রেলওয়ের ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) শফিকুল ইসলাম এখন দেশের আলোচিত চরিত্র। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তা প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনা ৫ মের। পত্রিকায় এসেছে ৭ মে। ঘটনার সারমর্ম হলো, ওই দিন তিন যুবক খুলনা থেকে ঢাকাগামী ট্রেন সুন্দরবন এপপ্রেসে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন থেকে উঠে প্রথম শ্রেণির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় ঢুকে পড়ে। কর্তব্যরত টিটিই তাদের টিকিট দেখতে চাইলে তারা নিজেদের রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেন। টিটিই নিজে সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রেলওয়ের পাকশী বিভাগের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নূরুল আলমকে অবহিত করলে তিনি শফিকুলকে পরামর্শ দেন সর্বনিম্ন ভাড়া নিয়ে ওই তিন যাত্রীকে সাধারণ কোচের টিকিট দিতে। শফিকুল তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী তাদের সাধারণ শ্রেণির টিকিট দিয়ে নির্ধারিত কামরায় পাঠিয়ে দেন। ওই সময় যুবকরা কিছু না বললেও ঢাকায় ফিরে শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং তাদের সে অভিযোগের ভিত্তিতে তখন সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অবৈধভাবে বিনা টিকিটে ভ্রমণের জন্য ট্রেনে চড়া তিন যুবক রেলমন্ত্রীর ভাগ্নে। 

ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে একজন টিটিইর সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে 'দুষ্টের পালন এবং শিষ্টের দমনে'র অলিখিত নিয়ম-রীতিকেই প্রতিভাত করে তুলেছে। একজন টিটিইর কাজ কী? তার কাজ কেউ বিনা টিকিটে রেলগাড়িতে ভ্রমণ করছে কিনা তা দেখা এবং যথা ঘটনায় যথা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তার এটা দেখার দরকার নেই, বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী ব্যক্তির সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় কী। টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠলে তার একটাই পরিচয়- সে বিনা টিকিটের যাত্রী। একজন দায়িত্ববান টিটিইর তখন অবশ্য কর্তব্য হলো, তাদের টিকিট কিনতে বাধ্য করা। এমনকি টিকিট ছাড়া অবৈধভাবে রেল ভ্রমণের দায়ে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে জরিমানা এবং থানায় সোপর্দ করার এখতিয়ার একজন টিটিই সংরক্ষণ করেন। আলোচ্য টিটিই শফিকুল ইসলাম শুধু তাদের সাধারণ শ্রেণির টিকিট কেটে নির্ধারিত শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে বাধ্য করেছেন, জরিমানা করেননি। হিসেবমতে, মন্ত্রীর ভাগ্নেদের টিকিট কিনতে বাধ্য করায় টিটিই শফিকুল ইসলামের পুরস্কৃত হওয়ার কথা। কিন্তু উল্টো তিনি শাস্তি পেলেন। এ ঘটনা থেকে জনমনে কি এ ধারণা আরও পোক্ত হবে না- এ দেশে আইন রক্ষা করতে গেলে নিজেকে হেনস্তা হতে হবে, এমনকি জীবন-জীবিকার দড়িতেও টান পড়তে পারে? 

বিদেশে এমন ঘটনা ঘটলে ওই টিটিই তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ হয়তো পুরস্কার পেতেন। নিদেন পক্ষে কর্তৃপক্ষ তাকে উৎসাহপত্র (অ্যাপ্রিসিয়েশন লেটার) দিয়ে উৎসাহিত করত। উন্নত দেশগুলোতে আমরা এ ধরনের অনেক ঘটনার কথাই জানি, যেগুলোতে আইনভঙ্গ বা অমান্য করার দায়ে রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জরিমানা গুনতে হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর অনেকেরই চোখে পড়ে থাকবে। খবরটি ছিল করোনা সংক্রমণের সময় কঠোর লকডাউন চলাকালে বিধিনিষেধ ভঙ্গ করে মদের পার্টি করায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, তার স্ত্রী ক্যারি জনসন এবং অর্থমন্ত্রী রিসি সুনাককে জরিমানা করেছে লন্ডন পুলিশ। ২০২০ সালের জুন মাসের এক রাতে বরিস জনসনের জন্মদিনে ওই পার্টি হয়েছিল। খবরে বলা হয়েছে, লকডাউনের বিধিনিষেধ অমান্য করে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের পার্টি করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী জনসন অবশ্য ঘটনাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশি তদন্তে ঘটনার সত্যতা উঠে আসায় তাকে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এখন দাবি উঠেছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস ও তার অর্থমন্ত্রী সুনাকের পদত্যাগের। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ওই ঘটনাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও সংশ্নিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং ব্রিটেনের পুলিশ সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কৃত অপরাধের তদন্ত করতেও দ্বিধায় ভোগেনি। ব্রিটেনের সঙ্গে আমাদের তুলনা আমি কখনোই করি না। কারণটি কারও না বোঝার কথা নয়। সেখানে আইন সবার ওপরে এবং আইনের চোখে আক্ষরিক অর্থেই সবাই সমান। সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ এবং এমপি-মন্ত্রী কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা তো হরহামেশা আইনের শাসনের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করি, কেউ কেউ কণ্ঠকে উচ্চগ্রামে তুলে বলি- দেশে আইনের শাসন কায়েম হয়ে গেছে। কিন্তু সেটা যে কাজির গরুর মতো খাতায় আছে, গোয়ালে নেই তা তলিয়ে দেখি না। আইনের শাসনকে বাস্তব রূপ দিতে হলে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে যে আইন মেনে চলার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে, সেটাকে আমলে নিই না। মূলত এখানেই আমাদের দেশের আইনের শাসন সোনার হরিণ হয়ে থাকার মূল কারণটি লুক্কায়িত।

রেলওয়ের টিটিই শফিকুলের বরখাস্ত হওয়ার খবর যেদিন বেরিয়েছে, একই দিনে আরেকজন নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার তিরস্কৃত হওয়ার খবর দিয়েছে পত্রিকাগুলো। দুর্ভাগা এই কর্মকর্তার নাম সারওয়ার আলম, যিনি এলিট ফোর্স র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে তিন শতাধিক সফল অভিযান পরিচালনা করে দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছিলেন। তার অপরাধ, গত বছর পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার পর তিনি তার ফেসবুক আইডিতে মন্তব্য করেছিলেন, 'চাকরিজীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাদের বেশিরভাগই পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন এবং এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যায়।' কর্তৃপক্ষ তার এই মন্তব্যকে 'অকর্মকর্তাসুলভ আখ্যায়িত করে তাকে তিরস্কার করে চিঠি দিয়েছে। (সমকাল, ৭ মে, ২০২২)। 

অনেকেই বলে থাকেন, আমাদের দেশে ভালো কাজের মূল্য নেই, সৎ মানুষের ভাত নেই। কথাটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এখানে সততার পুরস্কার লাঞ্ছনা, গঞ্জনা। ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশব্যাপী প্রশংসিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দৌলাকে কতটা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল, আমরা সে খবর গণমাধ্যমে দেখেছি। বছর তিনেক আগে দেশের একটি বড়সড় এনজিওর পোশাকের দোকানে অতিরিক্ত দাম রাখার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর 'অপরাধে' জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুর শাহরিয়ারকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। সম্প্রতি রাঘববোয়ালদের অপকর্মের বিরুদ্ধে মামলা করার 'অপরাধে' দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে আরও ঘটছে। অবাক করা বিষয় হলো, এসব ঘটনা দেখেও কিছু বোকা কর্মকর্তা স্বীয় কর্তব্য-কর্মে অটল থাকতে চান। তারা কেন যে বোঝে না 'সেদিন খেয়েছে বাঘে, যখন ভালো কাজে পুরস্কার জুটত ভাগে।' এখন জোটে শাস্তি কিংবা তিরস্কার। আলোচ্য টিটিই শফিকুল ইসলামের ঘটনাই তার প্রমাণ। যদিও তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে, তার পরও কি কালিমা মোচন হবে?