রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের স্ত্রীর ক্ষমতা দেখেছেন দেশবাসী। তার ফোনে ট্রেনের টিটিইকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যদিও ব্যাপক সমালোচনার পর তা প্রত্যাহারও করা হয়েছে। মো. শফিকুল ইসলাম নামের রেলের ওই ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরিদর্শকের (টিটিই) 'অপরাধ' তিনি রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের স্ত্রীর মামাতো বোনের ছেলে ইমরুল কায়েস প্রান্ত ও তার দুই সঙ্গীকে বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ করতে দেননি। এ ঘটনায় ওই টিটিই অভিনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার কপালে জুটেছিল শাস্তি এবং 'মানসিক বিকারগ্রস্তের' অপবাদ। অথচ এতদিন আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা এই টিটিই চাকরি করে আসছেন রেলে।

রেলমন্ত্রী হিসেবে নুরুল ইসলাম সুজন বিধিবদ্ধ ক্ষমতার অধিকারী, দায়িত্বশীল ব্যক্তিও। কিন্তু তার স্ত্রীর রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্ব থাকার কথা নয়, নেইও। তিনি কেন রাগে-ক্ষোভে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন? রাষ্ট্র তাকে সে দায়িত্ব দেয়নি, সে ক্ষমতা দেয়নি। তার ওপর এটা অন্যায় হস্তক্ষেপ। এটা করতে পারেন না তিনি। 

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত তথ্য, তা না হলে ভয়াবহ এই অপরাধেরও কোনো কূলকিনারা হতো না। রেলের টিটিই মো. শফিকুল ইসলাম মানসিক বিকারগ্রস্ত সেই মিথ্যা তথ্যই জোর দিয়ে প্রচার হতো। তিনি যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন, সেটাও প্রমাণ করেই ছাড়ত রেল বিভাগ ও মন্ত্রীপক্ষের লোকজন। মন্ত্রী পত্নীর অন্যায় টেলিফোন কল এবং রাষ্ট্রীয় কাজে হস্তক্ষেপের মতো ঘটনাও জানা হতো না কারও। 

সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকেন মন্ত্রী, কিন্তু তার পরিবারের কোনো সদস্যের এভাবে 'মন্ত্রিত্বগিরি' করার কথা নয়। এখানে মন্ত্রীর ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এটা ক্ষমতার অপব্যবহার। রাষ্ট্র এমন ক্ষমতা কাউকে দেয় না, প্রধানমন্ত্রীও তার কোনো মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যকে ক্ষমতার অপব্যবহারের এমন লাইসেন্স দেননি। এটা বিশ্বাস ভঙ্গ করার শামিল। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, তার স্ত্রী শাম্মী আক্তার মনি অথবা অন্য কোনো মন্ত্রী ও তাদের কোনো স্বজন এটা করতে পারেন না।

রেলের এই ঘটনায় টিটিইকে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে যদিও, তারপরও তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে। তবে মন্ত্রী পত্নীর একটা টেলিফোন কলে যেখানে রেলের একজন কর্মচারী বরখাস্ত হয়ে যান, সেখানে এই প্রভাববলয়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা তাদের পক্ষ থেকে কতখানি সম্ভব? এ ছাড়া তদন্তের আগেই রেলের উচ্চপদস্থরা যেখানে বরখাস্ত হওয়া টিটিইর চরিত্রহননে নেমেছেন, সেখানে তাদের দিয়ে তদন্তের কী হবে? এর বাইরে যখন মন্ত্রী পত্নীর আত্মীয়ের মুখ দিয়েই যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের করুণ চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, এরপর আর তদন্তের কিছু বাকি থাকে? সবকিছু তো দিবালোকের মতো পরিস্কার।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে নৈতিক অবস্থান থেকে সাময়িক সময়ের জন্য রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে। সংস্থাটির এই দাবি মন্ত্রী পত্নীর অন্যায় হস্তক্ষেপের ঘটনা প্রকাশের আগেই। রেলমন্ত্রী যদিও বলেছেন, টিআইবি দ্রুত সময়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এখানে মন্ত্রীর কোনো সংশ্নিষ্টতা আছে কিনা, তা দেখার আগেই তারা এটি করেছে। মন্ত্রীর মতে, ফোন করলেও তার স্ত্রী বরখাস্তের কথা বলেননি। তবে তাকে কিছু না জানিয়ে তার স্ত্রীর ওই ফোন করাটা ঠিক হয়নি বলেও দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

আমরা জানি না, এ ঘটনার পর এরকম প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের হস্তক্ষেপ প্রবণতা ও প্রভাব বিস্তার চেষ্টা কমবে কিনা। তবে এ ঘটনা একটা বার্তা নিঃসন্দেহে। 

বিষয় : রেলমন্ত্রী ট্রেনের টিকিট ট্রেনের টিটিই

মন্তব্য করুন