এই জয়টি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ৫০ বছর আগে। আমি তখন ছোট, ক্রিকেট বুঝতে শিখেছি। তখন ওভালে পাকিস্তানের ইংল্যান্ড বিজয়ের গল্প শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এবার কেন যেন সেই অনুভূতি কাজ করছে।
কারণ, বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলকে তাদের মাঠে হারিয়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের টেস্টের পারফরম্যান্স দেখলে এই সিরিজ নিয়ে তেমন প্রত্যাশা ছিল না। টি২০ সংস্করণেও সম্প্রতি ভালো খেলছিল না। সেখানে সাকিব-তামিমকে ছাড়া খেলতে গেছে নিউজিল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ। আমি নিজেও কল্পনা করিনি তারা জিততে পারবে। পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলেই খুশি হতাম। মুমিনুলের নেতৃত্বে সেই দলই একপেশে ক্রিকেট খেলে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের এমন পারফরম্যান্স আগে কখনও দেখিনি।
টস জয় থেকে শেষ রানটি নেওয়া পর্যন্ত মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। মুমিনুল টস জিতে ফিল্ডিং নেন কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগাতে। তিনজন পেসার গত কয়েক মাস ছন্দে থাকায় হয়তো সতেজ উইকেটে ফিল্ডিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত। বোলাররা একটা জায়গা তৈরি করে দেওয়ার পর ব্যাটাররা যে সাড়ে চারশ রান করল, সেটা ছিল প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। লিড পাওয়ায় পরের ইনিংসে বোলারদের কাজ আরও সহজ হয়ে গেছে। চতুর্থ দিন পুরো ম্যাচের চেহারা পাল্টে দেয় এবাদতের দুটি স্পেল। যেটা ছিল দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট, যেখান থেকে নিউজিল্যান্ড আর বেরোতে পারেনি। ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর ম্যাচ চলে গেছে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। একে তো বাংলাদেশি বোলাররা খুবই ছন্দে ছিল। তার ওপর নিউজিল্যান্ড মাত্র পাঁচজন ব্যাটার নিয়ে খেলায় লোয়ার অর্ডারে স্কোর পায়নি। যে কারণে পঞ্চম দিন সকালে খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশি বোলাররা তাদের গুটিয়ে দিয়েছে। আসলে চতুর্থ দিনই লেখা হয়েছিল- এই ম্যাচ বাংলাদেশের। হারার কোনো কারণ নেই। বরং নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ বাঁচাতে হলে বড় রান করতে হতো বা বৃষ্টি হতে হতো।
মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের উইকেট অত্যন্ত ভালো ছিল। বাতাস থাকায় পেসাররা সেটাকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে। এখন ক্রাইস্টচার্চে কী হবে, সেটা পরের ব্যাপার। এ মুহূর্তে ঐতিহাসিক জয় উপভোগ করতে হবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে। আমার বিশ্বাস, পরের ম্যাচেও ভালো খেলবে এই তরুণরা। মূলত টপঅর্ডার ব্যাটাররা রান করায় কাজটি সহজ হয়ে গেছে। ওপরের তিনজন এবং মিডলঅর্ডারে একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করেছে। মিরাজ ও রাব্বির জুটিও ছিল কার্যকর। যেটা স্বাগতিক দলে ভয়ের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট এই ব্যাটারদের খুব প্রশংসা করেছেন। যেটা বড় প্রাপ্তি। পরের টেস্টে ভিন্ন কন্ডিশন থাকলেও এই জয় বাংলাদেশ দলকে ভালো খেলতে সাহস জোগাবে। যদিও চোটে পড়ায় জয় খেলতে পারবে না। তার জায়গায় যে আসবে, সেও নিশ্চয়ই ভালো খেলবে। সবচেয়ে বড় কথা, টিম ম্যানেজমেন্ট যে রোল দিয়েছিল, খেলোয়াড়রা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছে। তারা দল হিসেবে খেলেছে। এমন একটি জয়ের পর ক্রিকেটাররা কিন্তু বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখায়নি। কারণ, তারা এটা বুঝে গেছে ম্যাচ জেতাটাই তাদের কাজ। জিততে না পারি, হারব না। আমি মনে করি, এই তরুণ ক্রিকেটাররা একটা বার্তা দিতে পেরেছে, সুযোগ দিলে তারা পঞ্চপাণ্ডবের চেয়েও বড় কিছু করে দেখাবে। আমাদের ক্রিকেটের জন্য যেটা ভালো দিক।