২৫ মার্চ কাল রাতের বিভীষিকা আজও যাদের মনে আছে তারা নিশ্চয়ই বলবেন, সেদিন জাতির মানসিকতা যেমন ছিল, পরদিন ভোরে রাতের ঘটনার খবর নানাভাবে পেয়ে সে ভাবনা স্বভাবতই বদলে গিয়েছিল। 'বাঙালির হাতে ক্ষমতা দাও', 'বিজয়ী বঙ্গবন্ধুর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দিতে হবে', 'শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে বাধা দেওয়া চলবে না'- এমন স্লোগান নিমেষেই যেন জাতি ভুলে গিয়েছিল স্বল্প সময়ের জন্য। মনে উৎসুক জিজ্ঞাসা জাগিয়েছিল ওই রাতের নারকীয়তা কখনও কেউ কল্পনা করেনি। তাই বীভৎস খবর পাওয়ার আকস্মিকতা- কে কোথায় আছে, কেমন আছে, বেঁচে আছে তো, দেশে থাকা যাবে তো!

২৭ মার্চও ওভাবেই কাটল। ২৮ মার্চ বেতারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা শোনার পর মাথায় এলো তাই তো, বঙ্গবন্ধু তাহলে আছেন! সংবাদপত্রে নেই, টেলিভিশনে নেই, বেতারে খবর নেই- সে কী দুঃসহ পরিস্থিতি। জেলায় জেলায়, মহকুমা মহকুমায় ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে যায় ততক্ষণেই। ছাত্র-যুবকরা শুরু করে সশস্ত্র প্রতিরোধ।

বঙ্গবন্ধু কোথায়- উচ্চারিত হতে থাকল সর্বত্র। অকস্মাৎ জানা গেল, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। ২৬ মার্চ গভীর রাতে ৩২ নম্বর ধানমন্ডি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে সঙ্গোপনে আকাশপথে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তারও তো কোনো প্রমাণ মিলছে না। কোনো সংবাদমাধ্যমেও নেই সেই খবর। তাই গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি হলো সবার মনে, সকল বাঙালির প্রিয় নেতা, যাকে এবং যার হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগকে নিয়ে নানা গুজবের মুখে। না, গুজব নয়। শিগগির তা প্রচারিত হলো ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। একদিকে আতঙ্ক সবার মনকে গ্রাস করল। অপরদিকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনার দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার সুদৃঢ় শপথ।

বাংলাদেশ অবরুদ্ধ। সর্বত্র পাকিস্তানি মিলিটারি। তাদের ক্যাম্প, তাদের গাড়ি, তাদের অস্ত্রবাহী ট্রাক। কারা বাংলাদেশ চায়, কারা পাকিস্তান-বিরোধী মোটা দাগে তা তারা চূড়ান্তভাবে ঠিক করে নিয়েছে। যারা আওয়ামী লীগ করে তারা পাকিস্তান-বিরোধী, যারা হিন্দু তারাও সবাই পাকিস্তানের দুশমন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী। কিন্তু যারা বিহারি, যারা অবাঙালি তারা পাকিস্তানের দোস্ত, বাংলাদেশের খাস দুশমন। তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরে নিল বিহারিরা সবাই তাদের এক নম্বর মিত্র। আর কারা? যারা মুসলিম লীগ করত, যারা জামায়াতে ইসলামী করত- তারাও সবাই পাকিস্তানের পক্ষে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিপক্ষে। তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দোস্তালি গড়ে তুলল বিহারি, মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে। বলল, সব বাংলাদেশ সমর্থককে চিনিয়ে দাও। চিনিয়ে দাও তাদের বাড়িঘর। দোকানপাট, সোনা-দানা লুট করে আর তাদের মেয়ে, বিশেষ করে বিবাহিত-অবিবাহিত যুবতীদের আমাদের ক্যাম্পে দিয়ে যাও।

যে কথা, সেই কাজ। শুরু হয়ে গেল লুটপাট, নারীদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানের সেনাদের ক্যাম্পে তুলে দেওয়া হলো। মানুষ আতঙ্কিত। হিড়িক পড়ে গেল জীবন, মান-ইজ্জত রক্ষা করার জন্য। পড়ি কি মরি করে লাখে লাখে দেশত্যাগ। তারা ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে হয়ে পড়লেন শরণার্থী। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নির্দেশ দিলেন শরণার্থীদের পাশে সবাইকে দাঁড়াতে। গঠিত হলো শত শত ছোট-বড় শরণার্থী শিবির। তাঁবু খাটিয়ে তাদের আশ্রয় দেওয়া হলো, রেশন কার্ড দিয়ে তাদের বিনামূল্যে খাবার ও জ্বালানি এবং পরিধেয় বস্ত্রাদি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হলো।

আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের দলীয় ও সমর্থক যুবক-যুবতীদের রিক্রুট করে অস্ত্র প্রশিক্ষণে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ, ত্রিপুরা ও আসামের বিশাল সীমান্তজুড়ে অজস্র যুবশিবির গড়ে তোলা হলো। তাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের কাজে নিয়োজিত হয় ভারতের সেনাবাহিনী। ইন্দিরা গান্ধী তার আগেই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে জানালেন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠিত না হলে ভারত সরকারের পক্ষে অস্ত্র সরবরাহ বা আর বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যাবে না। গঠিত হলো তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম বাংলাদেশ সরকার। রাজধানী মুজিবনগর, যেখানে তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন। এই সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত করা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকায় তার অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ৭০-এর নির্বাচনে আসন না পাওয়ায় তাদের বাদ দিয়েই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু তারা দাবি তুলল, ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলকে তার অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তা না হলেও তারা তাজউদ্দীন আহমদের মন্ত্রিসভাকে সমর্থন দেবেন, মুক্তিযুদ্ধে তাদের সব শক্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করবেন। তিন দলই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। ভারত সরকার এবং ভারতের জনগণও সর্বাত্মক সহযোগিতা দিলেন। মন্ত্রিসভা থেকে ঘোষণা করা হলো একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তির লক্ষ্যে তারা সর্বশক্তি নিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। বিদেশি পত্রপত্রিকা, রেডিও টেলিভিশন- বিশেষ করে ভারতের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন এবং লন্ডন থেকে বিবিসি ব্যাপকভাবে প্রচার করল তাজউদ্দীন সাহেবের নেতৃত্বে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা গঠন ও শপথ গ্রহণের খবর।

ভারতের আকাশবাণী ও ইংল্যান্ডের বিবিসি প্রতিদিন অসংখ্য বুলেটিন প্রচার করা শুরু করে। ২৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ ও তার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত করে আনার শপথের নানা খবর। লাখে লাখে দেশত্যাগ, দেশের অভ্যন্তরে লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা, শান্তি কমিটি গঠন, আলবদর, আলশামস নামে সশস্ত্র সংগঠন গঠন, নারী অপহরণ ও পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা বাঙালি তরুণীদের যৌন নির্যাতনের বিস্তারিত খবর।

বিশ্বের মানুষ, যারাই গণতন্ত্রে ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সবাই বিস্ময়ে হতবাক এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত কারামুক্তির দাবি উত্থাপন করলেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য নানা দেশ থেকে প্রবাসী সরকারের কাছে আসতে লাগল। বেড়ে গেল যুদ্ধের তীব্রতা। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমগ্র সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে নৈতিক সহযোগিতা আসতে লাগল। অপরদিকে বাড়তে থাকে ভারত ও প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশ্বের গণতন্ত্র স্বাধীনতা ও প্রগতিশীল মানুষ বিভিন্ন দেশে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নানা অনুষ্ঠান ও তার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কর্মসূচি গ্রহণ করলেন। বিস্ময়কর সমর্থন পেলেন তারা। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। বিজয় হলো মুক্তিযুদ্ধের। বিজয় হলো বাঙালির।

এবার একটিই দাবি। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির গুজব ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসির রজ্জুতে ঝোলানো হবে- এই বার্তা পাকিস্তানপন্থিদের পক্ষ থেকে ছড়াতে লাগল। যদি তাই হয় তবে কী হবে বাংলাদেশের, বাঙালি জাতির! তাজউদ্দীন সাহেবের মন্ত্রিসভা ঢাকা এসে সরকার পরিচালনা শুরু করল। তারা দাবি তুললেন, এই মুহূর্তে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুক্তি দিতে বিলম্ব করছিল পাকিস্তান সরকার। ফলে অসহায়ত্ব বোধ সৃষ্টি হচ্ছিল কোটি কোটি সাধারণ বাঙালির মনে। এবার আরও বাড়ানো হলো কূটনৈতিক চাপ। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ইন্দিরা গান্ধী ও লিওনিদ ব্রেজনেভ কূটনৈতিক সূত্রে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন। অবশেষে মুক্তি পেলেন বঙ্গবন্ধু। লন্ডন-দিল্লি হয়ে বিমানে ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করলেন তিনি। চতুর্দিকে আনন্দের বন্যা। কোটি মানুষ বিমানবন্দরে সংবর্ধনা জানালেন তাদের প্রিয় নেতাকে। প্রথম আলিঙ্গন করলেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ ইতিহাসের অনন্য অধ্যয় হয়ে আছে বিশ্ববাসীর সামনে।