চারদিকে বিজয়ের বার্তা। এরই মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয়ের এমন ক্ষণে স্বজনসহ সর্বস্ব হারানোর গল্গানি যেমন বাঙালিকে কষ্টে বিদ্ধ করছিল, তেমনই ছিল বিজয় অর্জনের উলল্গাসও! তবে স্বাধীনতার মহানায়কবিহীন মুক্ত বাঙলায় বিজয় পূর্ণতা পায়নি, যা উঠে আসে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কথায়। ওই দিন কলকাতায় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, '... বঙ্গবন্ধুর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত বিজয় অর্জিত হবে না।'

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন সেই মহানায়ক; যার হৃদয়জুড়ে ছিল এদেশের মানুষ আর তাদের অধিকার আদায়ের কথা। বিজয় অর্জনের পর বৈশ্বিক চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। দেশে ফিরেই ভঙ্গুর অর্থনীতির বাংলাদেশকে গড়ে তোলায় হাত দেন জাতির পিতা।

মুক্ত স্বদেশে ফিরে তিনি বলেছিলেন, 'বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে- এই আমার সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এ কথা চিন্তা করেই মরতে পারি- এই আশীর্বাদ, এই দোয়া আপনারা আমাকে করবেন।' ওই দিন বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাঙালির স্বাধীনতার এই মহান স্থপতি। তাদের উদ্দেশে নাতিদীর্ঘ ভাষণে জাতিকে তিনি দিকনির্দেশনা দেন। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি পেয়ে রক্তস্নাত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পূর্ণতা পায়। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে 'অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা' হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা বাঙালির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। বাঙালি যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। তাকে পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার ঘরে বন্দি রাখা হয়েছিল। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে নেওয়া হয় কারাগার থেকে দূরে আরও দুর্গম জায়গায়। ২৪ ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে তাকে রাওয়ালপিণ্ডির অদূরে শিহালা পুলিশ একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তার ওপর। বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লন্ডন হয়ে ১০ জানুয়ারির পড়ন্ত বিকেলে ঢাকায় ফিরলেন রাজনীতির এই মহানায়ক।

দেশে ফেরার এক দিন পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করলেন। হাত দিলেন ভঙ্গুর অর্থনীতির সদ্য জন্ম নেওয়া দেশটির পুনর্গঠনে। এক কোটি ছিন্নমূল শরণার্থী ভারত থেকে দেশে ফিরছে। চারদিকে লাখ লাখ স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি। বাতাসে বারুদের গন্ধ, লাশের গন্ধ। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পলায়নরত পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস করে রেখে গেছে। তাদের পোতা মাইনে সম্পূর্ণ অচল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। ব্যাংকগুলোর ভল্ট শূন্য। খাদ্য গুদামগুলোতে নেই এক ছটাক চাল। বেসামরিক প্রশাসন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনা ও দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন। তিন বছর তিনি দেশের মানুষকে কিছু দিতে পারবেন না! এই তিন বছর হবে দেশ গড়ার প্রাথমিক পর্যায়।

সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ পুনর্গঠনের জন্য তিন বছর এমন কোনো সময় নয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর ইউরোপ আর জাপানকে সার্বিক সহায়তা দিয়েছিল অর্থনৈতিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। সেই বিচারে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠন কাজগুলো করেছিলেন একক প্রচেষ্টায়। তার সঙ্গে ছিল এক ঝাঁক লোভ-লালসামুক্ত ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ দলীয় নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহায়তা কামনা করেন। অনেকেই সাড়া দেয় তার ডাকে। বঙ্গবন্ধু দ্রুত বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় বাহিনীকে সসম্মানে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারত থেকে দেশে ফেরা প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করে তার সরকার। বাংলাদেশকে তিনি জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনসহ অন্যান্য বিশ্ব সংস্থার সদস্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই স্বল্প সময়ে তিনি আদায় করেছিলেন দুই শতাধিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় বিশ্বের অন্যতম আধুনিক একটি সংবিধান রচনা ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের এক অমর কীর্তি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। উচ্চশিক্ষা একটি জাতির অন্যতম ভিত্তি। সেই ভিত্তি মজবুত করতে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। আজীবন দুঃখী মানুষের পক্ষে সংগ্রম করা মানুষটি চেয়েছিলেন, বীরের জাতি বাঙালি বিশ্বে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ, ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। কিন্তু ঘাতকের বুলেট তাকে সে সুযোগ দেয়নি। কুচক্রীরা সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ সপরিবারে তাকে হত্যা করে। ঘাতকের হাত থেকে রেহাই পায়নি ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলও। ওই সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোটবোন শেখ রেহানা। পিতার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে এখন দিন-রাত এক করে কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। এরই মধ্যে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছিল- 'তলাবিহীন ঝুড়ি'। সেই দেশটির মানুষ এখন কয়েকগুণ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমানে ১৬ কোটির বেশি মানুষকে বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু খাওয়ায়-ই না, তাদের খাদ্যের জোগান দিয়ে উদ্বৃত্ত রপ্তানিও করে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে এক হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এর চেয়ে দুই গুণ বেশি। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দমমিক ৯।

জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অন্য দেশের জন্যও অনুকরণীয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মতো সফলতাও দেখিয়েছে বাংলাদেশ। জাতির পিতা সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ করেছিলেন। তার কন্যার নেতৃত্বে সেই দেশটি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পূর্ণতা পায় বাঙালি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই দিনে জাতির পিতার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।