কৃষির আধুনিকীকরণ বা বিবর্তন একদিনে সৃষ্টি হয়নি। প্রস্তর যুগে মানুষ পাথর দিয়ে কর্ষণ কাজ করত, নিজেদের দৈহিক শক্তি প্রয়োগে কৃষির কার্যাদি সম্পন্ন করত। জীবন-জীবিকা ও নিজেদের প্রয়োজনে কৃষি কাজ করত, প্রয়োজনীয় সব ফসল নিজেরাই ফলাত। তা থেকে উদ্বৃত্ত অংশ প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে দিত বা পণ্য বিনিময় করত। কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত হলো কর্ষণ ও সেচ ব্যবস্থাপনা। মানুষ প্রথমে নিজেরাই ফলা দিয়ে কর্ষণ কাজ করত। পরে লাঙল, মই, জোয়াল, কোদাল, মাতুল ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করল। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করল গৃহপালিত পশু গরু, মহিষ, ঘোড়া, গাধা। সেচ ব্যবস্থায় কলস বা ঠিলা দিয়ে জমিতে পানি দেওয়া হতো। পরে সেউতি, ডঙ্গা, চাপকল ইত্যাদি দিয়ে নালা করে করা হতো সেচ ব্যবস্থা। কর্ষণ, মাড়াই, ফসল সংগ্রহ প্রভৃতি কাজে গৃহপালিত প্রাণী ব্যবহার করা হতো। ধীরে ধীরে সেখানে সংযুক্ত হতে থাকল কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। যেমন পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর, বর্তমানে তা এসে কম্বাইন হারভেস্টর ও রাইস রিপারে দাঁড়িয়েছে। সেচ ব্যবস্থায় সংযুক্ত হয়েছে শ্যালো ও ডিপ টিউবওয়েল।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশ বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি দেশ, এর প্রধান কারণ এখানকার কৃষি ও অনুকূল আবহাওয়া। সমগ্র এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষ বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। এভাবে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে বাঙালি শংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বাংলা ভাষায় যেমন অনেক বিদেশি ভাষার শব্দ যুক্ত হয়েছে, তেমনি কৃষির কিছু প্রযুক্তি ও জাত এসেছে বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রতিটি বিবর্তনে বা উন্নয়নের সঙ্গে আমরা নতুনকে সাদরে গ্রহণ করি এবং পুরাতনকে হারিয়ে ফেলি। উন্নত বিশ্ব তাদের বিখ্যাত কর্ম, ব্যক্তি ও কৃষির ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য জাদুঘর করে থাকে। 

২০১৯ সালে দাপ্তরিক কাজে আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের পর জানতে পারলাম এই শহরকে 'সিটি অব মিউজিয়াম' বলা হয়। এই সিটিতে রয়েছে প্রায় ৮৩টি মিউজিয়াম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অন্যান্য জাদুঘরের পাশাপাশি কৃষি জাদুঘর রয়েছে। যেমন কানাডিয়ান কৃষি জাদুঘর, মিসিসিপি কৃষি জাদুঘর, ফ্লোরিডা কৃষি জাদুঘর, জর্জিয়া কৃষি জাদুঘর, সান্তাপাওলো কৃষি জাদুঘর, ডেলাওয়ার কৃষি জাদুঘর, লন্ডন কৃষি জাদুঘর, আজারবাইজান কৃষি জাদুঘর। ইন্ডিয়াতে রয়েছে জাতীয় কৃষি বিজ্ঞান জাদুঘর, পাকিস্তানে রয়েছে কৃষি হেরিটেজ জাদুঘর ইত্যাদি। কৃষি জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষির ইতিহাস ও হেরিটেজকে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ বিষয়ে অবহিত করা। 

বাংলাদেশেও পাঁচ একর জায়গার ওপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২০০২ সালে কৃষি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। তাছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে নওগাঁয় ২০০৮ সালে কলেজশিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম এক একর জায়গার ওপর একটি কৃষি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরে ৫০টি কর্নারে প্রায় ১০০০-এর মতো কৃষি যন্ত্রপাতির সমাহার রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই যন্ত্রপাতিগুলো সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া তার একটি কৃষি লাইব্রেরি রয়েছে। সেখানে রয়েছে কৃষির ওপর প্রায় ৭০০০ বই। দুটি মিউজিয়ামে রয়েছে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ব্যবহূত লাঙল, জোয়াল, মাতুল, কাস্তে, খন্তি, মাটির পাতিল, তেল ভাঙার ঘানি, গরুর গাড়িসহ বিভিন্ন কৃষিজ যন্ত্রপাতি। কৃষি ছাড়া রয়েছে আমাদের বৃহৎ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টর। এই সেক্টরগুলোর গবেষণাগারগুলোতে বিলুপ্তপ্রায় অনেক প্রজাতি সংরক্ষিত রয়েছে।

কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এপেপ বডি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছে 'জাতীয় কৃষি প্রদর্শনী কেন্দ্র'। এখানে রয়েছে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ফসলের বীজের সমাহার। তাছাড়াও ডিজিটাল ডিসপ্লে সেন্টারের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা আমাদের কৃষি গবেষণা কর্মকাণ্ডের ভিডিও দেখতে পাবে। আমাদের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে জার্মপ্লাজম সেন্টার, সেখানে রয়েছে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের বীজ।

দেশের ধান গবেষণার অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধানভিত্তিক কৃষ্টি ও কালচার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের প্রথম রাইস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রি তথা বাংলাদেশের সাফল্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুন্দর ও ফলপ্রসূভাবে তুলে ধরার জন্য ব্রিতে একটি অত্যাধুনিক রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। সম্প্রতি একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ব্রিতে একটি অত্যাধুনিক রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে ধানের বীজ থেকে বীজ বৃদ্ধি পর্যায়, গত পাঁচ দশকে ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন উফশি জাতের ধান ও চালের নমুনা, দেশীয় বিভিন্ন আদি জাত, চালের তৈরি পিঠাপুলি, ধানের উপজাত পণ্য, প্রধান প্রধান আগাছা, রোগ-বালাই-এর সচিত্র নমুনা, ধান চাষে ব্যবহূত দেশীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির রেপ্লিকা, ধানভিত্তিক কৃষ্টি ও কালচারের রেপ্লিকা এবং ধান নিয়ে লেখা দেশি বিদেশি বইপত্র এক ছাদের নিচে এনে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা দরকার, সময়ের সঙ্গে সবকিছু পরিবর্তনশীল। বর্তমানে যেসব কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহূত হচ্ছে, একদিন হয়তো সেগুলো সময়ের পালাবদলে হারিয়ে যাবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের কৃষির ধারাবাহিক সাফল্যের কথা জানাতে হবে। তাছাড়াও কৃষির এই অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি জড়িত ছিল, সেগুলোর সংরক্ষণ করে রাখতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। শুধু কৃষি নয় সব ক্ষেত্রে অগ্রগতির ইতিহাসের সঙ্গে যা কিছু সংশ্নিষ্ট যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, প্রযুক্তিসহ সংরক্ষণ করা জরুরি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে জাতীয় জাদুঘরের পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সামরিক জাদুঘরসহ অসংখ্য জাদুঘর। তাই আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিলুপ্তির পথে যেসব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন একটি জাতীয় কৃষি জাদুঘর। এটি হবে কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের সব কর্মকাণ্ডের একটি সফল ও বাস্তবধর্মী সংগ্রহশালা, যার মাধ্যমে দেশি ও বিদেশিরা আমাদের কৃষির ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে পারবে।

বিষয় : কৃষি জাদুঘর কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি জাতীয় কৃষি জাদুঘর

মন্তব্য করুন