গোপাল চন্দ্র শীল একজন নরসুন্দর। তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সনদ নেই। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে ধারণ করেছেন, একই সঙ্গে লালন করে চলেছেন, তা অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও করতে পারিনি। আমি প্রথমেই একজন গোপাল চন্দ্র শীলকে স্যালুট জানাই। বলে রাখি, অনেকের কাছে হয়তো বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। তবে আমার কাছে বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ এই দেশে কুচক্রীরা আজও মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য বানিয়ে দেদার দোকান খুলে বসেছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় স্বেচ্ছায় নিয়োজিত গোপাল নিঃসন্দেহে অনন্য।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ৬০ ফিট রাস্তার আমলিরটেক মোড়ের কাছে গোপাল চন্দ্র শীলের সেলুনের অবস্থান। সেলুনের সামনের সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা- 'এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চুল কাটা হয়'। সাইনবোর্ডের লেখাটি পড়ে এক সকালে আমার চোখ আটকে গেল। থামলাম সেলুনের সামনে। এ নতুন রাস্তাটি হওয়ার বহু আগে থেকেই এলাকায় আমার যাতায়াত। কখনও চোখে পড়েনি। সেলুনের ভেতরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, গোপাল চন্দ্র শীল কে? গোপালের এক সহকারী দেখিয়ে বলল- 'উনি'। শরীরের ঊর্ধ্বাংশে লাল-সবুজ টি-শার্ট পরা গোপালের সঙ্গে হাই-হ্যালো শেষে জানতে পারলাম, সবসময় তিনি লাল-সবুজের এমন পোশাকেই চুল কাটেন। সেলুনের চারপাশে চোখ বুলালাম। পুরো সেলুনের দেয়ালজুড়ে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সময়ের ছবি। যেন একখণ্ড ছোট্ট মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
আলাপ শুরু করলাম গোপালের সঙ্গে। তার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের কয়েক বছর পরে। বাড়ি ঝালকাঠি। এ এলাকায় ২৮ বছর ধরে চুল কাটেন। বছর বিশেক আগের কথা। একদিন এক লোক সেলুনে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন- চুল-দাড়ি কাটতে কত লাগবে? গোপাল বলেছিলেন, ১৫ টাকা। ১৫ টাকার কথা শুনে লোকটি আক্ষেপ করে বলেছিলেন- 'কেন যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম! স্বাধীন দেশে চুল কাটার ১৫ টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।'
কথাটি গোপালের মনে দাগ কাটে। সেই থেকে গোপাল সিদ্ধান্ত নেন- মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চুল কাটবেন। এখন পর্যন্ত তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রি চুল কেটে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ফ্রিতে সহস্রাধিক অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধার চুল কেটেছেন। তবে গোপাল না চাইলেও সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা টাকা দিয়েই চুল কাটান। মুক্তিযোদ্ধাদের এই সেলুনে কোনো সিরিয়াল লাগে না। অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে গিয়েও চুল কেটে দিয়ে আসেন। শুধু চুল-দাড়ি কাটাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি গোপাল। তাদের নাম-ঠিকানা, স্বাক্ষর ও মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার কথাও টুকে রেখেছেন একটি স্মারক বইয়ে। রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধাদের খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার এক অসামান্য দলিল হয়ে উঠেছে বইটি। এমন কাজ করতে গিয়ে গোপালকে কখনও কখনও অনেকের কটূক্তিরও শিকার হতে হয়। অনেকে এও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পান; তুমি তাদের কাজ করে কী পাও? গোপাল কটূক্তিকারীদের বলেন, 'ভালোবাসা পাই'। এই হলেন একজন শ্রমজীবী গোপাল চন্দ্র শীল। আবারও স্যালুট তাকে। কথা বলতে বলতে আমার প্রেরণামূলক কথা শুনে গোপালের চোখ জলে ভরে ওঠে। আমিও নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। চোখের জলে ভেসে তাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিই।
সাজ্জাদ কাদির :তথ্যচিত্র নির্মাতা ও টিভি উপস্থাপক