শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতে মা ও ছেলেকে থানা পুলিশ মুক্তি দিয়েছে। মা সৈয়দা রত্না কয়েক মাস ধরে ঢাকার কলাবাগানে তেঁতুলতলা মাঠটি রক্ষার জন্য মানববন্ধন, মিছিল, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সৈয়দা রত্না উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সদস্য ছিলেন। রাজনীতি ও সমাজ-সচেতন; কিন্তু কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।

সৈয়দা রত্নাকে যখন আটক করা হয়, তখন পুলিশ মাঠটি দখলের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে ইট-রড নিয়ে প্রাচীর নির্মাণকাজ শুরু করেছে, সে সময়ে সৈয়দা রত্নাও প্রতিবাদের 'শেষ উপায়' হিসেবে পুলিশের কর্মকাণ্ড ফেসবুক লাইভে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরছিলেন। কলাবাগান পুলিশ এটাকে ভালো চোখে নেয়নি। কলাবাগান থানার পুলিশ সৈয়দা রত্নাকে ধরে নিয়ে 'হাজতবাস' দিয়েছিল; সঙ্গে ১৭ বছর বয়সী ছেলে ইসা আব্দুল্লাহ। নিরপরাধ, মানবিকতা আর মঙ্গলের আকাঙ্ক্ষী মা ও ছেলেকে পুলিশ হেনস্তা করল, অপমান করল- একটি ন্যায্য দাবি উত্থাপনের জন্য।

আটকের কথা প্রচারিত হওয়ার পর থানায় ছুটে যান সমাজ-সচেতন মানুষ। তাদের কাউকেই থানা ভবনে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কথা বলতে দেওয়া হয়নি মা ও ছেলের সঙ্গে। একপর্যায়ে মানববন্ধন হয়েছে। ১৩ ঘণ্টা আটক জীবন থেকে শেষমেশ মুক্ত হয়ে মা ও ছেলে বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে গেছেন নিজ বাড়িতে। সংবাদমাধ্যম বলছে, স্বাধীনতার পর থেকেই এই মাঠটিতে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করত। ঈদের জামাত হতো বড় আকারে। ২০২০ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকা জেলা প্রশাসক মাঠটিকে একটি পতিত জমি হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর এটিকে বরাদ্দ দেওয়া হয় পুলিশের কাছে। পুলিশ বলছে, 'সব নিয়মকানুন মেনে তারা কলাবাগান থানার ভবন নির্মাণের জন্য পতিত জমিটি বরাদ্দ নিয়েছে।' এলাকাবাসী জানাচ্ছে, এর আগেও জেনারেল এরশাদ সরকারের সময় এই মাঠটি দখল করার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল সেই সময়ের সরকার। তখন এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে এরশাদ সরকার মাঠটি দখল করতে পারেনি।
বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে নানা কারণে নাগরিকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। অথচ এই পুলিশ বাহিনীর মহান মুক্তিযুদ্ধে একটা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। একাত্তরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে শত শত বাঙালি পুলিশ সদস্যকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর এই মহান অবদান পরে তাদের নানামুখী বিতর্কিত আচরণে জাতির সামনে ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে।

বিগত কয়েক বছরে জঙ্গিবাদ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, অপরাধ দমনের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের মাদক ও জঙ্গিবাদ থেকে বেরিয়ে আসার কর্মসূচির কথা বলেছে। পুলিশ বাহিনী বিশাল করে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়েছে সেই সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন। সেখানে বলা হয়েছে- কিশোর-তরুণদের মাদক ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা, পাঠাগার পাঠচক্র খেলাধুলায় আগ্রহী করে তোলাসহ নানা জাতীয় কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা। এসব কাজে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। এখন সেই পুলিশই নিজ থেকেই, বসতিতে ঠেসে যাওয়া নগরীর একচিলতে জমি, যা গত ৫০ বছর কলাবাগানের এলাকাবাসী খেলার মাঠ ও ঈদগাহ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, তার দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সেই সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারণার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পতিত জমি দেখিয়ে বাংলাদেশের প্রভাবশালীরা নানা কায়দাকানুন করে সরকারি জমি, খেলার মাঠ, নদীর তীর দখল করে ভবন নির্মাণ যারা করে, তাদের সমাজ ভূমিদস্যু আখ্যা দেয়। এর বিরুদ্ধে একটা লড়াই দেশে গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। মাঠ, জলাশয় সম্পর্কিত, তহশিল অফিসের দাগ-খতিয়ানে যাই থাকুক না কেন; এটি একটি খেলার মাঠ, ঈদের সময় ঈদগাহ ময়দান- এটিই জানে কলাবাগানের এলাকাবাসী।

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও তেঁতুলতলা মাঠে খেলতে যাওয়া তিন শিশুকে হেনস্তা করে পুলিশের তিন সদস্য। সংবাদমাধ্যমে তা প্রকাশিত হলে পুলিশের ওই তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। আমরা ভেবেছিলাম, মাঠটি নিয়ে পুলিশের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। প্রকারান্তরে ঘটনা ঘটল ঠিক তার বিপরীত। একজন সাবেক আইজিপি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ১৮ বছরের নিচের বয়সী কাউকে পুলিশ থানাহাজতে রাখতে পারে না, এটি আইনের পরিপন্থি। পুলিশ এবার আটকে রাখল এক কিশোরকে, যার মা সন্তানদের জন্য ওই খেলার মাঠটি অক্ষত থাকুক- এমন দাবি করেন।

কলাবাগান থানার নিজস্ব ভবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কেউ দ্বিমত করবে না; কিন্তু সে জন্য তেঁতুলতলা মাঠটিই লাগবে কেন? যে দেশে লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়, সে দেশে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি থানা ভবন কেনার জন্য অর্থাভাবে ভুগবে কেন?
কলাবাগানের মাঠ রক্ষায় এখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি। দেখতে চাই- মা ও ছেলেকে হেনস্তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। আমরা চাই, আবার শিশুর কলকাকলিতে মেতে উঠুক তেঁতুলতলা মাঠ, মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর হোক ঈদের দিনের সকাল।

রুস্তম আলী খোকন: সাবেক ছাত্রনেতা