‘আমরা গরিব বইলা কেউ বিচারের কথা কয় না’- এই অপ্রিয় সত্যটি বললেন নিহত নাহিদ হাসানের সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ডালিয়া সুলতানা। মাত্র সাত মাস আগে নাহিদের বিয়ে হয়। থাকতেন পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে। কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ করতেন, সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেন। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী-হকার আর ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ চলার মধ্যে আটকে পড়েন নাহিদ। তাকে তো ডেলিভারির কাজ করতে হবে। কিন্তু নিজেই যে ডেলিভারি হয়ে যাবেন ‘অকাল প্রয়াণে’ কে জানত! নাহিদের স্ত্রী ডালিয়ার বিয়ের মেহেদি শুকানোর আগেই এভাবে বিধবা হয়ে পড়বেন, এটা মেনে নেওয়া কত কষ্টের! এরচেয়েও বড় কষ্ট আর হতাশার কথা ডালিয়ার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে- ‘আমরা গরিব বইলা কেউ বিচারের কথা কয় না।’ কথাটি ব্যাখ্যার আগে আরেকটি শোক সংবাদ উল্লেখ করা প্রয়োজন।

একই সংঘর্ষের বলি হলেন নিউমার্কেটের একটি দোকানের কর্মচারী মোহাম্মদ মুরসালিন। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেই মুরসালিনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে হামিম ও হুমায়রা বাবাকে হারিয়ে চারদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। কিছু বুঝতে পারছে না। তবে বুঝতে পারছে তার স্ত্রী, ভাই আর মা। স্ত্রী মিতু আক্তার বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার পোলাপাইনগুলোর কী অইব? ওরা কারে এখন বাবা ডাকব?’ ভাই বললেন, ‘মামলা করে আর কী হবে, এ দেশে তো আর বিচার নাই।’ মা নুরজাহান বলেন, ‘আমি কার কাছে বিচার দিমু, কে করবে বিচার? আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’

সংঘর্ষ থেমে গেছে। কিন্তু নাহিদ আর মুরসালিনের মৃত্যু ও তার ক্ষত কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কেউ কি পারবে নাহিদের স্ত্রী, মুরসালিনের স্ত্রী মিতু ও তার দুই শিশু সন্তানকে সান্ত্বনা দিতে? এরচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেউ কি আছে যে ওদের বিচার পাওয়ার ব্যাপারে জন্ম নেওয়া হতাশার উত্তর দিতে। ‘মামলা করে আর কী হবে, এ দেশে তো আর বিচার নাই।’ বিচার নিয়ে এই হতাশার উত্তর দিতে কি কোনো আইনজীবী প্রস্তুত আছেন? ‘বিচার’ নিয়ে এই করুণ হতাশা পুরো জাতির জন্য এক কঠিন সংকট। আমাদের দেশে আইনজীবীর অভাব নেই। ধর্মের অপব্যবহার করে ব্যবসা করা যেমন সম্ভব, তেমনি আইনের অপপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে আইনের ব্যবসা করাও সম্ভব। আমরা উচ্চ শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু শিক্ষাকে নিজের মুনাফা আদায়ের হাতিয়ার বানিয়েছি। আমাদের শিক্ষা কি মানুষের জন্য নাকি নিজের আখের গোছানোর জন্য? আমরা আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থেকেও হকারদের কাছ থেকে চাঁদা না তুলে চলতে চাই না। আমরা ডাক্তার হয়ে গরিবের চিকিৎসা করতে চাই না, ধনীদের চিকিৎসা করার মধ্যে একটা আভিজাত্য খুঁজে পাই। আমরা তো ‘আইন’ শিক্ষাকে মুনাফার বাটখারায় মাপতে এতটাই অভ্যস্ত হয়েছি যে, বাদী-বিবাদীকে অপরাধের আগে আর্থিক সামর্থ্যের মানদণ্ডে দেখি।

যে মানুষের সামাজিক পরিচয় ‘গরিব’ সে নারী হোক আর পুরুষ হোক; তার জন্য চিকিৎসা নেই, নিরাপত্তা নেই, বিচার নেই। সেই গরিব মানুষ যদি অভাবের তাড়নায় মোবাইল চুরি করে, আমরা সবাই দলবল নিয়ে তাকে মেরে একটা ‘উচিত বিচার’ করে ফেলি। এই আনন্দ আমাদের গরিবকে মারার আনন্দ। অথচ গরিবের জন্য বরাদ্দ টিসিবি কার্ড গরিবের হাতে না গিয়ে যখন প্রভাবশালীদের হাতে চলে যায় তখন আমরা নিশ্চুপ। গরিব কোনো অপরাধ করলে আইন আদালতের দরকার হয় না, আমরা নিজেরাই বিচার করে ফেলি। অথচ গরিব যদি নিপীড়িত হয়, এমনকি নির্যাতনে গরিবের মৃত্যুও হয়, সেই গরিব কেন বিচারের প্রত্যাশাও করেন না?

‘আমরা গরিব বইলা কেউ বিচারের কথা কয় না’ কথাটি পুরো সমাজব্যবস্থার ডিসকোর্স। বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে বিচার পাওয়ার অধিকার প্রাকৃতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক। সামাজিক সম্পর্ক ও সামাজিক ভারসাম্যের সঙ্গে সুবিচারের সম্পর্ক অধিক। কিন্তু একটা সমাজ যদি গরিব বিদ্বেষে ছেয়ে যায় তার প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পড়বেই। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের মতে, রাষ্ট্র তো সমাজেরই একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যে সমাজে গরিবদের সামাজিক জীব মনে করা হয় না, এই সমাজে গরিবকে দেখা হয় অবহেলার চোখে, মনে করা হয় ‘দারিদ্র্য মানে অভিশাপ’। সেই একই কারণে একটা রাষ্ট্রে গরিব নাগরিকের মর্যাদা পায় না। গরিবের বিচারের জন্য কেউ লড়ে না। গরিবের তো মামলা চালানোর খরচপাতি নেই। টাকা ছাড়া যদি মামলার ফাইল না চলে, টাকা ছাড়া যদি আইনজীবীর আইন কাজ না করে- গরিব তখন মামলা ও বিচার থেকে দূরে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

এটা যে শুধু আইন আদালতের বিষয় নয়; সামাজিক দাবিরও বিষয়- তা স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দেওয়া হলো ‘আমরা গরিব বইলা কেউ বিচারের কথা কয় না’ এই কথার মধ্য দিয়ে। বিচার যখন বিলম্বিত হয় বা বিচার যখন কঠিন হয়ে পড়ে তখন সামাজিক দাবি বিচারকে জোরালো করে। আমাদের সুশীল সমাজ এখনও গরিবের অধিকারের ব্যাপারে উচ্চকিত নয়। বুয়েটের আবরার হত্যার বিচার হয়েছে সামাজিক আন্দোলন থেকে। কিন্তু গরিব হত্যার জন্য বিচার দাবি করতে এই সমাজ প্রস্তুত নয়। কারণ শিক্ষা আমাদের মানুষের পাশে নিয়ে যায় না, অভিজাত হতে শেখায় আর অভিজাতদের পাশে থাকতে শেখায়। সামাজিক মূল্যবোধের সংস্কার আনতে সক্ষম এমন শিক্ষাপদ্ধতির বিকাশ না হলে এমন ভারসাম্যহীন সমাজেই ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হবে।