দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মঙ্গা নেই আগের মতো। তারপরও নিরাপদ খাদ্য এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারলেই টেকসই হবে উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের (এসডিজি) প্রতিটি লক্ষ্যের সঙ্গেও নিরাপদ খাদ্যের রয়েছে গভীর সংযোগ। কিন্তু এসডিজি অর্জনের অন্তরায় অনিরাপদ খাদ্য। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সীমিত সম্পদ নিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আইন কিংবা চাপ প্রয়োগ করে খাদ্যে ভেজাল নির্মূল করা কঠিন। এ জন্য দরকার বিবেকের জাগরণ। সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মধ্যে, যাতে নিরাপদ খাদ্যের মৌলিক অধিকারের দাবি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। 'টেকসই উন্নয়নে নিরাপদ খাদ্য :প্রেক্ষিত বাংলাদেশ' শীর্ষক বৈঠকটির আয়োজন করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সমকাল। আয়োজনে সহযোগিতা করে জাইকা বাংলাদেশ।
বৈঠকের প্রধান অতিথি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি বলেন, 'সুস্থ-সবল জাতি গঠন এবং সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলাদেশ গড়তে নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যে গুরুত্ব দিয়েছেন। গত ৫০ বছরে আমাদের দেশে উৎপাদন বেড়েছে। করোনাকালেও খাদ্য সংকট সরকার ভালোভাব মোকাবিলা করেছে। দেশে এখন খাদ্য সংকট না থাকলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। বিএসটিআই মান নিয়ন্ত্রণের লাইসেন্স দেয়, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ শুধু তদারকি করে। খাদ্য মন্ত্রণালয় তা সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।'
তিনি বলেন, 'শুধু আইন দিয়ে ভেজাল নির্মূল সম্ভব নয়। অতি মুনাফার লোভ সামলাতে হবে। সবাই মিলে নিরাপদ খাদ্যের মৌলিক অধিকার অর্জনের আন্দোলন করতে হবে।' কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের সব জায়গায় খাদ্যের মান পরীক্ষার ল্যাব নেই। ভোক্তাকে সচেতন করতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।'
বৈঠকের সঞ্চালক সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, 'একসময় দেশে খাদ্যের অভাব ছিল। এখন আর নেই সেই পরিস্থিতি। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের রয়েছে অনিশ্চয়তা। খাবারকে দূষণমুক্ত রাখা এবং মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সবাইকে কাজ করতে হবে। এ আন্দোলনে সমকাল যুক্ত থাকবে।'
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, 'খাদ্য নিরাপদ না হলে তাকে খাদ্য বলা যাবে না। খাদ্য অনিরাপদ হওয়ায় অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। মানুষ নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। কমছে আয়ু। অর্থনৈতিকভাবেও দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, 'মানুষের আয় যত বেশি হোক, খাদ্য নিরাপদ না হলে জীবন হুমকিতে পড়বে। খাদ্য উৎপাদনের গুণগত মান বাড়াতে হবে। তবে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বাড়াবাড়ির কারণে যেন কোনো ক্ষতি না হয়।'
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল কাইউম সরকার বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে সরকার খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন এবং ২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। মৎস্য, কৃষি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সবগুলোর সমন্বয় জরুরি। খাদ্যের মান উন্নত করা গেলেই আমাদের রপ্তানি আয় বাড়বে। শিশুদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে পাঠ্যপুস্তকের মলাটের ভেতরে এ-সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।'
অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের কোনোটিতেই নিরাপদ খাদ্যকে মূল সূচকে ধরা না হলেও প্রায় প্রতিটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই ১৭টি লক্ষ্যই ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনে বিশ্বের ১৯২টি দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
জিটিভির প্রধান নির্বাহী সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, 'নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কিছু কাজ দরকার। সারাদেশে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, 'ভ্রাম্যমাণ আদালত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনে ভেজাল হতে পারে। প্রতিটি জায়াগায় স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিতে হবে।'
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রতিনিধি কাটসুকি বলেন, 'সাম্প্রতিক বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখার মতো। জাইকা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।'
বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. রেজাউল করিম বলেন, 'খাদ্যসংশ্নিষ্ট রোগের কারণে মানুষের উৎপাদনশীলতা কমায় ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজর ৫০০ কোটি ডলার এবং এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় এক হাজর ৫০০ কোটি ডলার।'
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, 'অনেক পণ্য রপ্তানিকারকের রেজিস্ট্রেশন নেই। ফলে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না।'
ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, 'চাপ দিয়ে কোনো কিছু সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগ করতে গেলে অনেক সময় সমন্বয়হীনতার অভাব দেখা দেয়।'
নাগরিক সংগঠন বিসেফ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, 'নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদ ভোক্তার। আর সব দায় নিতে হয় উৎপাদককে। আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন দরকার।'
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক দীপক রাজন নিরাপদ খাদ্যের জন্য কাঠামোগত রেগুলেটরি সিস্টেমের ওপর জোর দেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেদ কনক বলেন, 'ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামে আমাদের তিনটি ল্যাব আছে। ১৭টি কোয়ারেন্টাইন আছে। এসব কারণে বর্তমানে ৫০টি দেশে আমরা নিরাপদ মাছ রপ্তানি করছি।'
বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সদস্য মিনহাজ আহমেদ বলেন, 'কী পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে, সে সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা নেই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সব প্রতিষ্ঠানকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে।'

বিষয় : বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-সমকাল গোলটেবিল

মন্তব্য করুন