্ট হচ্ছে এবং শেষবিচারে শিল্প ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকদের অনেকে এ পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, নেতৃস্থানীয় অনেকে স্বেচ্ছায় ওই শ্রেণির মালিককে সহযোগিতা করছেন।
পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকরা সরকারি দমননীতি ও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে অনেক সাহসী সংগ্রাম করেছেন। গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য স্বাধীন দেশে আবার লড়তে হবে, তেমন অশঙ্কা হয়তো আমরা করিনি। তবে ১৯৭৫-৯০ সময়কালে দুটি সামরিক শাসনামলে আবার আমাদের তা করতে হলো। তখন আমরা রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ অবলম্বন করেছি সংবাদমাধ্যমেও। ১৯৯১ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরে অবশ্যই এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। এখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, সংবাদমাধ্যমের মূল কাজ বা বস্তুনিষ্ঠ খবরের অর্থই হবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অন্যায়-অবিচারের তথ্য উদ্ঘাটন করে জনগণের কাছে তুলে ধরা। কিন্তু দলীয় পক্ষপাতিত্বে ও মালিক শ্রেণির চাপে সংবাদমাধ্যম সঠিকভাবে পালন করছে না। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ও ক্ষমতাসীন সরকার সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বাধীনতার তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হলে সংবাদমাধ্যম সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতাও হারাবে। গণতন্ত্রের যুগে সংবাদমাধ্যম সুশাসনের অভাব, আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রভৃতি যদি তুলে ধরে তাহলে গণতান্ত্রিক সরকারই লাভবান হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক যুগেই এসব বিষয়ে সরকারগুলোর অসহিষ্ণুতা প্রকট হয়ে উঠছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক প্রয়োগ নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে এবং সংবাদমাধ্যম ভয়ে সংযত থাকছে। আমরা যাকে গণতান্ত্রিক যুগ বলছি সেই ১৯৯১-পরবর্তী ৩০ বছরের ১৮ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, গত প্রায় ১৩ বছর একটানা। এই দলই ঐতিহাসিকভাবে এদেশে সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতা, মুক্তিযুদ্ধের নেতা। এই দল গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত ভূমিকা অনুধাবন করতে পারবে এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক নীতি নেবে- এটাই প্রত্যাশা।
আর সর্বোপরি সংবাদমাধ্যমের মূল সৈনিক যারা, সেই সাংবাদিকদেরই পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য বহন করে সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
সমকাল