নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রমাণ করেছে, সরকার প্রভাবিত না করলে যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব। এই নির্বাচনে আমরা দেখেছি, সরকারি পর্যায় থেকে প্রভাব ছিল না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি। নির্বাচন কমিশনও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। ভোট গ্রহণ থেকে ফল ঘোষণা- সবকিছুই ছিল শান্তিপূর্ণ। নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য এটিই হওয়া উচিত।
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী অত্যন্ত সহনশীল আচরণ করেছেন। তিনি ভোটারদের কাছে গেছেন এবং জনগণের সমর্থনের ওপরই আস্থা রেখেছেন। ফল নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেননি।
অথচ আমরা এ সময়েই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, বিগত খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অন্য রকম আচরণ দেখেছি। সেই প্রার্থীরা মনোনয়নের জন্য বিনিয়োগ করেছিলেন এবং বিনিয়োগের ফসল ঘরে তোলার জন্য যে কোনো উপায়ে ফল নিজের পক্ষে নেওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন। তারা ভোটারদের সমর্থনের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। কারণ, তাদের জনসম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও ছিল না।
নারায়ণগঞ্জে আইভী এর আগে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি জনগণের সঙ্গে থেকে অনেক কাজ করেছেন। যে কারণে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভোটারদের প্রতি আস্থা রাখতে পেরেছেন। এ ছাড়া তার মনোনয়নও ছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে, সেখানে কোনো বিনিয়োগ ছিল না। ফলে তিনি ভোটারদের সমর্থনের বাইরে অন্য কোনো উপায়ে নির্বাচনের ফল নিজের পক্ষে নেওয়ারও চেষ্টা করেননি।
এখন এই নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন নারায়ণগঞ্জের মতোই হবে। তবে অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিল জাতীয় সংসদে পাসের পর পাঁচটি সিটি নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজিতও হয়েছিলেন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলেও দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব- এটি পরীক্ষিত হলো।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার জাতীয় নির্বাচনের সময়ই সরকারের চেহারা বদলে গেল। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, কিছু দিনের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে একটি নির্বাচন করা হবে; কিন্তু তা আর হয়নি। এরপর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য প্রকাশ্যে প্রভাব খাটাতে দেখা গেছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ না থাকায় ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহও কমে গেছে।
বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বরাবরই সুখকর নয়। ১৯৯০-এর পর যে ক'টি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সবই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। দলীয় সরকারের অধীনে একটি উপনির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে দেখা যায়নি। অতএব, নারায়ণগঞ্জ সামনে রেখে সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে আশ্বাস দিচ্ছে, তার প্রতি কতটা আস্থা রাখা যায়, তা অভিজ্ঞতা থেকেই বিবেচনা করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জে সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও এখানে ইভিএম ব্যবস্থার ত্রুটির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ডিজিটাল জালিয়াতির বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হওয়া অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার অভিযোগ তুলেছেন। আরও আগে ইভিএম ব্যবস্থা চালুর সময় যে জাতীয় কমিটি ছিল, সেখানেও প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করেননি। কারণ, এ ব্যবস্থায় ডিজিটাল জালিয়াতির যথেষ্ট সুযোগ আছে। বর্তমান ইভিএম একটা ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা- এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, প্রতিবেশী ভারতেও ইভিএম ব্যবস্থায় ত্রুটি ও জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচনের সদিচ্ছা থাকলে এই ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম ব্যবস্থা একদম বাদ দেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।
লেখক : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)